kalerkantho


সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে গেলেন ‘দোহার’-এর কালিকাপ্রসাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক কলকাতা   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে গেলেন ‘দোহার’-এর কালিকাপ্রসাদ

বর্ধমানের শিউড়িতে এক অনুষ্ঠানে গান গাইতে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন পশ্চিমবঙ্গের ফোক ধাঁচের ব্যান্ডদল দোহারের শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। গুরুতর আহত হয়েছেন তাঁর সঙ্গে একই প্রাইভেট কারে থাকা দলের আরো পাঁচজন। গতকাল মঙ্গলবার সকালে হুগলির গুরাপে এ দুর্ঘটনা ঘটে। শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, বাংলাদেশের তরুণ শ্রোতাদের কাছেও বিপুল জনপ্রিয় ৪৭ বছর বয়সী এই শিল্পী ও দোহারের গান।

গুরুতর আহতরা হলেন সন্দ্বীপন পাল, নীলাদ্রি রায়, অর্ণব রায়, সুদীপ্ত চক্রবর্তী ও রাজীব দাশ। তাঁদের মধ্যে প্রাইভেট কারের চালক রাজীব দাশের অবস্থা বেশি আশঙ্কাজনক।

হুগলি জেলা পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে দোহারের শিল্পীদের বহনকারী প্রাইভেট কারটি কলকাতা থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে হুগলির গুরাপ এলাকা পার হচ্ছিল। এ সময় হঠাৎ করেই প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসা একটি ট্রাক পেছন দিক থেকে প্রাইভেট কারটিকে ধাক্কা মারে। সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাইভেট কারটি ছিটকে উল্টে পড়ে পাশের খাদে। এতে গাড়িতে থাকা ছয়জনই গুরুতর আহত হন। তাঁদের উদ্ধার করে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক কালিকাপ্রসাদকে মৃত ঘোষণা করেন।

কালিকাপ্রসাদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শিল্প-সাহিত্য ও সংগীতাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাজ্যের প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ বাংলাদেশ ও বিদেশে থাকা অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও টুইটারে কালিকাপ্রসাদকে নিয়ে নানা স্মৃতি, ঘটনা ও শোকগাথা লিখেছেন।

বাংলাদেশের সংস্কৃতিমন্ত্রী ও বরেণ্য অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসের প্রথম সচিব (প্রেস) মোফাকখারুল ইকবাল কালিকাপ্রসাদের মরদেহে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

কালিকাপ্রসাদের আদিবাড়ি আসামের শিলচর হলেও বাংলাদেশের প্রতি তাঁর ছিল অকৃত্রিম টান, ভালোবাসা। বাংলাদেশের যেকোনো অনুষ্ঠানে ডাক পেলেই ছুটে যেতেন। বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কিংবা কোনো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও প্রায়ই তাঁকে গান গাইতে দেখা গেছে। দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে লোকগান ও পল্লীগীতির ফিউশনের মাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রোতা ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে ১৯৯৯ সালে গঠন করা কালিকাপ্রসাদের ব্যান্ডদল দোহার। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কালিকাপ্রসাদের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতার রবীন্দ্রসদন চত্বরে। এর আগে রাজ্যের সচিবালয় নবান্নে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর মরদেহ। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ রাজ্য সরকারের শীর্ষস্থনীয় কর্মকর্তারা শেষ শ্রদ্ধা জানান। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় দক্ষিণ কলকাতার সন্তোষপুরে তাঁর নিজ বাড়িতে। সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।

কালিকাপ্রসাদের অকালপ্রয়াণে শোকাতুর সংগীতশিল্পী কবীর সুমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, কালিকা নেই। ’ কালিকার মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ সংগীত পরিচালক শান্তনু মৈত্র এবং অনুপম রায়। অনুপম রায় বলেন, ‘মাত্র দুই দিন আগেই একটা অনুষ্ঠানে জমিয়ে আড্ডা দিয়ে এলাম। এখনো মনে হচ্ছে ওর উপস্থিতি আমার সত্তাজুড়ে। ’ ঊষা উত্থুপ বলেন, ‘সব সময় ছেলেটাকে হাসিখুশি দেখেছি, স্তব্ধ হয়ে গেল সব, বিশ্বাস করতে পারছি না। ’

সংগীতশিল্পী লোপামুদ্রা মিত্র বলেন, ‘যেভাবে কালিকাপ্রসাদ নতুন করে লোকসংগীতকে আবার জাগিয়ে তুলছিলেন, সেই চেষ্টায় বড় একটা ধাক্কা লাগল। কে এর উত্তরণ করবেন, আমাদের জানা নেই। ’ এ পর্যন্ত মোট আটটি অ্যালবাম বাজারে ছেড়েছে দোহার, যার মধ্যে শেষ অ্যালবাম ‘সহস্র দোতারা’ ২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়। কালিকাপ্রসাদ চলচ্চিত্রের জন্যও গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন। বাংলাদেশে চলতি সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া ‘ভুবন মাঝি’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালকও তিনি। এ সিনেমার প্রিমিয়ারে অংশ নিতে গত ৩ মার্চ তিনি ঢাকায় এসেছিলেন।

 


মন্তব্য