kalerkantho


জামায়াতের ভাগ্য আদালতের হাতে

জেনেভায় অধিকার পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ

মেহেদী হাসান   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জামায়াতের ভাগ্য আদালতের হাতে

রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী থাকবে কি না তা এখন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটিতে এক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা জানান। ওই কমিটি গতকাল দ্বিতীয় ও শেষ দিনের মতো রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন (আইসিসিপিআর) বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে। আর আনিসুল হক বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে এ দেশের অবস্থান তুলে ধরেন।

মন্ত্রী বলেন, আদালত রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছেন। এরপর দলটি ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছে এবং তা এখন আদালতের বিবেচনাধীন।

মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও স্পষ্ট বলেছেন, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী ও এর সদস্যরা যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত ছিল। তিনি আরো বলেন, মুক্তচিন্তা বলতে যা বোঝায়, জামায়াতের অবস্থান তার ঠিক বিপরীত।

‘বাংলাদেশ একদিকে ধর্মনিরপেক্ষ, আবার অন্যদিকে ধর্মীয় বিষয়কে উৎসাহিত করছে’—এমন জটিল সমীকরণ বিষয়ে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের একজন আইনমন্ত্রীর কাছে এর ব্যাখ্যা জানতে চান। আনিসুল হক বলেন, ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে যে সংবিধান কার্যকর হয়েছিল তার মূল চেতনা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ধর্মনিরপেক্ষতাকে সরিয়ে ধর্মীয় বিষয় যোগ করা হয়েছে, জামায়াতের মতো দলকে নতুন করে জন্ম দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন বেশ কিছু স্থানীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, পাঁচ বছরের জন্য সরকার গঠিত হয়। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান আবশ্যিক ছিল।

তিনি বলেন, বিএনপি ওই নির্বাচন বর্জন করে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে সহিংসতার পথ বেছে নেয়। নির্বাচনের আগে তারা পেট্রলবোমা ছোড়ে, গণপরিবহনে হামলা চালায়। এর পরও জনগণ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।

এরপর নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের একজন প্রতিনিধি বলেন, ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে, সে জন্য ইসি পর্যাপ্তসংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য নিয়োগ করে থাকে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭২ সালের আইন অনুযায়ী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে একমাত্র প্রার্থীকেই বিজয়ী ঘোষণার বিধান আছে।

মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর ঠেঙ্গারচরে স্থানান্তর প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে আইনমন্ত্রী বলেন, সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ শরণার্থীদের প্রত্যাখ্যান করেনি। বর্তমানে এ দেশে ৩৩ হাজার মিয়ানমার শরণার্থী ও অনিবন্ধিত তিন লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। এর পরও নতুন অনুপ্রবেশ থেমে নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশ তাদের পানিতে ছুড়ে ফেলবে না। ঠেঙ্গারচরকে বাসযোগ্য করে ও সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যেমন ঘরবাড়ি, মসজিদ, হাসপাতাল নির্মাণের পরই তাদের সেখানে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

স্থানান্তরের জন্য রোহিঙ্গাদের সম্মতি নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অনেক বোঝা বহন করছে। এবার সময় এসেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও সেই বোঝার অংশীদার হওয়ার। তিনি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান।

বিডিআর বিদ্রোহের বিচারপ্রক্রিয়া প্রসঙ্গে আনিসুল হক বলেন, তিনি নিজেই এ বিচারে প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন। ২০০৯ সালে যখন এ বিদ্রোহ হয়েছিল তখন ক্ষমতাসীন সরকারের বয়স ছিল মাত্র দেড় মাসের কিছু বেশি। বিদ্রোহের সময় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ও ১৭ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে মরদেহ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্তদের ফৌজদারি আইনে আর বিদ্রোহের জন্য অন্যদের বিডিআর আইনে বিচার হয়েছে।

অভিযুক্তদের মধ্যে যারা ফেরারি তাদেরও আইনজীবী দেওয়া হয়েছে। তাই কোনোভাবেই বলার সুযোগ নেই, ভুল বিচার হয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। তার শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে একটি বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন। এখন সেগুলোর শুনানি চলছে।

যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, এ আদালত রোম স্ট্যাটিটিউট ও আইসিসিপিআরের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ। এ আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বচ্ছ। দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, গবেষক, কূটনীতিক এ বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এ আদালতে সাজাপ্রাপ্তরা আপিল করার সুযোগ পান। নুরেমবার্গ, টোকিও বিচারে এমন কোনো সুযোগ ছিল না।

সালিসের বিচারে দোররা মারা, জুতাপেটা, মাথার চুল কেটে দেওয়া, মৃত ব্যক্তিকে কবর দেওয়া বা সৎকারে বাধা দেওয়ার মতো বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। এ ধরনের শাস্তি দেওয়া বেআইনি। এটি যদি কেউ করে, তাহলে তাকে শাস্তি পেতে হবে।

মোবাইল কোর্ট বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘অপরাধী দোষ স্বীকার করলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এ আদালতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দুই বছরের সাজা দিতে পারেন। দুই বছর আগে আমে ফরমালিন মেশানো বন্ধে আমরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। এটি খুবই কাজে এসেছে। ’ তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সাফল্য যেমন এসেছে, তেমনি এর মাধ্যমে যাতে বাড়াবাড়ি না হয়, সে বিষয়েও খেয়াল রাখা হচ্ছে।

বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও নাগরিক সমাজকে চাপে রাখা হচ্ছে—এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে আনিসুল হক বলেন, দমন বা চাপে রাখার মতো সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ তিনি পাননি। জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞ কমিটির কাছে কোনো অভিযোগ থাকলে তা বাংলাদেশে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিয়ে তিনি এ বিষয়ে কমিটিকে জানাবেন।

বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জঙ্গি অর্থায়ন ঠেকাতেই এ আইন। এতে এনজিওদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

এক প্রশ্নের উত্তরে আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিদেশে বাংলাদেশের ৬০ জন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে পাঁচজন নারী। এ ছাড়া দুজন নারী কনসাল জেনারেল রয়েছেন। বর্তমানে বিসিএস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারের ২৫ শতাংশ নারী। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় শ্রমিক অধিকার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের এক সদস্য বলেন, সেখানেও ভিন্ন আইনে শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা ও দর-কষাকষির অধিকার রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশিদের যাতায়াতে বিধিনিষেধ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম ত্রিপুরা বলেন, বিদেশিদের নিরাপত্তার জন্যই অবহিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কারণ সেখানে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রয়েছে, যারা মুক্তিপণের জন্য আটকে রাখে, চাঁদাবাজি করে।

সমকামী অধিকারকে স্বীকৃতি প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সমাজে এখনো এটি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনই এ বিষয়টিকে বৈধতা দেওয়ার কোনো অঙ্গীকার করব না। ’

নারীর গর্ভপাতের অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আইনে এটি নিষিদ্ধ। শুধু মায়ের জীবন বিপন্ন হলেই এমন সুযোগ আছে।


মন্তব্য