kalerkantho


ইন্টার্নদের শাস্তি প্রত্যাহার উঠে গেল কর্মবিরতিও

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বাসায় ছাত্রলীগ সভাপতির মধ্যস্থতা

তৌফিক মারুফ   

৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ইন্টার্নদের শাস্তি প্রত্যাহার উঠে গেল কর্মবিরতিও

অবশেষে দায়মুক্তি পেলেন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে থাকা শাস্তিপ্রাপ্ত চার ইন্টার্ন চিকিৎসক। একই সঙ্গে কর্মবিরতি উঠে যাওয়ায় মুক্তি মিলেছে সাধারণ রোগীদেরও। চার দিন ধরে চলা এ কর্মবিরতি প্রত্যাহারে মধ্যস্থতা করেছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এতেই নিজ অবস্থান থেকে পিছু হটেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আলাউদ্দিন সরকারের ছেলে আব্দুর রউফ কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের হাতে নির্যাতনের শিকার হন। এরপর তদন্তের ভিত্তিতে ওই চারজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া

হয়।  

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আলটিমেটামের ৭২ ঘণ্টার শেষ দিন গতকাল সকালে ঢাকার তিন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রলীগের নেতারা কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন মোহাম্মদ নাসিমের বাসায়। তাঁরা প্রস্তাব দেন চিকিৎসকদের শাস্তি প্রত্যাহার করা হলে কর্মবিরতি তুলে নিতে তাঁরা রাজি। অবশ্য ইন্টার্ন চিকিৎসকরা এ সময় বগুড়ায় তাঁদের সহকর্মীদের কৃতকর্মের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চান। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর ঘটবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দেন তাঁরা। এ ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলানও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে অভিযুক্ত চারজনের শাস্তি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন মন্ত্রী। সঙ্গে সঙ্গে কর্মবিরতি তুলে নেওয়ারও ঘোষণা দেওয়া হয়।

বগুড়া থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে গতকাল সন্ধ্যায় ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মুখপাত্র ডা. কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘অযৌক্তিকভাবে চারজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে নেওয়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আজ (গতকাল) স্থগিত করা হয়েছে। এসংক্রান্ত একটি চিঠি হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মাসুদ আহসান ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দেওয়ার পর ধর্মঘট কর্মসূচি তুলে নিয়ে কাজে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এখন থেকেই আমরা কাজে যোগ দিচ্ছি। ’

মধ্যস্থতা বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আন্দোলনের ফলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছিল। আর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বেশির ভাগই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তাই মানুষের দুর্ভোগ নিরসনে আমি উদ্যোগী হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়েছি। ’

শাস্তিপ্রাপ্তরা নিজেদের দায়মুক্তির জন্য ছাত্রলীগকে ব্যবহার করেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে ছাত্রলীগকে জড়ানোর প্রশ্নই নেই। ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে কেউ পার পাবে না। এটা ইন্টার্নদের পেশাগত আন্দোলন। কেবল ছাত্রলীগ নয়, সবাই এতে অংশ নিয়েছে। আর আমি গিয়েছি সাধারণ মানুষের স্বার্থে। ’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শাস্তিপ্রাপ্ত চারজনের মধ্যে ডা. এম এ আল মামুন এখনো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ শাখার সভাপতি, ডা. মো. আশিকুজ্জামান আসিফ সহসভাপতি এবং  ডা. মো. কুতুব উদ্দীন সাবেক সহসভাপতি। আর যাঁকে নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত সেই  ডা. নূরজাহান বিনতে ইসলাম (নাজ) কোনো পদে না থাকলেও ছাত্রলীগের সমর্থক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শাস্তি হিসেবে তাঁদের বদলি ও ছয় মাসের জন্য ইন্টার্নশিপ স্থগিত করেছিল গত বৃহস্পতিবার। এর পর থেকেই ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি শুরু হয়।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা পরীক্ষীত চৌধুরী জানান, মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে ইন্টার্নরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেন। ঢাকা মেডিক্যাল, স্যার সলিমুল্লাহ ও সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের নেতারা এই বৈঠকে অংশ নেন। তাঁরা সার্বিক পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক হিসেবে মন্ত্রীর কাছে অভিভাবকসম ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি কামনা করেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতিও দেন তাঁরা। এরপর মন্ত্রী সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি বন্ধ ও চলমান সংকট দ্রুত নিরসনে সব পক্ষকে ধৈর্যশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে চার চিকিৎসকের সাজার আদেশ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

নির্যাতিত রউফের পরিবার হতাশ : চিকিৎসকদের শাস্তি প্রত্যাহারের খবর শুনে হতাশ নির্যাতনের শিকার আব্দুর রউফের পরিবারের সদস্যরা। ডাক্তারদের মারধরের শিকার হয়েছেন বলে দাবিদার রউফের চাচাতো বোন বীনা খানম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভিডিওতে দেশবাসী দেখেছে ইন্টার্ন ডাক্তাররা রউফসহ আমাকে ও আমার ননদ সেতুকে কিভাবে মারধর করেছে। আমরা মন্ত্রীর ওপর আস্থা রেখে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থায় যাইনি। কিন্তু এখন তো দেখছি শাস্তি প্রত্যাহার করা হলো। কী আর করার আছে আমাদের?’


মন্তব্য