kalerkantho


অনলাইনভিত্তিক আন্ত ব্যাংক সেবা বন্ধের ঝুঁকি

শেখ শাফায়াত হোসেন   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



অনলাইনভিত্তিক আন্ত ব্যাংক সেবা বন্ধের ঝুঁকি

নিজ প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কাজ এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনলাইনভিত্তিক আন্ত ব্যাংক লেনদেন গতিশীল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে থাকা ‘ডাটা সেন্টার’ পুনর্গঠনের কাজ চলছে। মের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ এ কাজ শেষ হবে। তবে এ পর্যায়ে যেকোনো সময় যান্ত্রিক ত্রুটি বা বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি আছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এমনটা ঘটলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার অনেকগুলো প্রযুক্তিগত সেবা সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। শুরু হবে সেই পুরনো পথে হাঁটা। তখন কাজ হবে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। কেননা ডাটা সেন্টার পুনর্গঠন কাজের এ সময়টাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভারের কোনো ‘ব্যাকআপ’ রাখা হয়নি। অর্থাৎ একটি সার্ভার অকেজো হয়ে পড়লে অন্য সার্ভার ব্যবহারের সুযোগ থাকছে না।

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এমন দুর্ঘটনা ঘটে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রযুক্তি পদ্ধতি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার পাশাপাশি এর সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত স্বয়ংক্রিয় চেক ক্লিয়ারিং পদ্ধতিও বন্ধ হয়ে যাবে। এক ব্যাংকের গ্রাহক অন্য ব্যাংকের এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারবে না। ব্যাংক কর্মকর্তারা ঋণ বিতরণের আগে সিআইবি অনলাইন থেকে জেনে নিতে পারবেন না ওই গ্রাহকের অন্য কোনো ব্যাংকে ঋণ আছে কি না।

যেকোনো সময় এমনটা ঘটতে পারে—এই আশঙ্কা থেকে ম্যানুয়াল পদ্ধতি অর্থাৎ সেই পুরনো পদ্ধতিতে কাজ করতে হতে পারে এমন এক সতর্কতা আদেশে সম্প্রতি স্বাক্ষর করেছেন গভর্নর ফজলে কবির।

রাজধানীর মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ডাটা সেন্টার সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে। সেখানকার সার্ভারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইন্টারনেটভিত্তিক সব কাজ পরিচালিত হয়। কর্মকর্তাদের ডেস্কে থাকা কম্পিউটার, আইপি ফোন, পিএবিএক্স সার্ভার থেকে শুরু করে প্রতিটি বিভাগ ও কর্মকর্তাদের রুমের ‘লক’ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয় এ পদ্ধতিতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনার জন্য স্থাপিত সফটওয়্যার এন্টারপ্রাইজ ডাটা ওয়্যারহাউস (ইডিডাব্লিউ) ও এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিংসহ (ইআরপি) বেশ কিছু সফটওয়্যার চলছে এই ডাটা সেন্টারের সার্ভারের মাধ্যমে।

শুধু তা-ই নয়, প্রতিটি ব্যাংকের ঋণগ্রহীতার তথ্য (সিআইবি অনলাইন), বাংলাদেশ অটোমেটেড চেক ক্লিয়ারিং হাউস (ব্যাচ), ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (ইএফটি), ঋণপত্র ও রেমিট্যান্স মনিটরিংয়ের ড্যাশ বোর্ড, আন্ত ব্যাংক অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) লেনদেনের জন্য চালু করা ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ অব বাংলাদেশ (এনপিএসবি)—এ সবই পরিচালিত হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভারের মাধ্যমে। দুর্ঘটনা ঘটলে এসব সেবাও বন্ধ হয়ে যাবে।

ডাটা সেন্টার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের ইনফরমেশন সিস্টেমস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সিস্টেম ম্যানেজার দেবদুলাল রায় এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনই এতটা উদ্বিগ্ন হবেন না। ব্যাকআপ পুরোপুরি নেই, তা নয়। তবে হার্ডওয়্যারগুলো তিন-চার বছরের পুরনো। এগুলো বদলাতে হচ্ছে। অনেক কাজ একসঙ্গে করতে হচ্ছে। এই কাজ শেষ হওয়ার আগে সার্ভার বসে গেলে সিআইবি অনলাইন, আন্ত ব্যাংক এটিএম সেবা, স্বংয়ক্রিয় চেক নিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের কী করতে হবে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগাম সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়ে রাখা হয়েছে। ’

জানা গেছে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির পর পরই সংস্থাটির আইটি নিরাপত্তা বাড়াতে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ভারতের আইটি বিশেষজ্ঞ রাকেশ আস্তানাকে। তাঁর পরামর্শেই তথ্যকেন্দ্র পুনর্গঠনের কাজ চললেও চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তিনি আর এর সঙ্গে যুক্ত নেই। তবে তিনি যে পরামর্শ দিয়ে গিয়েছিলেন সে মোতাবেক বিশদ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডাটা সেন্টার পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমিতে (বিবিটিএ) স্থাপতি ডিজাস্টার রিকভারি সার্ভারটিকে পুনর্গঠন করে ‘নিয়ার ডাটা সেন্টার’-এ পরিণত করা হচ্ছে। এ ছাড়া তৃতীয় আরেকটি তথ্যকেন্দ্র তৈরি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেটা হবে রাজশাহীতে, যার নাম দেওয়া হচ্ছে ‘ফার ডাটা সেন্টার’।

এসব কাজ করতে গিয়ে এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রযুক্তিভিত্তিক কর্মকাণ্ডে নানা ধরনের বিঘ্ন ঘটতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসানের দপ্তরের ইআরপি সিস্টেমের আইপি বদলে যায়। ফলে দপ্তরে ঢুকতে পারছিলেন না তিনি। পরে কারিগরি বিশেষজ্ঞ এসে তাঁর ইআরপি পাল্টে দেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ৩০ তলা ভবনে স্থাপতি তথ্যকেন্দ্রে ব্যাপক সংস্কারকাজ চলছে। সেখান থেকে সার্ভার সরিয়ে পাশের একটি ছোট্ট কামরায় গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। সংকীর্ণ একটি দরজা দিয়ে ওই কমরাটিতে ঢুকতে দেখা গেছে কর্মকর্তাদের। খুবই স্পর্শকাতর জায়গা হিসেবে বহিরাগতদের ওই কক্ষে প্রবেশ নিষিদ্ধ।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন, সব ধরনের অনলাইন ব্যাংকিং ঝুঁকির মধ্যে নেই। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেওয়া ব্যাংকগুলোর সেবা পাওয়া যাবে না। প্রতিটি ব্যাংকের নিজস্ব অনলাইন সেবা বা নিজস্ব এটিএম সেবা পেতে কোনো অসুবিধা হবে না।


মন্তব্য