kalerkantho


বিনিয়োগে আগ্রহী বেসরকারি খাত, বাধা দূরের আহ্বান

পিপিপি বিষয়ক গোলটেবিল আলোচনা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিনিয়োগে আগ্রহী বেসরকারি খাত, বাধা দূরের আহ্বান

গতকাল কালের কণ্ঠ’র সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন কৌশলের প্রেক্ষাপটে পিপিপি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অতিথিসহ আলোচকরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন কৌশলের প্রেক্ষাপটে পিপিপি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও বিনিয়োগে আগ্রহী। তবে এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘ মেয়াদে বড় অঙ্কের অর্থায়নের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনেক ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে।

এ ছাড়া অবকাঠামো খাতে দুর্বলতা, উন্নত বন্ড বাজার না থাকা, বিদেশিদের দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগের সুযোগ অবারিত না থাকা, চলমান ও আসন্ন প্রকল্পগুলোর তথ্য এক জায়গায় না থাকাসহ বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর না হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) থেকে বড় ধরনের বিনিয়োগ আশা করা কঠিন।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বারিধারায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় কালের কণ্ঠ’র সম্মেলন কক্ষে এ গোলটেবিল  আলোচনা হয়। পিপিপি অথরিটি বাংলাদেশ (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) ও বিজ্ঞাপনী সংস্থা ওয়াটারমার্ক এমসিএল যৌথভাবে এ গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে।

পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আফসর এইচ উদ্দিনের সভাপতিত্বে এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরের সঞ্চালনায় আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম।

প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে শামসুল আলম দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে পিপিপির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার তার সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পিপিপিকে ব্যাপকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রধান অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বছরে ৩০০ কোটি থেকে ৩৫০ কোটি ডলার। কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য দরকার ৯০০ কোটি ডলার।

শুধু বাজেটের ওপর নির্ভর করে সরকারের পক্ষে এই বিশাল পরিমাণ অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারকে অবশ্যই ব্যক্তিমালিকানাধীন খাত থেকেও বিনিয়োগ গ্রহণ করতে হবে। আর সে উদ্দেশ্যেই সরকার পিপিপি আইন করেছে। তবে সফলভাবে পিপিপি বাস্তবায়নে একটি সমন্বয় কমিটিও প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে পিপিপির সাফল্যের নজির তুলে ধরতে গিয়ে প্রধান বক্তা ড. শামসুল আলম ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ দেন। তিনি জানান, ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে পিপিপির মাধ্যমে বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পিপিপির মাধ্যমে বাস্তবায়িত সফল অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অন্যতম জাকার্তার ওই সড়ক নির্মাণ প্রকল্প।

পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আফসর এইচ উদ্দিন বলেন, ‘দেশে যেগুলো সবচেয়ে জটিল প্রকল্প, যেগুলো অন্য মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করতে পারবে না, সেগুলো আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। আমরা মাত্র শুরু করেছি। এখনই যদি আমাদের ঘাড়ের ওপর এ ধরনের বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটা বাস্তবায়ন করা কঠিন। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে ব্যবসায়ীদের মধ্যে পিপিপি নিয়ে আত্মবিশ্বাসের অনেক ঘাটতি আছে। এটি দূর করা জরুরি। ’ তাঁর মতে, বাংলাদেশে পিপিপি নিয়ে অনেক সমস্যা। এখানে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ নয়, করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। তা ছাড়া প্রকল্প বাছাই হতে হবে স্বচ্ছ এবং বাস্তবমুখী। দেশের জন্য প্রকল্পটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা দেখতে হবে। এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে পিপিপি থেকে সফলতা আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন সৈয়দ আফসর উদ্দিন।

অন্য বক্তারাও দেশের উন্নয়নে পিপিপির মাধ্যমে বিনিয়োগ গ্রহণ প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে সরকারকে আরো আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি দরকার অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। কেননা রাস্তাঘাট হলে দেশের মধ্যে পণ্য আদান-প্রদান বাড়ে। অর্থনীতিতে গতিশীলতা বাড়ে। ’ এ ক্ষেত্রে পিপিপির আওতায় অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সমর্থন ও প্রণোদনা আশা করেন তিনি।

আবুল কাশেম খান বলেন, পিপিপি থেকে বড় বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কেননা সরকার বদলের পর যদি নীতিমালা পরিবর্তন হয়ে যায়, তবে অনেক প্রকল্পই হুমকির মুখে পড়বে। তা ছাড়া সুশাসনের অভাব, অনিয়ম, দুর্নীতিও বড় বাধা।

মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান বাণিজ্য কর্মকর্তা সৈয়দ রফিকুল হক বলেন, “আমরা পিপিপির আওতায় গৃহীত প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ করতে চাই। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে, একক কোনো প্রতিষ্ঠানকে কোনো ব্যাংক তার মূলধনের ১৫ শতাংশের বেশি ফান্ডেড ঋণ দিতে পারবে না। এই শর্ত মেনে বড় প্রকল্পগুলোতে ঋণ দেওয়া যায় না। তা ছাড়া ব্যাংকগুলো যে বন্ড মার্কেট থেকে টাকা তুলে বিনিয়োগ করবে, সেখানেও অনেক ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট নেই। তা ছাড়া বিদেশি কম্পানিগুলো যে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে কিন্তু সেখানেও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া আছে। বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানকে ১৫ বছরের মধ্যে তার অপারেশন গুটিয়ে নিতে হয়। কিন্তু অনেক প্রকল্প আছে, যেগুলোর মেয়াদ আরো অনেক বেশি।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের যে স্বল্পতা আছে তা পূরণের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার পিপিপিকে মৌলিক উন্নয়ন মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা শুরু করে। একই সঙ্গে এটি সরকারের ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করছে। সরকারের করা ‘পিপিপি আইন’ প্রয়োজনীয় উন্নয়ন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করতে বিশেষ অবদান রাখছে। ”

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. শামসুল হক বলেন, ‘পিপিপির আওতায় বড় কোনো প্রকল্পে বিদেশিরা যখন বিনিয়োগ করতে আসে তখন প্রথমেই জানতে চায় এ ধরনের প্রকল্প করলে লাভবান হওয়া যাবে কি না। তারা এসংক্রান্ত অনেক তথ্য চায়। কিন্তু আমাদের দেশের সড়ক পরিবহন ও টোল সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্য কোথাও সংরক্ষণ করা হয় না। তা ছাড়া একই সময়ে কী কী প্রকল্প চলমান আছে এবং কী কী প্রকল্প পাইপলাইনে আছে সেই তথ্যও এক জায়গায় পাওয়া যায় না। এতে অনেক সময় বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বিনিয়োগে আগ্রহী অনেকেই।

আলোচনার সারসংক্ষেপ টানতে গিয়ে নাসিম মঞ্জুর বলেন, পিপিপির আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জমির মালিকানা মডেলে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট জনগণকেও অংশীদার করতে হবে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারকে একটি প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে।

আরো আলোচনা করেন ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ শাহীন, এটিএন বাংলার বিজনেস এডিটর ইসমাত জেরিন খান, গ্রিন ডেলটা ক্যাপিটাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. রফিকুল ইসলাম, সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এরশাদ হোসেন, আইডিএলসি ফিন্যান্স লিমিটেডের করপোরেট বিভাগের প্রধান মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের গ্লোবাল ব্যাংকিং বিভাগের এমডি ও কান্ট্রি হেড নাসের এজাজ বিজয়, ডেইলি সানের নির্বাহী সম্পাদক শিয়াবুর রহমান প্রমুখ।

আলোচনা অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে স্পন্সর করে সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল, গ্রিন ডেলটা ক্যাপিটাল লিমিটেড ও ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড।


মন্তব্য