kalerkantho


৫০তম সমাবর্তন

উৎসবমুখর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রফিকুল ইসলাম   

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



উৎসবমুখর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন উপলক্ষে গতকাল ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা উল্লাস করে। ছবি : কালের কণ্ঠ

শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে থাকা তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানুষকে আলোকিত করতে যাত্রা শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। জ্ঞানের আলো ছড়ানো এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দুর্দিনে জাতিকে জুগিয়েছে সাহস, অধিকার আদায়ে হয়েছে বজ্রকণ্ঠ।

গৌরবের সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ শনিবার। সমাবর্তনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পদচারণে আজ মুখরিত থাকবে পুরো ক্যাম্পাস। এরপর হাজারো স্মৃতি সঙ্গী করে জীবনের আহ্বানে সামনে এগিয়ে যাবে তারা।   

আজ শিক্ষার্থীদের পরনে থাকবে কালো গাউন, মাথায় কালো হ্যাট। এবার সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অধিভুক্ত কলেজ ও সান্ধ্য পর্বের শিক্ষার্থী মিলিয়ে ১৭ হাজার ৮৭৫ জন গ্র্যাজুয়েট অংশ নেবেন। ৮০ জন কৃতী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে ৯৪টি স্বর্ণপদক, ৬১ জনকে পিএইচডি ও ৪৩ জনকে এমফিল ডিগ্রি দেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন সূত্র জানায়, প্রায় শত বছরের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এর আগে ৪৯টি সমাবর্তন হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠার পর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত ধরেই জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন আন্দোলনে বাঙালির জাগরণ ঘটেছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর নানা রকম আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা।

এসব আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে কখনো কখনো শিক্ষাজীবন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও ছেদ পড়েছে। ফলে প্রতিবছর সমাবর্তন অনুষ্ঠানের প্রচলন থাকলেও তা নিয়মিত আয়োজন করা যায়নি।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন হয়েছিল ১৯২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। তখন বাংলার তৎকালীন গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর লর্ড লিটন সমাবর্তন ভাষণ দেন। ১৯২৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সমাবর্তন হয়েছে। এ সময়ে ২৪টি সমাবর্তন হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে সর্বশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালের ২১ নভেম্বর। পাকিস্তান আমলে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময়ে ১৫ বার সমাবর্তন হয়েছে।  

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম (বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০তম) সমাবর্তনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এই সমাবর্তনে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও আচার্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভোরের সূর্য ওঠার আগেই সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ঘাতকরা। এর ২৯ বছর পর ১৯৯৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর স্বাধীন দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন হয়। আর সর্বশেষ সমাবর্তন হয়েছে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে।

আজ সকাল সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন। সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির সন্তান ও কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিওর প্রেসিডেন্ট ও উপাচার্য অধ্যাপক অমিত চাকমা। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি প্রদান করা হবে।

সমাবর্তন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, সমাবর্তন দিবস শিক্ষার্থীদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনটির জন্য শিক্ষার্থীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। এই সমাবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষাজীবনের সমাপন ঘটে নতুন জীবনে পদার্পণ করে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষাজীবনের অর্জন সার্টিফিকেট ও পদক গ্রহণ করে। স্বাধীনতাপূর্ব ও উত্তরকালে দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান বন্ধ ছিল। বর্তমানে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। এ সংস্কৃতি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদী।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সমাবর্তন পোশাক গাউন, কালো হ্যাট, টাই ও ক্রেস্ট বিতরণ শুরু হয়েছে। সমাবর্তনকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এবং সমাবর্তনের প্রস্তুতি বিষয়ে জানাতে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ইতিমধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। এবারের সমাবর্তন বক্তার বিষয়ে তিনি বলেন, অমিত চাকমা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ। তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

কালো গাউন ও হ্যাট পরে দিনটি ক্যামেরাবন্দি করবে শিক্ষার্থীরা। নিজ নিজ বিভাগ কিংবা অনুষদের সামনে সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে একই ফ্রেমে নিজেদের স্মৃতি ধরে রাখবে তারা। অপরাজেয় বাংলা, কার্জন হল, দোয়েল চত্বর, বিজ্ঞান লাইব্রেরি, কাজী মোতাহার হোসেন ভবন, সিনেট ভবন, রাজু ভাস্কর্য, শহীদ মিনার, স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর, টিএসসি, হাকিম ও মিলন চত্বর, মধুর ক্যান্টিনসহ ঘুরে বেড়ানো জায়গাগুলোর স্মৃতি ধরে রাখবে তারা।

সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এম আমজাদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ইতিমধ্যে সমাবর্তনের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নির্বিঘ্নভাবে সমাবর্তন সম্পন্ন করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি রোভার স্কাউট ও বিএনসিসি সদস্যরাও নিয়োজিত থাকবে। আর যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য এই অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করবেন, কাজেই কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য