kalerkantho


বগুড়া মেডিক্যালে রোগীর স্বজনকে নির্যাতন

শাস্তি চার ইন্টার্ন চিকিৎসকের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



শাস্তি চার ইন্টার্ন চিকিৎসকের

বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসাধীন রোগী আলাউদ্দিন সরকারের ছেলে আবদুর রউফকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দায়ী চার ইন্টার্ন চিকিৎসককে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।

তাঁদের প্রত্যেকের ইন্টার্নশিপ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করার পাশাপাশি চারজনকে অন্য চারটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশে এ শাস্তির আদেশ জারি করা হয়েছে।

বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শাস্তিপ্রাপ্ত চার ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. নুরজাহান বিনতে ইসলাম নাজকে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, ডা. মো. আশিকুজ্জামান আসিফকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, ডা. মো. কুতুব উদ্দীনকে  যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং ডা. এম এ আল মামুনকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের সতর্ক করে দিয়ে আদেশে বলা হয়, ভবিষ্যতে একইরূপ অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাঁদের পেশাগত সনদ বাতিল করা হতে পারে।

এদিকে গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেন।

এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের রেওয়াজ খুব কম থাকলেও আমি মনে করি এ প্রতিবেদন প্রকাশ করলে অন্যরা সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাবে। রোগী ও চিকিৎসকদের মধ্যে সুম্পর্ক তৈরির জন্য এ প্রতিবেদন আরো সহায়ক হয়ে উঠবে। ’ এর আগে গত বুধবার তদন্ত কমিটির প্রধান ওই তদন্ত প্রতিবেদন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। তদন্ত কমটির প্রধান ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান, সদস্যসচিব ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবদুর রশিদ এবং অন্য সদস্য ছিলেন বিএমডিসির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক ডা. সারফুদ্দিন আহম্মেদ।

প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও রোগীর ছেলেকে শারীরিক নির্যাতন করে গর্হিত কাজ করেছেন বলে কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। রোগীর সেবার মতো মহৎ পেশায় প্রবেশের আগেই পেশাগত প্রশিক্ষণকালে অভিযুক্ত ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মেডিক্যাল ইথিক্স ভঙ্গ করেছেন। প্রত্যাশিত আচরণ অনুশীলনের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে কমিটি মনে করে।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে যা ঘটেছিল : ১৮ ফেব্রুয়ারি শেষ রাতে সিরাজগঞ্জের কোনাগাতী এলাকার রোগী আলাউদ্দিন সরকারকে এনে ভর্তি করা হয় বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টার দিকে রোগীর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় রোগীর ছেলে আবদুর রউফ ওই ইউনিটে কর্মরত ইন্টার্ন চিকিৎসক নুরজাহান বিনতে ইসলাম নাজকে ফ্যানের সুইচটি বন্ধ করে দিতে বলায় ওই চিকিৎসক বলেন—এটি আয়াদের কাজ। এ নিয়ে তাঁরা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ডা. নাজের সহকর্মী ডা. আশিকুজ্জামান আসিফ এসে আবদুর রহমানের সঙ্গে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে মারামারিতে লিপ্ত হন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা জড়ো হয়ে একটি কক্ষে আটকে আবদুর রউফের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালান। একজন নার্সের মাধ্যমে ঘটনা অবহিত হয়ে হাসপাতাল পরিচালক তাৎক্ষণিক একই হাসপাতালের উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালককে ঘটনাস্থলে পাঠান। এ সময় মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেনও খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। একই সঙ্গে পরিচালক বিষয়টি পুলিশ ও কলেজের সিনিয়র শিক্ষকদের অবহিত করে নিজেও ঘটনাস্থলে আসেন। ঘটনার একপর্যায়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবির মুখে রোগীর ছেলে রউফকে চিকিৎসকদের কাছে মাফ চাওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি সমঝোতার চেষ্টা করেন হাসপাতাল পরিচালক। এরই মধ্যে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা আবদুর রউফকে কান ধরে উঠবোস করাতে থাকলে পরিচালক তাতে বাধা দেন এবং রউফকে পুলিশি নিরাপত্তায় নিজকক্ষে (পরিচালকের) নিয়ে যান। ওই কক্ষে সমঝোতা প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে রোগীর অন্য দুই ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সেখানে উপস্থিত হয়ে এ ঘটনার জন্য অপরাধীদের শাস্তি দিতে বলেন। এতে পরিস্থিতি আরো অশান্ত হয়ে পড়ে। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মকর্তাদের নির্দেশনা উপেক্ষা করে আবদুর রউফকে আবারও শারীরিক নির্যাতন শুরু করেন। একপর্যায়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা জরুরি বিভাগে তালা ঝুলিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট এবং কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে বিএমএ ও স্বাচিপ নেতৃবৃন্দ ও পুলিশের সহায়তায় ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কাছ থেকে আবদুর রউফকে উদ্ধার করে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়।


মন্তব্য