kalerkantho


প্রাণিপ্রেম

সচেতনতায় বাঁচবে প্রাণ

রফিকুল ইসলাম ও মির্জা খালেদ, পাথরঘাটা থেকে   

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সচেতনতায় বাঁচবে প্রাণ

টাইগার টিমকে আক্রমণকারী বাঘ তাড়ানোর কৌশল শেখাচ্ছেন জাকির মুন্সী। ছবি : কালের কণ্ঠ

বঙ্গোপসাগর তীরের জেলে হারেছ আর ছগির। জীবিকার তাগিদে অন্য জেলেদের সঙ্গে যাচ্ছিলেন মাছ ধরতে। দূর থেকে সাগরের চরে কিছু একটা আটকে থাকতে দেখেন। কিছু দূর যেতেই তাঁরা আবিষ্কার করেন বিশাল দেহের প্রাণীটি একটি কুমির। তাঁদের চিৎকারে আশপাশের জেলেরা এগিয়ে আসেন। আয়োজন চলতে থাকে কুমিরটি মেরে ফেলার। ইতিমধ্যে মোবাইল ফোনে খবর পৌঁছে যায় টাইগার জাকিরের কাছে। তিনি ছুটে যান ঘটনাস্থলে। জেলেদের বুঝিয়ে কৌশলে কুমিরটি পাঠিয়ে দেন গভীর সাগরে।

এ ঘটনার কয়েক মাস আগে রুহিতা গ্রামের জেলেদের জালে গভীর সমুদ্রে ডলফিন ধরা পড়ে। বিশাল দেহের ডলফিনটি বিক্রি করে প্রচুর টাকা মিলবে ভেবে জেলেরা সেটি রশি দিয়ে ট্রলারের সঙ্গে বেঁধে ফেলে।

পানিতে ভাসিয়ে তীরে নিয়ে আসা হয়। রুহিতা অস্থায়ী বাজারের কাছে আসতেই মাছ কুড়ানো কিছু ছেলের মাধ্যমে খবর পেয়ে যান টাইগার জাকির। তাঁর আসার খবরে তড়িঘড়ি করে ডলফিনটি সাগরতীরে বালুচাপা দেওয়া হয়। জাকির এসে বালু সরিয়ে সেটিকে পানিতে ভাসানোর চেষ্টা করেন। জালের চাপে ডলফিনটির শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। রক্তাক্ত অবস্থায়ই জেলেদের ট্রলারে করে গভীর সাগরে ডলফিনটি অবমুক্ত করা হয়।

শুধু কুমির আর ডলফিন নয়, বাঘ তাড়ানোর ঘটনাও রয়েছে টাইগার জাকিরের জীবনে। বেশ কয়েকজন মানুষকে বাঘের থাবা থেকে উদ্ধার করেছেন এই অকুতোভয় প্রাণিপ্রেমী। এই কাজের কারণে জাকির মুন্সি এখন টাইগার জাকির নামে পরিচিত।

মাছ ধরতে গিয়ে সুন্দরবনে শিকারিদের পেতে রাখা হরিণ ধরার ফাঁদ উদ্ধার করাটা জাকিরের জন্য যেন অতি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাণের টানে সাগরে নামা এক জেলের এভাবে বন্য প্রাণী বাঁচানোর ঘটনা প্রায় নিত্যদিনের। পেশায় জাকির কখনো জেলে আবার কখনো দিনমজুর। এখন বিশ্বের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

যেভাবে শুরু : সাগর মোহনায় বলেশ্বর নদতীরের দুটি গ্রামের মানুষের চোখে ঘুম নেই। সচরাচর তারা কেউ ঘর থেকে বের হয় না। গরু-ছাগল চরানো বন্ধ। সর্বত্র আতঙ্ক। কারণ বলেশ্বর নদের পশ্চিম পাশের সুন্দরবন থেকে পাথরঘাটার লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে এক রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এলাকাবাসীর পাশাপাশি উদ্বিগ্ন প্রশাসন এবং বন বিভাগও। কিন্তু তারা কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। এ অবস্থায় রুহিতা গ্রামের আট জেলের সম্মিলিত চেষ্টায় বাঘটিকে বনে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়। এ ঘটনা ২০১০ সালের ২৩ জানুয়ারির। বাঘ বাঁচানোর ওই দলের আট সদস্যকে পরবর্তী সময়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছে ওয়াইল্ড টিম।

এখন এলাকায় আট সদস্যের দলটি টাইগার টিম বা টাইগার বাহিনী নামে পরিচিত। ওই বাহিনীর প্রধান টাইগার জাকির। প্রশিক্ষিত টাইগার টিমের সদস্যরা সুন্দরবনসংলগ্ন আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। লোকালয়ে বাঘ এলে কিংবা কোথাও কাউকে আক্রমণ করলে তাঁরা তাৎক্ষণিক তাদের উদ্ধারে এগিয়ে যান। তবে তাঁরা কেবল বনের বাঘ বনে ফিরিয়ে দিতে কিংবা বাঘে ধরা মানুষকে উদ্ধার কার্যক্রমেই থেমে নেই; বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ও এই বনের বাঘ বাঁচাতে তাঁরা বনসংলগ্ন গ্রামগুলোতে নানা রকম সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমও চালিয়ে থাকেন। টাইগার টিমগুলো পরিচালনা করে ওয়াইল্ড টিম। তাদের উদ্যোগ নিয়ে কালের কণ্ঠে ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ ‘অনন্য উদ্যোগ : উপকূলে টাইগার বাহিনী’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল।

প্রাণ বেঁচেছে যাদের : সুন্দরবনে হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা ফাঁদ উদ্ধারের ঘটনা টাইগার বাহিনীর প্রতিদিনের। এ ছাড়া শিকারিরা যখন হরিণ শিকার করে বিক্রির জন্য বনে নিয়ে আসে তখন হরিণসহ শিকারিদের আটকের বেশ কয়েকটি ঘটনা রয়েছে এই টাইগার জাকিরের। আমন মৌসুম এলেই বঙ্গোপসাগরতীরের কৃষি জমির ধান নষ্ট করে শূকর। তাই ক্ষেতের চারপাশ জাল দিয়ে ঘিরে ফেলে ধান রক্ষা করা হয়। ওই জালে আটকা পড়া শূকর বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় জাকির সেগুলো উদ্ধার করে বনে ছেড়ে দেন। এ ছাড়া জালে যাতে শূকর আটকা না পড়ে সে জন্য জাকির রাত জেগে সাগরতীরে আতুড়গোম (উচ্চশব্দ) ফাটিয়ে শূকর তাড়ান। অজগর, মেছো বাঘ, গুইসাপ, শিয়াল মানুষের হাতে ধরা পড়ে। জাকির ঘটনাস্থলে পৌঁছে সেগুলো উদ্ধার করে বন বিভাগের পরামর্শে তা বনে অবমুক্ত করেন।

নানা প্রজাতির বক যাতে শুঁটকি নষ্ট করতে না পারে সে জন্য আশপাশে জাল পেতে রাখা হয়। টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয় কীটনাশক মেশানো খাবার। সেই কীটনাশকযুক্ত খাবার খেয়ে শত শত বক মারা পড়ার ঘটনাও ঘটেছে এখানে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে জাকির প্রশাসনের চক্ষুশূল হয়েছেন। প্রভাবশালীরা তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতও করেছে। জাটকা ধরা বন্ধেও জাকির জেলেদের উদ্বুদ্ধ করেন।

ওরা ২১ জন : টাইগার টিমের যাত্রা শুরু ২০১০ সালে। রুহিতা গ্রামের আট তরুণ-যুবক রয়েছেন এই দলে। তাঁদের কেউ জেলে, কেউ মৌয়াল, কেউবা নিতান্তই খেটে খাওয়া মানুষ। সাহসী এসব মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে নিজ নিজ দায়বদ্ধতা থেকেই সংরক্ষিত বন ও সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় কাজ করছেন। রুহিতা ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিমের (ভিটিআরটি) দলনেতা জাকির হোসেন মুন্সি। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন—ইব্রাহীম সাজ্জাল, রফিকুল ইসলাম, আবু বক্কর দুলাল, হেলাল উদ্দিন, ফারুক কাজী, নজরুল ইসলাম ও আবদুর রহিম। এ ছাড়া রুহিতা গ্রামের ১৩ শিশু-কিশোর নিয়ে আরেকটি টিম গঠন করা হয়েছে। ছোট দলের সদস্যরা হলো—আবদুর রহমান, নুরুজ্জামান, ইব্রাহীম, রাকীব হোসেন, রাসেল মুন্সি, আরিফুর রহমান, আল আমিন, মহিব্বুল, রাজু, জুয়েল, বেলায়েত হোসেন, ওলিউল ও আবদুল হালিম। তারা সবাই পাথরঘাটা চৌধুরী মাসুম টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ ও রুহিতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

জাকির মুন্সি বলেন, ‘যখন অন্যের ট্রলারে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাই, তখন জাল ফেলে সুন্দরবনে প্রবেশ করি। বন থেকে হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা ফাঁদ উদ্ধার করে নিয়ে আসি। সাগর থেকে সুন্দরবনে আসতে কম করে হলেও ১০ লিটার তেল খরচ হয়। এই খরচ আমার পারিশ্রমিক থেকে কেটে নেওয়া হয়। আবার ডাঙায় বন্য প্রাণী আটকের খবর এলেই ছুটে যাই। এই কাজে চলে যায় অর্ধেক বেলা। আর মালিকও হাতে ধরিয়ে দেন অর্ধেক পারিশ্রমিক। এই করে খেয়ে না খেয়ে অভাব-অনটনে সংসার চলে। ’

পাথরঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য খলিলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্য প্রাণীর প্রতি জাকিরের রয়েছে একটা গভীর টান। সেই টানেই দিনমজুরের কাজ ফেলে বিপদাপন্ন প্রাণী উদ্ধারে ছুটে যান তিনি।

পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ শাহ মো. কামরুল হুদা বলেন, জাকির মুন্সি নিজ উদ্যোগে যে কাজটি করে যাচ্ছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। বন্য প্রাণী রক্ষায় তাঁর উদ্যোগ অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। সম্প্রতি লোকালয়ে আসা একটি অজগর তিনি উদ্ধার করে বনে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

ওয়াইল্ড টিমের প্রধান নির্বাহী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘বাঘ হলো সুন্দরবনের পাহারাদার। এই পাহারাদার থাকলে বন থাকবে। আর বন থাকলে বনের জীববৈচিত্র্য, বনের চারপাশ ও মানুষ থাকবে। সে কারণেই বাঘ রক্ষার্থে আমাদের এই প্রচেষ্টা। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে জাকির হোসেন মুন্সি কাজ করে যাচ্ছেন। ’

বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস আজ : বিশ্ব জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৮তম অধিবেশনে প্রতি বছরের ৩ মার্চকে বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস ঘোষণা করা হয়। আজ সেই দিন।

 


মন্তব্য