kalerkantho


এমপি লিটন হত্যা

মোবাইলে সুবলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খুনিরা অপারেশন চালায়

গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মোবাইলে সুবলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খুনিরা অপারেশন চালায়

এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ডা. আবদুল কাদের খানের সহযোগী ও তথ্যদাতা সুবল চন্দ্র সরকারকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। রংপুরের সেবা ক্লিনিকে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে নজরবন্দি থাকা সুবলকে চিকিৎসা শেষে গ্রেপ্তার করা হবে।

সুবল গাইবান্ধায় এমপি লিটনের গতিবিধি সম্পর্কে কাদের খান ও খুনিদের প্রধান তথ্যদাতা চন্দন কুমার রায়ের ভগ্নিপতি। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর এই সুবলের মোবাইলে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এমপি লিটনের বাড়িতে হত্যা মিশন চালায় খুনিরা।

সুন্দরগঞ্জ থানা পুলিশ সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে কাদের খানের সহযোগীদের অন্যতম মেহেদী হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সুবলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি জানতে পারে পুলিশ। মেহেদী জানায়, চন্দন রায়ের সূত্র ধরেই এমপি লিটন হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে সুবল জড়িত হয়। চন্দন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এলাকায় বিশেষ পরিচিত হওয়ায় নিজে আড়ালে থেকে ভগ্নিপতি সুবলকে তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করে। প্রথমদিকে এমপি লিটনের যেকোনো তথ্য সে চন্দনকেই দিত।

পরে কাদের খানের বিশ্বস্ততা অর্জন করায় সরাসরি সাবেক এই এমপিকে তথ্য দিতে শুরু করে সে। শুধু কাদের খান নয়, খুনিদেরও সে নিয়মিত তথ্য দিত। মোবাইল ফোনে সুবলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর খুনিরা এমপি লিটনের বাড়িতে অপারেশন চালায়।

সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান জানান, এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজনদের মোবাইল ফোনের যেসব কথোপকথন ট্র্যাক করা হয়েছে তাতে চন্দন, মেহেদী ও কাদের খানের সঙ্গে ফোনালাপে সুবলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, স্বার্থগত বিষয় নিয়ে এমপি লিটনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটায় চন্দনের পক্ষে প্রকাশ্যে এমপির এলাকায় অনুপ্রবেশ করা কঠিন ছিল। সে জন্য কিছুটা অপরিচিত সুবলকে তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োগ করে চন্দন। আর এ তথ্য সংগ্রহ করতে সুবল অনায়াসে লিটনের সর্বানন্দ ইউনিয়নের শাহবাজ গ্রাম ও সংলগ্ন বামনডাঙ্গায় ঘোরাফেরা করত। এমপি লিটন মূলত তাঁর বাড়ির গাবগাছ তলা ও বামনডাঙ্গা রেলস্টেশন সংলগ্ন আওয়ামী লীগ অফিসে নেতাকর্মীদের নিয়ে বৈঠক করতেন। সুবল এসব এলাকায় থেকে বিভিন্নজনের কাছে লিটন সম্পর্কিত তথ্য জেনে চন্দন কিংবা ডা. কাদেরের কাছে পৌঁছে দিত।

পুলিশ সূত্র জানায়, পিত্তথলির পাথর অপারেশনের জন্য ১৪ ফেব্রুয়ারি সুবল রংপুরে সেবা ক্লিনিকে ভর্তি হয়। পুলিশ তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে তাকে ওই ক্লিনিকে নজরবন্দি করে রেখেছে।

জানা গেছে, সুবল গোবেচারা ভঙ্গিতে চলাফেরা করলেও নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। তার বিরুদ্ধে ছিনতাই, ডাকাতি, দাঙ্গা-হাঙ্গামার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের খাতায়ও সে সুন্দরগঞ্জের একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও হত্যা মামলার আসামি। ১৯৮৭ সালে আন্ত জেলা ডাকাত দলের সদস্য হিসেবে পুলিশ তার বাড়ি রেইড করে অস্ত্র উদ্ধার করে। এই ডাকাতি মামলায় সে দীর্ঘদিন জেলও খেটেছে। আর খুনের মামলাটি চন্দন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মীমাংসা করে দেওয়ায় তা থেকে সুবল রেহাই পেয়ে যায়।

আরেকজন লাপাত্তা : কাদের খানের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ সহচর জাতীয় পার্টির বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন শাখার সভাপতি রেজাউল হককে এলাকায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ডা. কাদের খানের সম্পর্ক জানাজানি হওয়ার পর থেকে সে এলাকায় নেই। কাদের খান এমপি থাকাকালীন ও পরবর্তী সময়ে তাঁর সব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থেকেছে রেজাউল হক। কট্টর লিটনবিরোধী হিসেবেও এলাকায় তার পরিচিতি আছে।

খুনি ও সহযোগীদের ফাঁসির দাবিতে সমাবেশ : এমপি লিটন হত্যা মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর এবং খুনি ও সহযোগীদের ফাঁসির দাবিতে গতকাল চণ্ডীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা আহমেদের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন এম এ হাবীব সরকার, হান্নান সরকার, সমেস উদ্দিন বাবু, জাহাঙ্গীর আলম, সুনীল চন্দ্র, নাদিম হোসেন, আবুল কালাম আজাদ, দেলোয়ার হোসেন ও জাহেদুল ইসলাম জাভেদ। সুন্দরগঞ্জের ১৫টি ইউনিয়ন ও সব ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি, সম্পাদকসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা এতে অংশ নেয়।

রংপুর অফিস জানায়, কাদের খানের সহযোগী সুবল চন্দ্র সরকারকে রংপুরের সেবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নজরবন্দি করে রেখেছে পুলিশ। এমপি লিটন কিলিং মিশনের অন্যতম খুনি মেহেদী হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই সুবল কাদের খানের সোর্স হিসেবে কাজ করত এবং লিটনের গতিবিধি সম্পর্কে তাঁদের তথ্য প্রদান করত। কিডনির পাথর অপারেশনের জন্য গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সুবল রংপুর শহরের ধাপ এলাকায় সেবা হাসপাতালে ভর্তি হয়। পুলিশ তদন্তপূর্বক তথ্য-উপাত্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে ওই ক্লিনিকে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে নজরবন্দি করে রাখে। হাসপাতালে সুবলের পাহারায় রয়েছেন একজন এসআইসহ তিন পুলিশ সদস্য।

গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হাসপাতালের বিছানায় সুবল জানায়, ২৭ ফেব্রুয়ারি তাকে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশের কারণে তাকে আটকে রাখা হয়েছে। তিন দিন তাকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছিল। গতকাল দুপুরে তার হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়।

হাসপাতালের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম জানান, রোগী সুবল এখন অনেকটাই সুস্থ। তিন দিন আগে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা থাকলেও পুলিশের কথায় তাকে আটকে রাখা হয়েছে।


মন্তব্য