kalerkantho


ভুয়া নথিতে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা

সেই সবিতা ব্যানার্জিকে খুঁজছে প্রশাসন

আপেল মাহমুদ   

২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সেই সবিতা ব্যানার্জিকে খুঁজছে প্রশাসন

সবিতা ব্যানার্জি

মা সেজে জাল কাগজপত্র দিয়ে অন্যের জমি নিজের দাবি করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এই অপকর্ম ঘটানো অভিনেত্রী সবিতা ব্যানার্জিকে খুঁজছে প্রশাসন।

জাল কাগজপত্র দিয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছিলেন সবিতা। সেই নথি শনাক্ত হওয়ার পর এখন তিনি নিজে আর এলএ শাখায় যোগাযোগ করছেন না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এলএ শাখায় পাওয়া গেলে সবিতার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁকে গ্রেপ্তার করে আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশও ডাকা হতে পারে। এটা আঁচ করতে পেরেই তিনি নিজে আর যোগাযোগ করছেন না।

তবে সবিতা নিজে যোগাযোগ না করলেও তাঁর পক্ষে একজন সার্ভেয়ার তদবির করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সবিতার ভুয়া নথি শনাক্তকারী হিসেবে সই দিয়েছিলেন ওই সার্ভেয়ার।

এ জালিয়াতি নিয়ে গত ২২ ফেব্রুয়ারি কালের কণ্ঠে ‘ভুয়া নথিতে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা, নিজেই মা সাজলেন অভিনেত্রী সবিতা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সর্বত্র এ নিয়ে আলোচনা চলে। এলএ শাখাও নড়েচড়ে বসে। সবিতার ভুয়া নথির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে খোদ এলএ শাখা থেকেই।    

পারিবারিক সূত্র জানায়, একসময় চলচ্চিত্র ও মঞ্চে অভিনয় করা সবিতার দুই বোন ও এক ভাই রয়েছেন। তাঁরা হলেন রীতা ব্যানার্জি, মিতা ব্যানার্জি ও বাবুল ব্যানার্জি। তাঁদের মা অরুণা ব্যানার্জি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৫ সালের ২১ অক্টোবর মারা যান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর ভাটারা থানাধীন জোয়ার সাহারা মৌজায় অরুণা ব্যানার্জির সাড়ে ১৬ শতাংশ জমি ছিল। ১৯৮২ সালে ছাবেদ আলী ও তাঁর ওয়ারিশদের কাছ থেকে ওই জমি কিনেছিলেন তিনি। এরপর বাবুল ব্যানার্জি একমাত্র ওয়ারিশ হিসেবে ওই জমি আলতাফ হোসেনের কাছে বিক্রি করে দেন। পরে আলতাফ হোসেন সেই জমির খাজনা খারিজ করে একটি আবাসন কম্পানির কাছে বিক্রি করে দেন। সেই কম্পানি নামজারির পর খাজনা পরিশোধ করে তা নিজেদের ভোগদখলে রেখেছে। ৩০০ ফুট রাস্তার জন্য ওই জমি পরে সরকার অধিগ্রহণ করে। এই অবস্থায় সবিতা ব্যানার্জি নিজেই মা অরুণা ব্যানার্জি সেজে ক্ষতিপূরণের টাকা তোলার জন্য ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ঢাকা জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় জমা দেন। এ জন্য মায়ের নামে নিজেই জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন ও নকল দলিল তৈরি করেছেন তিনি।

কালের কণ্ঠের কাছে সবিতা ব্যানার্জির পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছে, ক্ষতিপূরণ পেতে জালিয়াতি ছাড়াও সবিতা আরো অনেক প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। এতে লজ্জায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে। তাঁর কারণে সমাজে মুখ দেখাতে পারছি না আমরা। সন্ধান পেলে আমরা তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেব, যাতে আমাদের মানসম্মান আর নষ্ট না হয়।

বাবুল ও রীতা ব্যানার্জি জানান, শুধু ভুয়া মালিক সেজে এলএ শাখা থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা ছাড়াও এর আগে সবিতা ঢাকার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে একটি হলফনামা দিয়ে তাঁদের সব সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি ওই হলফনামায় উল্লেখ করেন, মায়ের চিকিৎসার জন্য তিনি তিন লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। একজন মানুষ কতটা নিচে নামতে পারলে মায়ের চিকিৎসার নামে ব্যয় করা অর্থের কথা বলতে পারে। হলফনামায় তিনি তাঁদের পরিবার নিয়ে নানা মিথ্যা তথ্য দিয়ে বানোয়াট কাহিনিও সাজান।   

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, অতীতে ভুয়া নথি দাখিল করে এলএ শাখা থেকে জালিয়াতচক্র শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পের সরকারি জমির মালিক সেজে চন্দন সাহা নামের এক প্রতারক প্রায় কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। হাতিরঝিলের মধ্যে থাকা ওয়াক্ফ ও কোর্ট অব ওয়ার্ডসহ সরকারি মালিকানাধীন অনেক সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ ব্যক্তিবিশেষকে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে অসংখ্য অডিট আপত্তি থাকলেও তার কোনোটারই নিষ্পত্তি হয়নি। জালিয়াতচক্র সব সময় আড়ালেই থেকে গেছে। এতে এলএ শাখার ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে।

এই অবস্থায় সবিতার জালিয়াতির ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বর্তমান জবাবদিহিমূলক জেলা প্রশাসন বহাল থাকার পরও কিভাবে এমন জালিয়াতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সবিতার ঘটনা জানাজানি হওয়ায় প্রকৃত ভূমি মালিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কারণ জালিয়াতচক্রের সঙ্গে এলএ শাখার কেউ কেউ জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষতিপূরণের চেক পাস হলে জালিয়াত ও সহযোগিতাকারী কর্মচারীরা সেই টাকা ভাগ করে নেন।

উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা মোনায়েম হোসেন বলেন, ‘আমাদের পারিবারিক ৩০০ বিঘা জমি ছিল। পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত সাতবার আমরা জমি অধিগ্রহণের শিকার হয়েছি। কোনো ক্ষেত্রেই পুরো টাকা পাইনি। ক্ষতিপূরণের টাকা তুলতে গিয়ে উল্টো অনেক টাকা-পয়সা খরচ করেছি। বাবা উত্তরা থেকে জনসন রোডের ডিসি অফিসে ঘুরতে ঘুরতে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে অল্প বয়সে মারা যান। এবার ৩০০ ফুট রাস্তার জন্য আমাদের শেষ সম্বল ৬ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এখনো ক্ষতিপূরণের টাকা পাইনি। তবে শুনতে পাচ্ছি, একাধিক জালিয়াতচক্র ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা ভয়ে আছি শেষ পর্যন্ত আমাদের শেষ সম্বলের বিনিময়ে পাওনা ক্ষতিপূরণের সেই টাকাটা পাব কি না। ’

অন্য যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তারা বলছে, কেউ জাল নথিপত্র দাখিল করে ক্ষতিপূরণের টাকা দাবি করলে তদন্ত করে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। এতে অন্য জালিয়াতরা শিক্ষা পাবে। তবে বাস্তবে এলএ শাখার দুর্নীতি ও জালিয়াতির ঘটনা রোধে কেউ কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।


মন্তব্য