kalerkantho


তুই নাকি আমারে মারবি-বলতেই শুরু হয় চাপাতির কোপ

প্রেম নিয়ে বিরোধে স্কুল ছাত্র খুন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



তুই নাকি আমারে মারবি-বলতেই শুরু হয় চাপাতির কোপ

সজীব, আল-আমিন, ইয়ামিন, রুবেল ও সৌরভ—সবার বয়স ১৬ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। সব সময় একসঙ্গেই চলাফেরা করত তারা। এলাকাবাসী তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলেই জানত। মঙ্গলবার রাতে তাদের চারজন মিলিত হয়েছিল মহল্লার মোড়ে। সবাই ভেবেছিল অন্য দিনের মতোই আড্ডা দিচ্ছে তারা। সাক্ষাতের পরই সজীব হঠাৎ সৌরভকে উদ্দেশ করে বলে, ‘তুই নাকি আমারে মারবি?’ তখনই কোমরে লুকিয়ে থাকা চাপাতি বের করে সজীবকে কোপাতে শুরু করে সৌরভ। এরপর দৌড়ে পালায়। আহত সজীব চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বুধবার সকালে মারা যায়।

রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় হলি ক্রিসেন্ট স্কুল গলির মোড়ে লোকজনের সামনেই ঘটে এ ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই নৃশংস এ হত্যাকাণ্ড ঘটে যায়।

স্থানীয়রা জানায়, সজীব হলি ক্রিসেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণিতে পড়ত।

রুবেল হামলার সময় সৌরভের সঙ্গে ছিল। তাকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছে আল-আমিনসহ অন্যরা। সৌরভকে পালাতে সহায়তার অভিযোগে স্থানীয় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সাঈদকেও আটক করেছে পুলিশ। গতকাল রাত পর্যন্ত সৌরভকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।  

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ খুনের নেপথ্যে রয়েছে প্রেমঘটিত বিরোধ। আল-আমিন ও ইয়ামিন সম্পর্কে সজীবের মামা। আল-আমিনের সঙ্গে এক তরুণীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই তরুণীর খালার সঙ্গে প্রেম চলছে সৌরভের। ওই খালা আল-আমিনকে শাসাতে বলেছিল সৌরভকে। এরপর সৌরভ আল-আমিনকে হুমকি দেয় ও মারধর করে। এ নিয়ে সজীবের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়। তার জের ধরেই ঘটে হত্যাকাণ্ড।

পুলিশ ও স্থানীয় কয়েকটি সূত্র জানায়, সৌরভসহ পুরো দলটিই মাদকাসক্ত। সম্প্রতি একজনের প্রেমিকার সামনে অন্যজন গাঁজা চাইলে তা নিয়ে ঝগড়া বাধে। এটিও বিরোধের একটা কারণ ছিল।  

মিরপুর থানার ওসি ভূইয়া মাহবুব হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রেমঘটিত বিষয়ের জের ধরে সজীবকে হত্যা করে তারই বন্ধু সৌরভ ও রুবেল। রুবেলকে গ্রেপ্তার করা হলেও সৌরভ পলাতক রয়েছে। তাকে ধরতে অভিযান চলছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল হত্যার দায় স্বীকার করেছে। ’

সজীবের পরিবার থাকে মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় ১৭৮/১ নম্বর জ্যোতি ভিলায়। সেখানে গিয়ে জানা গেছে, ওই বাড়ির চারতলায় বোন সুমির সঙ্গে থাকত সজীব। তার বাবার নাম আবদুর রশিদ। গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদর থানার দরবারপুরে। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সজীব ছিল সবার ছোট। আল-আমিন ও ইয়ামিন সজীবের ভগ্নিপতি আল মাহমুদ বাবুর ভাগ্নে।

সজীবের ভগ্নিপতি বাবু ও বড় ভাই রাজু কালের কণ্ঠকে বলেন, সজীবের বয়স যখন দুই-তিন মাস তখন তার মা মারা যায়। পরে তার বাবা আরেকটি বিয়ে করেন। ৯ বছর বয়স থেকে সজীব পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় বোন সুমির বাসায় থেকে পড়ালেখা করত। সমবয়সী হওয়ায় আল-আমিন ও ইয়ামিনের সঙ্গে চলাফেরা করত সে। চার দিন আগ থেকে আল-আমিনকে পর পর তিনবার মারধর করে সৌরভ। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ঝামেলা চলছিল।

স্বজনদের দাবি, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সজীব ও আল-আমিন ওই স্কুল গলির দোকানে যায়। এ সময় সেখানে আসে সৌরভ। সৌরভকে দেখে সজীব তাকে বলে, ‘তুই নাকি আমারে মারবি? এখন তো পাইছিস, তো মার। ’ এ সময় দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ কথা-কাটাকাটি চলতে থাকে। সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হয় রুবেল ও আরেক ব্যক্তি। তারা সজীবকে জাপটে ধরে রাখে। সৌরভ কোমর থেকে চাপাতি বের করে সজীবের ডান ঘাড়ে ও পিঠে দুটি কোপ দিয়ে পালিয়ে যায়। তখন আল-আমিন ও আশপাশের লোকজন রুবেলকে ধরে ফেলে। বাবু খবর পেয়ে সজীবকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় দুই হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকালে সজীব মারা যায়।

পশ্চিম শেওড়াপাড়ার হলি ক্রিসেন্ট স্কুল গলির ৭২৯ নম্বর বাড়ির সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। রাস্তার উল্টো পাশেই মনি ফার্মা নামে একটি ওষুধের দোকান। ওই দোকানের ব্যবসায়ী আশরাফুল আলম কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দোকানেই ছিলাম। সৌরভ এখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। সব সময় ওরা এখানেই আড্ডা দিত। আমি দেখলাম, যে ছেলেটা মারা গেছে সেসহ দুজন এলো। একটু পরে শুনি চিত্কার। ঘটনা ঘটে গেছে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে। ’

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সজীব ও আল-আমিন গিয়ে সৌরভকে জিজ্ঞাসা করে, তুই নাকি আমারে মারবি। তখনই রুবেল ও আরেকজন আসে সেখানে। এরপর সৌরভ চাপাতি বের করে সজীবকে কোপ দেয়। আল-আমিন একটু সরে গিয়ে আবার রুবেলকে ধরে ফেলে। ’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঘটনার সময় পাশের সিলসিলা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিক সাঈদও সেখানে যায়। তিনি আল-আমিনসহ অন্যদের ধরে ফেলায় সৌরভ সহজে পালিয়ে যায়। এ কারণে সাঈদকে আটক করেছে পুলিশ। সাঈদের রেস্টুরেন্টে আল-আমিন, সৌরভ, সজীব, ইয়ামিন ও রুবেল আড্ডা দিত।  

তবে আল-আমিন প্রেমঘটিত বিরোধের কথা অস্বীকার করে বলে, ‘ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সৌরভ আমাকে তিন দিন মারধর করেছে। সে সজীবকে মারবে বলেও জানিয়েছিল। বিষয়টি সজীবকে বললে মঙ্গলবার রাতে সৌরভকে দেখে সজীব এ কথা জিজ্ঞাসা করে। বলার সঙ্গে সঙ্গে সৌরভ চাপাতি দিয়ে কোপ দিতে থাকে। ’

জানা গেছে, সৌরভ আগে রেস্টুরেন্টকর্মী ছিল। সম্প্রতি একটি ইলেকট্রিকের দোকানে কাজ নেয় সে। তার গ্রামের বাড়ি পাবনায়। পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় সে তার ফুফুর বাসায় থাকে। গতকাল ওই বাসা তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। বন্ধ ছিল সাঈদের রেস্টুরেন্টটিও। রুবেল গার্মেন্ট শ্রমিক।

গতকাল আসরের নামাজের পর পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় জানাজা শেষে দাফনের জন্য কিশোরগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয় সজীবের লাশ। এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গতকাল রাতে মিরপুর থানায় মামলা প্রক্রিয়াধীন ছিল।


মন্তব্য