kalerkantho


৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার বই বিক্রি

চাহিদার শীর্ষে উপন্যাস

নওশাদ জামিল   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চাহিদার শীর্ষে উপন্যাস

শেষ মুহূর্তে বই কেনার ধুম। ছবি : কালের কণ্ঠ

বইপ্রেমী লাখো মানুষের পদচারণে মুখর দিনগুলো ফুরাল—ভাঙল মিলনমেলা। গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় একযোগে নিভে গেল আলোর রোশনাই।

পর্দা নামল প্রাণের আয়োজনের। শেষ হলো বইপ্রেমী মানুষের প্রাণের উৎসব অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৭। একই সঙ্গে শুরু হলো প্রতীক্ষা আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির।

বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সংশ্লিষ্ট অংশ আজ বুধবার থেকে হয়ে পড়বে সুনসান। এই নিস্তব্ধতার প্রভাব পড়বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, শাহবাগসহ সংশ্লিষ্ট নানা অংশেও। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছগাছালি, বাংলা একাডেমির বহেড়া, দেবদারু কিংবা সেগুনগাছ থেকে পাতা ঝরবে পথে। শুধু থাকবে না বইপ্রেমী মানুষের ভিড়, বাতাসে ভাসবে না নতুন বইয়ের গন্ধ।

মাসব্যাপী আয়োজন শেষে লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের অভিমত—সব মিলিয়ে এবার মেলার পরিবেশ ছিল চমৎকার। রাজনৈতিক অবস্থা ভালো থাকায় মেলায় তার ইতিবাচক ছাপ পড়েছে।

প্রচুর মানুষের সমাগম হয়েছে, বিক্রিও হয়েছে দেদার।

বাংলা একাডেমির তথ্যানুসারে, এবার মেলায় বই প্রকাশিত হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। তবে সংখ্যাটা চার হাজারের বেশি হতে পারে। কেননা অনেক বইয়ের খবরই তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়েনি। এবার মেলায় মোট ৮৬৭টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে।

গ্রন্থমেলার প্রথম সপ্তাহেই প্রকাশিত হয়েছিল বেশির ভাগ জনপ্রিয় লেখকের বই। পাঠকের আগ্রহের শীর্ষেও ছিল অনেকের বই। আগামী থেকে প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ প্রচুর বিক্রি হয়েছে। মেলায় প্রথম দিনই তাম্রলিপি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল মুহম্মদ জাফর ইকবালের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ‘রিটিন’। জানা গেছে, এবার বইটি বিক্রি হয়েছে বেশ ভালো। অনন্যা থেকে প্রকাশিত ইমদাদুল হক মিলনের মুক্তিযুুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘নয় মাস’-এর কাটতি ছিল বেশ। জানা যায়, পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামালের ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস ‘অগ্নিকন্যা’ ভালো বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত তাঁর রোমান্টিক উপন্যাস ‘রূপবতী’ বইটির কাটতি ছিল বেশ। তাম্রলিপি থেকে প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজের লেখা ‘শেষ চিঠি’ বইটি পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টি করেছে, বিক্রিও হয়েছে প্রচুর। এ ছাড়া একই প্রকাশনী থেকে ইয়াসমীন হকের লেখা ‘সাস্টের ২২ বছর’ বইটি ভালো বিক্রি হয়েছে।

ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের লেখা ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস’ বইটির বেশ চাহিদা ছিল। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের ‘আন্দোলন-সংগ্রামে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ বইটিও প্রচুর বিক্রি হয়েছে বলে জানা যায়। হরিশংকর জলদাসের উপন্যাস ‘অর্ক’ এবং রকিব হাসানের ‘ভ্যাম্পায়ার’ ভালো পাঠক টেনেছে।

অন্যপ্রকাশে এবারও আগ্রহের শীর্ষে ছিল হুমায়ূন আহমেদের বই। জনপ্রিয় এই লেখকের ‘মিসির আলী দশ’ সংকলনটি আছে বেশি বিক্রীত বইয়ের তালিকায়। প্রয়াত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক অনূদিত নাটকের গ্রন্থ ‘হ্যামলেট’ বিক্রি হয়েছে বেশ। আনিসুল হকের উপন্যাস ‘প্রিয় এই পৃথিবী ছেড়ে’ ও শাহাদুজ্জামানের উপন্যাস ‘একজন কমলালেবু’ ভালো বিক্রি হয়েছে। শাহরিয়ারের কিশোর রচনা ‘বেসিক আলী নয়’ প্রচুর বিক্রি হয়েছে।

আগ্রহের শীর্ষে হুমায়ূন আহমেদের বই : জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বই এবারও গ্রন্থমেলায় পাঠকের আগ্রহের শীর্ষে ছিল। প্রয়াত এই লেখকের নতুন কোনো বই না এলেও পুরনো বইগুলোর কাটতি ছিল বেশ। আর পাঠকদের কাছে হুমায়ূন আহমেদকে তুলে ধরতে নানা আঙ্গিকে সংকলন ও সমগ্র প্রকাশ করেছেন প্রকাশকরা। সেসবও বেশ বিক্রি হয়েছে।

অনেক প্রকাশক বিষয় ধরে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ও গল্পগুলোকে এক মোড়কে এনে প্রকাশ করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। সংখ্যায় তা ১২৫টিরও বেশি। অন্যপ্রকাশের স্টলে ভিড় সব সময় লেগেই ছিল হুমায়ূন আহমেদের বই কেনার জন্য।

কাকলী থেকে হুমায়ূন আহমেদের জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছে ৩৩টি বই। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে আরো কয়েকটি। মুক্তিযুদ্ধের বই আগ্রহজাগানিয়া : মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে লেখা নানা রচনা পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের অজানা ইতিহাস, যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথন, যুদ্ধের ভয়াবহতা, পাকিস্তানিদের বর্বরতা, যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশ ইত্যাদি বিষয় গবেষণা, প্রবন্ধ, ইতিহাস রচনা, উপন্যাস, গল্প, কবিতা হয়ে বারবার ফিরে আসে। আসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা।

প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইগুলোর প্রতি পাঠকের অন্য রকম আগ্রহ রয়েছে। ছোট-বড় সব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই প্রকাশ করেছে। বইগুলোর কাটতিও ছিল বেশ ভালো। এবারের মেলায় এক অনন্য সংযোজন তাম্রলিপি থেকে প্রকাশিত ৬৪টি জেলার ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস’ শিরোনামে ৬৪টি বই।

বাংলা একাডেমির বইয়ে আগ্রহ : জানা গেল, প্রায় ছয় হাজার প্রকাশনা রয়েছে বাংলা একাডেমির। এর মধ্যে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে এক হাজার ৪০০ বই। এবারের মেলায় বাংলা একাডেমির ৬৬টি নতুন বই এসেছে। পুনর্মুদ্রণ হয়েছে আরো ৩৫টি। সব মিলিয়ে এবারের মেলায় বাংলা একাডেমির বই ছিল ১০১টি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এবার বিক্রির শীর্ষে ছিল অভিধান।

মোট বিক্রি : গ্রন্থমেলায় এবার মোট বিক্রি হয়েছে ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার বই। তবে সংখ্যাটা আরো বেশি বলে জানা যায়। গতবার পুরো মেলায় ৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। আর মেলা শেষের আগের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলা একাডেমি মোট এক কোটি ৫৪ লাখ ৫৪ হাজার ৩০৬ টাকার বই বিক্রি করেছে। ২০১৬ সালের তুলনায় এই বিক্রি ২২ লাখ টাকা বেশি।

পুরস্কার প্রদান : মেলার শেষ দিনে সমাপনী অনুষ্ঠানে গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এ বছর বিভিন্ন গুণীজনের নামে পুরস্কার ঘোষণা করেছে মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। ২০১৬ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণ-মানসম্মত সর্বাধিকসংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য জার্নিম্যান বুকসেক চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার-২০১৭, ২০১৬ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য রফিকুন নবীর ‘দেশসেরা জগেসরা শিল্পীকথা’ গ্রন্থের জন্য প্রথমা প্রকাশন, পাভেল রহমানের ‘সাংবাদিকতা আমার ক্যামেরায়’ গ্রন্থের জন্য মাওলা ব্রাদার্স, রনজিত কুমার মণ্ডলের ‘আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়’ গ্রন্থের জন্য পুথিনিলয়কে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০১৭, ২০১৬ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণ-মান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য চন্দ্রাবতী একাডেমিকে রোকনুুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার-২০১৭ এবং ২০১৭ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাতিঘর, সংবেদ ও পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০১৭ প্রদান করা হয়েছে।


মন্তব্য