kalerkantho


প্লাস্টিকের কারখানা গুদামে পুরান ঢাকা চরম ঝুঁকিতে

এস এম আজাদ   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্লাস্টিকের কারখানা গুদামে পুরান ঢাকা চরম ঝুঁকিতে

প্লাস্টিকের এ রকম অসংখ্য ছোট গুদাম পুরান ঢাকায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

পুরান ঢাকার উর্দু রোড থেকে শুরু হয়ে কেবি রুদ্র লেন চলে গেছে চাঁদনীঘাটের দিকে। সামনে এগোলেই ওয়ালটার লেন, ইসলামবাগ। পাশে আলীগড় ঘাট, বেড়িবাঁধ। এসব এলাকায় রাস্তার দুই পাশে প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামাল আর রাসায়নিকের গুদাম। মাঝে মাঝে ছোট ছোট কারখানা। পলিথিনের কারখানাও রয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির নিচেই হয় গুদাম, নয় কারখানা।

স্থানীয়রা বলে হার্ড-মুলামের ব্যবসা।

হাজার হাজার মানুষ কাজ করে এসব প্রতিষ্ঠানে। তবে এগুলো যে মৃত্যুর কারণ হতে পারে সে কথা খুব একটা জানা নেই তাদের। পুরান ঢাকায় সাম্প্রতিক আগুনের ঘটনার বেশির ভাগ এসব গুদাম-কারখানা থেকে ঘটেছে।

সর্বশেষ গত শনিবার পশ্চিম ইসলামপুরে বেড়িবাঁধ এলাকার প্লাস্টিক গুদাম থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। গত তিন বছরে পুরান ঢাকার প্লাস্টিকের গুদাম ও কারখানায় অর্ধশতাধিক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

২০১০ সালে নিমতলীতে রাসায়নিকের গুদামে অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক লোকের মৃত্যু হয়। এরপর তালিকা করে ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা কেরানীগঞ্জে সরানোর উদ্যোগ নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বেশির ভাগই সরানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি। তবে এখনো পুরান ঢাকার গলিতে গলিতে বাড়ির নিচতলায় রাসায়নিকের গুদাম ও দোকান দেখা যায়। সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিস এ জাতীয় ৪০০ বাড়ি শনাক্ত করেছে। সবগুলো অনুমোদনহীন।

জানা গেছে, পুরান ঢাকার কয়েক লাখ মানুষকে ঝুঁকিমুক্ত করতে শিগগিরই যৌথ অভিযান চালাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, র‌্যাব ও বিস্ফোরক পরিদপ্তর। তবে এর আওতায় থাকছে না প্লাস্টিক কাঁচামালের গুদামগুলো।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্লাস্টিকের দানা বা কাঁচামাল দাহ্য পদার্থ। এগুলো অগ্নিকাণ্ডের অবশ্যম্ভাবী কারণ নয়। তবে আগুন ধরে গেলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ফলে প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ে।

একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের কারণে রাসায়নিক গুদামের সঙ্গে প্লাস্টিকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরানোর দাবিও তুলেছে স্থানীয় লোকজন। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্লাস্টিক পণ্যের কারখানা যদি না থাকে তাহলে আগুনের ঝুঁকি নেই।

ডিএসসিসির সচিব খান মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরাতে তত্পরতা চালাচ্ছি। ফায়ার সার্ভিস একটি সার্ভে করে আমাদের দিয়েছে, নোটিশ দিয়েছে। আমরা গুদাম মালিকদের নোটিশ দিয়েছি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ বলেন, ‘আমরা ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম-কারখানা শনাক্ত করে সিটি করপোরেশনকে তালিকা দিয়েছি। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা যে অ্যাকশনে যাব, সে সাপোর্ট আমাদের নেই। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটও পাচ্ছি না। ’

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম বলেন, ‘প্লাস্টিকের দানা দাহ্য পদার্থ। যদিও এগুলো থেকে আগুন কম লাগে। কারণ, জ্বলতে সময় নেয়। তবে আগুন ধরে গেলে দ্রুত ছড়ায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলে। এ আগুন নেভানো কঠিন। ’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অর্গানিক কেমিক্যাল হওয়ায় এগুলো আমাদের আওতায় পড়ে না। এর পরও ইসলামবাগের ঘটনাটি আমরা তদন্ত করে দেখব। ’

শামসুল আলম দাবি করেন, নিমতলী ট্র্যাজেডির পর পুরান ঢাকার ৮০০ রাসায়নিক গুদামের তালিকা করা হয়। প্রায় সবই কেরানীগঞ্জে সরানো হয়েছে। সেখানে নতুন করে রাসায়নিক গুদামের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না, পুরনোগুলো নবায়ন করা হচ্ছে না।

সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় নিমতলী, চকবাজার, আরমানিটোলা, মিটফোর্ড, চাঁদনীঘাট, ইসলামবাগ, লালবাগ ও আশপাশে বহুতল ভবনের পার্কিং স্পেস বা নিচতলায় রাসায়নিকের গুদাম দেখা গেছে। অন্যান্য তলায় বাসা বা কম্পানি অফিস রয়েছে। অনেক ভবনে নিচতলায় রাসায়নিক গুদাম ও ওপরের বিভিন্ন তলায় প্লাস্টিক পণ্যের কারখানা রয়েছে। নিচতলায় প্লাস্টিকের গুদামও আছে।

এলাকাবাসী জানায়, রাসায়নিক পদার্থের গন্ধে বাতাস দূষিত। নানা ধরনের রোগবালাই হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব কারখানা ও গুদাম সরানোর দাবি জানায় তারা।

আরমানিটোলার এসি রায় রোডের একটি দুই তলা আবাসিক ভবনের নিচতলায় মেসার্স কেমিক্যাল সেন্টারের গুদাম। মালিক উত্পল রায় বলেন, কয়েক পুুরুষ ধরে তাঁরা এ ব্যবসা করছেন। ব্যবসা বন্ধ করে দিলে পরিবারকে না খেয়ে মরতে হবে।

প্রসঙ্গত, তাঁর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি।

কেবি রুদ্র লেনের প্লাস্টিক কাঁচামালের মজুতদার সোহরাব হোসেন বলেন, ‘আমাদের এগুলো কেমিক্যাল না। এখানে কারখানা নেই। ফলে আগুনের ঝুঁকির কী আছে!’

পশ্চিম ইসলামবাগের বেড়িবাঁধের ইটওয়ালা ঘাটের আশপাশে শতাধিক টিনশেড দোতলা বাড়ি ও পাকা বাড়ি রয়েছে। প্রতিটি বাড়ির নিচেই প্লাস্টিক পণ্যের গুদাম। গত শনিবার যেখান থেকে আগুন লেগেছিল সেই বাড়ির মালিক দুলাল ভুঁইয়া। পাশেই হারুনুর রশীদ, আব্দুর রাজ্জাকসহ সাতজনের বাড়ি। রাজ্জাকের বাড়ির ভাড়াটিয়া মো. কেবলা বলেন, ‘প্রতিটি বাড়ির নিচে মুলামের কারবার। এগুলার কারণে আমরা শেষ হইয়া গেলাম। ’

রহমত আলী, আব্দুল মাজেদ ও আরো কয়েকজন জানান, তাঁরা প্লাস্টিকের দোকান ও কারখানায় কাজ করেন। পরিবার নিয়ে ওই এলাকায় থাকেন। তাঁরা জানান, গত তিন বছরে ইসলামপুরসহ আশপাশের প্লাস্টিক গুদাম ও কারখানায় কমপক্ষে অর্ধশত অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

২০১০ সালের ৩ জুন নবাব কাটরার নিমতলীর একটি বাড়ির নিচতলায় রাসায়নিকের গুদামে অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন মারা যায়। দগ্ধ হয় দুই শতাধিক মানুষ। ওই ঘটনায় ৪০ জন স্বজনকে হারান আসমা আক্তার শান্তা। তিনি বলেন, ‘আমাদের কী গেছে আমরা জানি। এ বেদনা কাউকে বোঝানো যাবে না। ’ স্বজনহারা আসমা আক্তার শান্তা, সাকিনা আক্তার রত্না ও উম্মে ফারওয়া আক্তার রুনাকে কন্যা হিসেবে গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁরা বলেন, রাসায়নিক গুদাম সরানো না হলে যেকোনো সময় নিমতলীর মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পোস্তায় আগুনে পুড়ে দুই বছরের এক শিশু নিহত হয়। ১৬ মে আলুবাজারে জুতার কারখানার আগুনে তিনজন দগ্ধ হয়। ২২ জুন লালবাগের নবাবগঞ্জে রাসায়নিকের গুদামের আগুনে দুজন নিহত হয়। গত ২৭ জানুয়ারি বংশালে জুতার কারখানার আগুনে দুজন নিহত ও দুজন দগ্ধ হয়। ২০১৫ সালের ১৯ ও ২৩ নভেম্বর সোয়ারীঘাটে ও রহমতগঞ্জে পলিথিন কারখানায় আগুন লেগেছিল। ২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল চকবাজারের ছোট কাটরায় পারফিউমের গুদামে আগুনে নিহত হয় এক ব্যক্তি। গত বছর ইসলামবাগ, লালবাগ ও আশপাশে রাসায়নিক, পলিথিন ও প্লাস্টিক কারখানায় অন্তত দুই ডজন আগুনের ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, প্লাস্টিক কাঁচামালে আগুনের ঝুঁকি নেই। আগুন লাগে কারখানার কারণে। শনিবারের ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সেটা আমাদের কারোর প্রতিষ্ঠান থেকে হয়েছিল বলে আমার জানা নেই। ’ গুদাম সরানোর নোটিশ তাঁদের কেউ দেয়নি বলে তিনি জানান। ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (অপারেশনস) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদামের ৯৮ শতাংশই অনুমোদনহীন। এসব গুদাম থেকে যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইব্রাহিম খান বলেন, ‘রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থের ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা সরানোর কাজ সিটি করপোরেশনের। তারা আমাদের কাছে সহায়তা চেয়েছে। তারা যখনই অভিযানে যাবে তখনই আমরা সঙ্গে যাব। ’


মন্তব্য