kalerkantho


দুর্ঘটনায় মেডিক্যাল ছাত্রী সাদিয়ার মৃত্যু

কান্নায় বুক ভাসাচ্ছে সবাই

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কান্নায় বুক ভাসাচ্ছে সবাই

পড়ালেখায় ছিলেন মেধাবী। ছিল নাচ-গানের প্রতি ঝোঁক।

সদালাপী, বন্ধুবৎসল এই মেয়েটি ছিলেন মা-অন্তপ্রাণও। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা না পাওয়া তাঁকে কষ্ট দিত। ইচ্ছা ছিল বিনা মূল্যে গরিবকে চিকিৎসা দেওয়ারও। সব ছাপিয়ে মা-বাবার প্রতি আনুগত্য ছিল তাঁর বড় গুণ। বাড়ি থাকলে মনে হতো না তিনি আছেন। বাড়িতে আসার খবর পেলেই বান্ধবীরা ছুটে আসত, তাঁর সঙ্গে একটু ভালো সময় কাটানোর আশায়। এমন মেধাবী ও লক্ষ্মী মেয়েটি আর নেই—ভাবতেই পারছেন না তাঁর মা-বাবা। নির্বাক হয়ে পড়েছেন তারা। এমন গুণী বান্ধবীকে হারানোর কষ্ট বুক চেপে সহ্য করতে পারছে না তাঁর স্কুল ও কলেজজীবনের একসময়ের সহপাঠীরাও।

রাজধানীর পুরান ঢাকায় বাসের ধাক্কায় মারা যাওয়া মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী সাদিয়া হাসানের মৃতদেহ পৌঁছার পর থেকে এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিই সৃষ্টি হয়েছে তাঁর রাজশাহীর বাড়িতে। আর মাত্র কয়েক মাস পরই যে মেয়েটির ডাক্তার হয়ে বাড়ি ফেরার কথা, তাঁর এমন মৃত্যুতে শোকাহত মা-বাবাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো অবস্থা যেন কারো নেই। যারাই আসছে দুর্ঘটনার খবর শুনে, তারাও কান্নায় বুক ভাসাচ্ছে।

নিহত সাদিয়া হাসান রাজশাহী নগরীর হড়গ্রাম এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা হাসানুজ্জামান বুলুর মেয়ে। মা কলেজ শিক্ষক শাহীন সুলতানা জলি। তিনি পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত শনিবার রাত ৮টার দিকে তাঁর মৃতদেহ রাজশাহীর বাড়িতে পৌঁছে। পরে রাত ১০টার দিকে তাঁকে দাফন করা হয়। দাফনের সময় এবং গতকালও তাঁর বাড়িতে আসা আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও বান্ধবীদের মুখে মুখে তাঁর নানা গুণের কথা শোনা যায়। সবার কথায় ঝরে পড়ছিল আফসোস—গুণবতী মেয়েটির এমন মর্মান্তিক মৃত্যু হলো! ক্ষোভও ছিল অনেকের মুখে, এভাবেই বেপরোয়া গাড়িচালকদের কারণে প্রাণ দিতে হবে মানুষকে!

এর আগে গত শনিবার সকাল ৭টার দিকে পুরান ঢাকার বংশাল এলাকায় বেপরোয়া বাসচালকের কারণে প্রাণ হারান সাদিয়া। মাকে নিয়ে অটোরিকশায় করে কলেজে যাওয়ার পথে পেছন থেকে একটি বাস ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সাদিয়া। শেষ বর্ষের শেষ পরীক্ষা ছিল তাঁর। পরীক্ষায় অংশ নিতে শুক্রবার রাতে মাকে নিয়ে রাজশাহী থেকে বাসে করে রওনা দিয়েছিলেন তিনি। ভোরে বাস থেকে নেমে সিএনজি অটোরিকশায় করে মায়ের সামনেই প্রাণ হারান সাদিয়া।

সাদিয়ার ফুফু ডা. আনোয়ারা বেগম কালের কণ্ঠকে জানান, শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকেই ঢাকা থেকে সাদিয়ার লাশ এসে পৌঁছে বাড়িতে। এরপর রাত ১০টার দিকে তাঁকে হড়গ্রাম কবরস্থানে দাফন করা হয়। সাদিয়ার মৃত্যুর খবরে তাঁর নিকটাত্মীয় ও সহপাঠীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। সাদিয়ার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে অনেকেই ছুটে আসে নগরীর হড়গ্রামের বাড়িতে।   

একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে যেন নির্বাক হয়ে পড়েছেন মা-বাবা। ফলে চেষ্টা করেও তাঁদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি। সাদিয়ার স্কুল ও কলেজজীবনের সহপাঠী শ্রাবণী আক্তার বলছিলেন, ‘ও যখন বাড়িতে আসত তখন খবর পেয়ে আমরাও ছুটে আসতাম ওর সঙ্গে দেখা করার জন্য। ও বাড়ি থাকলে মনে হবে না যে কেউ আছে। মা-বাবার কোনো কথার বাইরে যেত না সাদিয়া। ’ সাদিয়ার মা শাহীন সুলতানা জলি মেয়ের পাশে থাকতেন সব সময়ের জন্য। মেয়েকে তিনি গড়ে তুলেছেন যেমন লেখাপড়ায়, তেমনি নাচ-গানের দিকেও। স্কুল-কলেজে থাকা অবস্থায় নাচ-গানে অনেক সুনামও কুড়িয়েছিলেন সাদিয়া। শাহীন সুলতানা জলির একমাত্র স্বপ্ন ছিল মেয়েকে ডাক্তার হিসেবে তৈরি করা। কিন্তু শেষ সময়ে এসে আর তা হলো না।

একই দুর্ঘটনায় সাদিয়ার মা শাহীন সুলতানা জলির মাথায় তিনটি সেলাই ও মুখের বেশ কিছু অংশ কেটে গেছে। বর্তমানে তাঁর অবস্থা আশঙ্কামুক্ত হলেও মেয়ের শোকে এখনো তিনি কথা বলতে পারছেন না।

সাদিয়ার স্কুল ও কলেজপড়ুয়া বান্ধবী পিংকী ও পিউ বলেন, ‘সাদিয়া রাজশাহী সরকারি হেলেনাবাদ স্কুল থেকে এসএসসি ও নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে। সে অনেক ভালো ছাত্রী ছিল। এরপর মেডিক্যাল কলেজে পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়ে ডাক্তার হওয়ার জন্য পড়ালেখা শুরু করে। ’ 

সাদিয়ার বাবা হাসানুজ্জামান বুলু পূবালী ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম এবং মা শাহীন সুলতানা জলি নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। সাদিয়ার একমাত্র ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান চলতি বছরই সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছেন।


মন্তব্য