kalerkantho


লেখকের সেরা বই

কমলাক্ষের অকাল বোধন

অদিতি ফাল্গুনী

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কমলাক্ষের অকাল বোধন

এ বছর ‘অমর একুশে বইমেলা’য় আমার নবম গল্পগ্রন্থ ‘কমলাক্ষের অকাল বোধন’ এসেছে। প্রথমে নাম রাখতে চেয়েছিলাম ‘কমলাক্ষ বাস্কের অকাল বোধন। ’ সম্প্রতি গাইবান্ধার বাগদা ফার্মে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘রংপুর সুগার মিল’

কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের হাতে নিগৃহীত ও পুলিশের গুলিতে একটি চোখ হারিয়ে ফেলা দ্বিজেন টুডুকে নিয়ে লেখা নামগল্পটিতে সাঁওতালি আবহ ও মেজাজ ফুটিয়ে তুলতে ‘কমলাক্ষ বাস্কের অকাল বোধন’ নামটিই বেশি ভালো হতো। কিন্তু এ বই শুরুতে করার কথা ছিল যে প্রকাশনা সংস্থার, সেই সংস্থার পরিচালক বইয়ের জন্য সংক্ষিপ্ততর শিরোনাম চেয়েছিলেন। এদিকে একুশে ফেব্রুয়ারি পার হওয়ার পরও যখন হাতে প্রুফও পেলাম না, তখন ওই প্রকাশকের অনুমতি নিয়েই ‘আগামী’ প্রকাশনীর সঙ্গে কথা বললে তারা অবিশ্বাস্য দ্রুততা ও পেশাদারির সঙ্গে বইটি ২৫ তারিখ মেলায় আনে। আগের প্রকাশনী অবশ্য প্রচ্ছদটি দিয়ে দেয়। তখন আর নাম বদলে এবং আমার কাঙ্ক্ষিত নামে নতুন করে প্রচ্ছদ করার সময় ছিল না। ‘আগামী’ প্রকাশনী এবং এই সংস্থার স্বত্বাধিকারী ও কর্ণধার ওসমান গণির কাছে আমি খুব কৃতজ্ঞ যে খুব অল্প সময়ের ভেতর আমার চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনাবিষয়ক অনুবাদ গ্রন্থটিও মেলায় আনেন। ওই বইটিও অন্য এক প্রকাশকের করার কথা ছিল। সেই প্রকাশকও প্রায় শেষ সময়ে এসে অপারগতা জানান। তবে মুশকিল হলো, এত বিলম্বে বই আসায় আমার বই এবার অসম্ভব কম বিক্রি হচ্ছে।

মানে হাতে সময়ই তো নেই। এত কম বিক্রি আমার কোনো বইয়ের আমি জীবনে দেখিনি। নিজের থেকেও প্রকাশকের জন্য বেশি খারাপ লাগছে।

এবার বইটি সম্পর্কে বিশদে একটু বলি। বাগদা ফার্মের যে সাঁওতাল কৃষক দ্বিজেন টুডু পুলিশের গুলিতে চোখ হারিয়েছেন তাঁকে স্মরণ করেই ১০টি গল্পের এই সংকলনের নাম রাখা হলো। গ্রন্থের অন্যান্য গল্প হলো : মহেঞ্জোদারো ১৯৭১, বাঘ বেওয়াদের গল্প, রিনাসসিতা, কুমারী সিন্দারেলা বাড়ই, একরাত্রি ২০১৫, অনন্ত সাধনের বিজ্ঞান ক্লাস, মন্থরা—দ্য হাম্পব্যাক অফ আয়োধা, শন্তি ও সুনীতি, হাইকু গল্প (ফেসবুকে লেখা একাধিক অণু গল্পের সমাহার)। প্রচ্ছদ : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।

পুলিশ-রাষ্ট্র-রাজনৈতিক নেতা-চিনিকল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে চোখ হারায় যে সাঁওতাল কৃষক, গল্পে সেই কৃষকের অকাল বোধন হয়। কমলাক্ষ বাস্কে কৈশোরে তার বান্ধবী শনিচরী মুর্মুর সঙ্গে বিলে নীল শাপলা তুলতে যেত আর কমলাক্ষের চোখ নীলপদ্মের মতোই সুন্দর। তবু বান্ধবী শনিচরী যত দিনে স্ত্রী এবং সন্তানের মা হয়ে উঠেছে, পুলিশ বা মাস্তান বাহিনী তার গায়ে ধাক্কা দিতে এলে কমলাক্ষ বাস্কে পুরাণের নায়ক রামের মতোই সামনে এসে দাঁড়ায়। তার চোখ গুলিবিদ্ধ হয়, যেমন রাম তাঁর চোখে তীর বিদ্ধ করে দেবী দুর্গাকে দিতে চেয়েছিলেন নীলপদ্মের অঞ্জলি। মৃত মানুষের টিলা মহেঞ্জোদারোর গল্প বলে এই গ্রন্থ, যার পাশ দিয়ে একদা বয়ে যাওয়া ঘাগর-হাককর নদীও আজ মৃত। সুন্দরবনের যে বাওয়ালি নারীরা স্বামী বাদায় গিয়ে বাঘের শিকার হলে বাঘ বিধবা হয়ে যায়, তাদের করুণ আখ্যান উঠে আসে এই গল্পগ্রন্থে। আবার এই গল্পগ্রন্থ বলে ইতালীয় নারী ফ্লোরিনা পন্টির গল্প, যে তার সাত মাস বয়সী গর্ভস্থ সন্তানকে ঢাকার এক কফিশপে বসে চিঠি লিখতে লিখতে সহসা গুলিবিদ্ধ হয়। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল হওয়ার স্বপ্নে বিভোর যে মেয়েটি পরবর্তী জীবনে হয় কোনো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রজেক্ট অফিসার আর ভালোবাসার মানুষটিকে তার আর বিয়ে করা হয়ে ওঠে না, সে যেন কর্মমুখী অথচ আধুনিক আর সনাতনি মনোভাবের দ্বন্দ্বে অস্থির এ সময়ের বাংলাদেশের প্রতিটি অগ্রসর নারীরই প্রতিনিধি। এই গল্পগ্রন্থ থেকে আমরা জানি সুদামা নদী পার হয়ে বহলিকা, দারাদাস, বার্বারাস, চীনাস, তুষারসসহ উদীচ্যের জনপদগুলোর কিনার থেকে কেকয়ের রাজপ্রাসাদে আসা দাসী মন্থরার কথা। এ গল্পের বইয়ে আছেন নিভৃত মফস্বলের বিজ্ঞান শিক্ষক অনন্ত সাধন স্যার, তাঁর মেয়ে ঈশ্বরকণা ও টেলিস্কোপ ভালোবাসা এক ছাত্রের কথা। আছেন কুমিল্লার স্বদেশি আন্দোলনের দুই কিশোরী শান্তি ও সুনীতি, যারা ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটকে গুলি করেছিল। আছে গার্মেন্ট কারখানায় পুড়ে মরা কুমারী সিন্দারেলা বাড়ই।


মন্তব্য