kalerkantho


কাল দুয়ার খুলবে সকাল ১১টায়

নওশাদ জামিল   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কাল দুয়ার খুলবে সকাল ১১টায়

শেষ হয়ে এলো লেখক-পাঠক-প্রকাশকের প্রত্যাশার আয়োজন। আগামীকাল মঙ্গলবার পর্দা নামছে অমর একুশে গ্রন্থমেলার এবারের আয়োজনে। একেবারেই শেষ সময়ে এসে মেলায় আগতদের একটাই লক্ষ্য—পছন্দের নতুন নতুন বই সংগ্রহ। সারা বছরের খোরাক সংগ্রহে ব্যস্ত সবাই।

গতকাল রবিবার গ্রন্থমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল এক ব্যক্তির দৌড়ঝাঁপ। এক স্টল থেকে অন্য স্টলে ছুটে যাচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তা আকরাম হোসেন। যেন তর সইছে না। পছন্দের বইটি পাওয়া মাত্রই কিনে ঝুলিতে পুরছেন। জিজ্ঞাসা করতেই সরল জবাব—‘ভাই, সময় শেষ হতে চলল, অথচ এখনো অনেক বই কিনতে হবে। ’ গ্রন্থমেলার ২৬তম দিনে এমন চিত্র চোখে পড়েছে প্রাঙ্গণজুড়ে।

চারদিকে যখন বিদায়ের সুর, তখন এলো খানিক আনন্দের সংবাদ।

শেষদিনে আগামীকাল গ্রন্থমেলার দরোজা খুলবে সকালেই। গতকাল বিকেলে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে মেলায় আসেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির প্যাভিলিয়নে বসতেই প্রকাশকরা

মেলার সময় বৃদ্ধির দাবি জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি শেষ দিনের মেলা সকাল ১১টা থেকে শুরুর ঘোষণা দেন।

গতকাল ছুটির দিন না থাকা সত্ত্বেও মেলায় ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। মেলায় প্রবেশের জন্য অপেক্ষারতদের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। প্রায় প্রতিটি স্টলের সামনে ছিল ভিড়। বই বিক্রিও হয়েছে ধুমিয়ে। আগত প্রায় প্রত্যেকের হাতেই দেখা গেছে নতুন বইয়ের একাধিক ব্যাগ। বিক্রি ভালো হওয়ায় প্রকাশকদের মাঝেও দেখা গেছে স্বস্তির আমেজ। তাঁরা বলছেন, ‘অযাচিত ভিড় নেই—যাঁরাই এসেছেন, তাঁরাই বই কিনে যাচ্ছেন। ’

গ্রন্থমেলায় দেখা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট কবি খালেদ হোসাইনের সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘অন্যান্য সময়ের চেয়ে এবার পরিবেশ খুব ভালো। তবে দু-একটি অসংগতি রয়েছে। বাংলা একাডেমি উদ্যোগ নিলেই তা দূর করতে পারে। দুটি অংশে মেলা হচ্ছে, সেটাকে এক জায়গায় করতে পারলে খুব ভালো হবে। এ ছাড়া দুই প্রান্তে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে অনেকেই। মেলায় ক্ষণিক বসার কোনো ব্যবস্থা না থাকাটাও আয়োজনের একটা ঘাটতি বলে মনে করি। ’

অবসর প্রকাশনীর কর্ণধার আলমগীর রহমান বলেন, ‘অনেক বছরের মধ্যে এবার সেরা গ্রন্থমেলা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো, মেলার পরিবেশও তাই। সব মিলিয়ে এবার গ্রন্থমেলা হয়ে উঠেছে প্রাণের মেলা। ’

এদিকে গ্রন্থমেলা ২০১৭-এর নীতিমালা পরিপন্থী আচরণের সঙ্গে জড়িত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়েছে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি। এর আগেও ১২ ফেব্রুয়ারি একই বিষয়ে বাংলা একাডেমিকে চিঠি দেওয়া হয়। সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে নীতিমালা পরিপন্থী কাজ করা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। আগের দেওয়া চিঠিতে যারা গ্রন্থমেলার নানা নীতিমালা ভাঙছে তাদের একটি তালিকাও দেওয়া হয়। তালিকায় থাকা প্রকাশনাগুলো হলো—সুপ্ত পাবলিকেশন্স, ছোটদের মেলা, গোল্ডেন বুকস, শিশুঘর প্রকাশনী, শিশু প্রকাশ, শিশু-কিশোর প্রকাশন, ফুলকি বই কেন্দ্র, আলীগড় লাইব্রেরি, মেধা পাবলিকেশন্স, কাশবন প্রকাশনী, হলি বুকস, শিশুসাহিত্য বইঘর, রাতুল গ্রন্থপ্রকাশ, মেলা, ঐশী পাবলিকেশন্স, গ্লোব লাইব্রেরি, অভ্র প্রকাশ, ভ্যালেন্টিনো প্রকাশনী, ইছামতি, আলোর ভুবন, শব্দশিল্প, শামীম পাবলিশার্স, টুম্পা প্রকাশনী, মৌ প্রকাশনী, আজকাল প্রকাশনী, কালিকলম প্রকাশন ও সাহিত্যমালা।

সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা : ‘সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার’ ঘোষণা করা হয়েছে গতকাল। আনন্দ আলো থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়—প্রবন্ধে ‘উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গে ব্রাহ্ম আন্দোলন’ গ্রন্থের জন্য মুনতাসীর মামুন (অনন্যা), কবিতায় যৌথভাবে ‘জো’ গ্রন্থের জন্য হাবীবুল্লাহ সিরাজী (আবিষ্কার) ও ‘সাত দেশের কবিতা’ গ্রন্থের জন্য মুহাম্মদ সামাদ (জার্নিম্যান); শিশুসাহিত্যে কিশোর উপন্যাসে ‘হাশেম খানের ছবির গল্প মধুবক’ গ্রন্থের জন্য হাশেম খান (চন্দ্রাবতী), ছড়ায় ‘লাল জেব্রার ম্যাজিক’ গ্রন্থের জন্য লুৎফর রহমান রিটন (চন্দ্রাবতী); উপন্যাসে যৌথভাবে ‘প্রিয় এই পৃথিবী ছেড়ে’ গ্রন্থের জন্য আনিসুল হক (প্রথমা) ও ‘ডুগডুগির আসর’ গ্রন্থের জন্য প্রশান্ত মৃধা (কথাপ্রকাশ); তরুণ লেখক বিভাগে (জীবনের প্রথম বই) ‘প্রকাশকনামা ও হুমায়ূন আহমেদ’ গ্রন্থের জন্য ফরিদ আহমেদ (সময়), ‘মেঘ ও বাবার কিছু কথা’ গ্রন্থের জন্য দ্বিতীয় সৈয়দ হক (কথাপ্রকাশ) ও ‘নীল ফড়িং কাব্য’ গ্রন্থের জন্য শানারেই দেবী শানু (অনন্যা) এ পুরস্কার পেয়েছেন।

আগামী ৫ মার্চ চ্যানেল আই ভবনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

অমিয় মাজহারের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন : মেলায় এলো কিশোর লেখক অমিয় মাজহারের ভ্রমণকাহিনী ‘সান, ফান অ্যান্ড দ্য সি : দ্য ম্যাজিক অব থাইল্যান্ড’। গতকাল মেলায় বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এ সময় উপস্থিত অমিয় মাজহারের বাবা মাজহারুল ইসলাম, মা তাজনিনা রহমান স্বর্ণা ও ওসমান গণি। বইটি প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স।

মা-বাবার সঙ্গে অমিয় মাজহারের থাইল্যান্ড ভ্রমণ সচিত্রভাবে উঠে এসেছে বইটিতে। বর্ণনার সঙ্গে রয়েছে নানা আলোকচিত্রও। বইটির ভূমিকা লিখেছেন কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ২৫০ টাকা।

গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত চারটি বইয়ের তথ্য-পরিচিতি তুলে ধরা হলো :

গণমাধ্যম, গণতন্ত্র ও সাংবাদিকতা—প্রেক্ষিত বাংলাদেশ : বইটির লেখক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। আধুনিক সাংবাদিকতার কৌশল, জঙ্গিবাদের ঝাপটা বা প্রশাসনের রক্তচক্ষু থেকে গণমাধ্যমকে রক্ষার সাহসী নীতি, গণতন্ত্র ও সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জগুলো লেখক নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তুলে ধরেছেন সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের ভূমিকা, অবদান। বইটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ৩০০ টাকা।

গভর্নরের দিনলিপি : বিশিষ্ট লেখক ও প্রাবন্ধিক আতিউর রহমানের গ্রন্থ। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় প্রায় নিয়মিত তিনি দিনলিপি লিখেছেন। তাতে তুলে ধরেছেন তাঁর ভাবনাগুলো। বইটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম এক হাজার ৫০০ টাকা।

কালের ধ্বনি : শিল্প-সংস্কৃতি ও রাজনীতিসহ নানা বিষয় নিয়ে লেখা প্রবন্ধগ্রন্থ। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গোলাম কুদ্দুছ অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ নানা আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিকথা। পাশাপাশি তুলে ধরেছেন সাংস্কৃতিক জাগরণ, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, সমসাময়িক রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ। বইটি প্রকাশ করেছে নালন্দা। প্রচ্ছদ করেছেন সোহেল আনাম। দাম ৩০০ টাকা।

জন্মের আগেই আমি মৃত্যুকে করেছি আলিঙ্গন : কাব্যগ্রন্থটির স্রষ্টা কবি তারিক সুজাত। সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজনীতির নানা অন্ধকার অলিগলির কথা যেমন বইটিতে হিরণ্ময় হয়ে উঠেছে, তেমনই এসেছে কবির ব্যক্তিক অনুভূতির অনুরণন। বইটির প্রথম কবিতাটি গুলশান হত্যাকাণ্ডে নিহত ইতালীয় নাগরিক অন্তঃসত্ত্বা সিমোনা মনটির অনাগত শিশু মাইকেলেঞ্জেলো স্মরণে রচিত। ইতিমধ্যে কবিতাটি নাড়া দিয়েছে সর্ব শ্রেণির পাঠককে। বইটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। মূল্য ২০০ টাকা।

মূল মঞ্চের আয়োজন : গতকাল বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘আত্মজীবনীমূলক সাহিত্য’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. রাশিদ আসকারী। আলোচনায় অংশ নেন ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী, ড. এ এস এম বোরহান উদ্দীন। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন ফেরদৌস আরা, ইয়াকুব আলী খান, লীনা তাপসী খান, শারমিন সাথী ইসলাম, প্রদীপ কুমার নন্দী, সুমন মজুমদার, মাহবুবা রহমান ও ফারহানা শিরিন। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন কাজী ইমতিয়াজ সুলতান (তবলা), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশি), ডালিম কুমার বড়ুয়া (কি-বোর্ড) ও ফিরোজ খান (সেতার)।

আজকের আয়োজন : আজ সোমবার মেলার ২৭তম দিনে বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশের প্রকাশনা : গ্রন্থ পরিকল্পনা ও সম্পাদনা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন তারিক সুজাত। আলোচনায় অংশ নেবেন মফিদুল হক, বদিউদ্দিন নাজির ও খান মাহবুব।


মন্তব্য