kalerkantho


প্লাস্টিক গুদামে আগুনে পুড়ে শেষ দুই পরিবার

স্কুল ড্রেস পরা রোকসানা কেবলই মাকে খুঁজছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্কুল ড্রেস পরা রোকসানা কেবলই মাকে খুঁজছে

পুরান ঢাকার ইসলামপুরের প্লাস্টিক গুদামে আগুনে মারা গেছেন মা-বাবা। শিশু ভাই-বোনের চোখেমুখে এখন শুধুই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ছবি : কালের কণ্ঠ

আট বছরের রোকসানা তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। প্রতিদিন তাকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন মা সীমা আক্তার (২৭)।

স্কুলের পর কোচিং থেকে রোজ মেয়েকে নিয়ে আসতেন সীমা। গত শনিবারও প্রতিদিনের মতো স্কুল আর কোচিং শেষ হয়েছিল রোকসানার। তবে তার মা আর তাকে আনতে যাননি। অপেক্ষা করে সহপাঠীদের সঙ্গেই বাড়ি ফেরে ছোট্ট রোকসানা।

বাসার কাছে পৌঁছে রোকসানা দেখতে পায়, তার বাবা যেখানে কাজ করেন সেখানে আগুন। তখন মা-বাবাকে খুঁজেও পায়নি সে। ‘মা আমারে আনতে যাইবে’ বলে অঝোরে কাঁদছিল রোকসানা। দিন গড়িয়ে রাতে আগুনে ভস্মীভূত প্লাস্টিক গুদাম থেকে উদ্ধার করা হয় রোকসানার মা সীমা ও বাবা শামীম পলবানের (৩৫) লাশ। ওই গুদামের ওপর ছিল রোকসানাদের বাসা।

গতকাল রবিবার রাজধানীর পশ্চিম ইসলামবাগে রোকসানাদের বাসায় গেলে স্বজনরা এ তথ্য দেয়। গতকাল রোকসানা স্কুলে না গেলেও কেবল বলছিল, ‘মা আমারে আনতে যাইবে। ’ শনিবার যে পোশাক পরে স্কুল গিয়েছিল, গতকালও সেটি খোলেনি রোকসানা।

স্বজনরা জানিয়েছে, শনিবার প্লাস্টিক কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যান শামীম ও সীমা দম্পতি। তাঁদের সঙ্গেই মারা গেছেন শামীমের খালাতো বোন সালেহা বেগম (৩০)।

শামীম ও সীমা দম্পতির দুই শিশুসন্তান রোকসানা ও শিমুল (১৩)। আর সালেহার চার সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আড়াই বছরের ছেলে ফাহিম।

এক অগ্নিকাণ্ডে দুই পরিবার এখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় তাদের বাড়িতে স্বজনদের পাশাপাশি শত শত এলাকাবাসী সহমর্মিতা জানাতে ভিড় করে।

নিহত শামীমের আত্মীয় ফাহিমা বেগম গতকাল বলেন, ‘শনিবারের মতো রোকসানা আজও (রবিবার) খালি বলছে—মা স্কুলে যাইবে। আজ ওরে আমরা বলছি, তোমার মা বাঁইচা নাই। তার পরও মেয়েটা মায়ের কথা কয়। স্কুল থেইকা যেই জামা পইরা আসছে সেটাই গায়ে আছে। ’

শামীমের ভগ্নিপতি মোজাম্মেল হোসেন বলেন, বাসায় না থাকায় বেঁচে গেছে শামীমের ছেলে শিমুল। সে নিউ মার্কেটে একটি দোকানে কাজ করে।

মোজাম্মেল জানান, তাঁর ছেলে শাকিল মাহমুদও ওই বাড়িতে অর্থাৎ শামীমদের বাড়িতে থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা।

মোজাম্মেল আরো জানান, শাকিল, শামীমের মা সখিনা বেগম, বড় ভাই সোহরাব হোসেনসহ ওই বাড়ি থেকে অন্তত ২০ জন জীবিত বের হয়েছেন। তিনজন বের হতে পারেনি।

শামীমের ভগ্নিপতি জানান, শামীমের বাবা সিদ্দিক পলবান এক কাঠার মতো জমির ওপর ওই বাড়ির মালিক। সেখানে ১২টি কক্ষে শামীমরা ছাড়াও চার-পাঁচটি ভাড়াটে পরিবার থাকত। দোতলা বাড়িটির নিচে প্লাস্টিক দানার গুদাম ছিল বোরহানের। সেখানেই সপ্তাহে দেড় হাজার টাকা চুক্তিতে কাজ করত শামীম। শনিবার কাজ শেষে বাসায় ফিরে বিশ্রাম নেওয়ার সময়ই আগুন লাগে।

স্বজনরা জানায়, নিহতদের সবার বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে। নিহত সালেহার স্বামী শহীদ রিকশা চালান। এক বছর আগে তাঁরা গ্রাম থেকে এসে আত্মীয় শামীমদের বাড়িতে ওঠেন। তাঁরা একটি কক্ষে এক হাজার ৮০০ টাকায় ভাড়া থাকতেন। শহীদ সালেহার চার সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে আরজুর (১৮) বিয়ে হয়েছে। এর পরের দুই মেয়ে সুমি (১৪) ও সুমাইয়া (৯)। আর আড়াই বছরের শিশু ফাহিম মাকে খুঁজলেও কিছুই বুঝতে পারছে না।

চকবাজার থানার ওসি শামীম আর রশিদ বলেন, আগুন লেগেছে পাশের একটি বাড়ি থেকে। সেখানে প্লাস্টিক গুদামের কারণে আগুন ছড়িয়েছে।

শামীমের বড় ভাই সোহরাব বিলাপ করে বলেন, আগুনে তিনজন মারা যাওয়ায় দুই পরিবারের ছয় শিশু এতিম হয়ে গেছে।

প্রতিবেশী রাশেদ, রমজান ও সোহেল বলেন, শামীমদের বাসার পাশেই দুলাল ভূঁইয়া ও শেফালি দম্পতির বাড়ি। টিনশেট ওই বাড়িতে তিনটি প্লাস্টিক পণ্যের কারখানা ও গুদাম ছিল। ওই বাড়ির একটি কক্ষ থেকে প্রথমে আগুন লাগে এবং পরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে গতকাল বিকেলে ইসলামপুর ঈদগাহে জানাজা হয় নিহত তিনজনের। এরপর তাদের লাশ লালবাগ কবরস্থানে দাফন করা হয়।


মন্তব্য