kalerkantho


পথে পথে বাধা, যাত্রী ভোগান্তি, পণ্য আটকা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পথে পথে বাধা, যাত্রী ভোগান্তি, পণ্য আটকা

বাসচালকের যাবজ্জীবন সাজার রায়ের প্রতিবাদে খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ডাকা অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট চলছে। এ ধর্মঘটে যোগ দিয়েছে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ীসহ আরো ছয় জেলার পরিবহন শ্রমিকরা। গতকাল রবিবার সকাল ৬টা থেকে শুরু হয় এ ধর্মঘট। শ্রমিকরা সড়কে নেমে যানবাহন চলাচলে বাধা দেয়। কোথাও কোথাও যানবাহন চললেও তিন-চার গুণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এতে করে যাত্রীরা ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হয়।

এ ছাড়া বেনাপোল বন্দরে আটকে পড়েছে আমদানি পণ্য এবং ভারত থেকে ফেরা যাত্রীরা। খুলনার তিনটি ডিপো থেকে উত্তোলন করা হয়নি জ্বালানি তেল।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোকা এলাকায় চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গত বুধবার মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

ওই দিন থেকে চুয়াডাঙ্গা বাস, মিনিবাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দেয় পরিবহন শ্রমিকরা।

গত শনিবার যশোরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের খুলনা বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটির সভা শেষে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটের ঘোষণা দেন নেতারা। সে অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৬টা থেকে খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, মাগুরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও মেহেরপুরে ধর্মঘট শুরু হয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন খুলনা বিভাগীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক শেখ শফিকুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, বাসচালক জামির হোসেনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের প্রতিবাদে এ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। চালকের নিঃশর্ত মুক্তি না দিলে এ আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

পথে পথে বাধা : গতকাল সকাল ৬টার দিকে গোপালগঞ্জ শহরের কুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে ও গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করে পরিবহন শ্রমিকরা। তারা ঢাকা, খুলনা, মাদারীপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন রুটের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। ধর্মঘট চলাকালে সদর উপজেলার ভেড়ারহাট এলাকা, পল্লী বিদ্যুৎ অফিস মোড়, পুলিশ লাইন মোড়, বেদগ্রাম মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ইজিবাইকে করে শহরে আসা যাত্রীদের পথেই নামিয়ে দেওয়া হয়। সে কারণে তিন-চার কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে তাদের শহরে আসতে হয়। এমনকি ছাত্র-ছাত্রীদের বহনকারী ইজিবাইক চলতেও বাধা দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় পাঁচ-সাতটি ইজিবাইক।

যশোর শহরতলির চাঁচড়া, শংকরপুর, মুরলি, মণিহার, পালবাড়ী, উপশহর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ধর্মঘটী শ্রমিকরা সব ধরনের যান চলাচলে বাধা দিচ্ছে। লাঠিসোঁটাধারী কিছু শ্রমিক সড়কে চলাচলরত ইঞ্জিনচালিত ভ্যান, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, ইজিবাইক (ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা) ছাড়াও ধর্মঘটের বাইরে থাকা ছোট যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

যাত্রী ভোগান্তি : বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থেকে দু-তিন দিন আগে জরুরি কাজে খুলনায় এসেছিলেন তপন কুমার বিশ্বাস। কাজ শেষে গতকাল বাড়ি ফিরতে হচ্ছিল। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে দুর্ভোগে পড়েন তিনি। তপন বলেন, ‘আদালত সাজা দিয়েছেন; তা নিয়েও আন্দোলন। আমাদের সাধারণ মানুষের আর মুক্তি নেই। সড়কে জীবন যাবে আবার দুর্ভোগের শিকার হবে। এখন আমাকে ১০০ টাকা ভাড়ার তিন-চার গুণ বেশি দিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। ’

ধর্মঘটের কারণে তপন বিশ্বাসের মতো অনেকেই গন্তব্যে যাওয়ার জন্য এসে দেখেছেন খুলনার সোনাডাঙ্গা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের পাশাপাশি রূপসা, ফুলতলা, পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, কয়রা, তেরখাদাসহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসা-মিনিবাস চলছে না। দুর্ভোগে পড়া সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল ইজিবাইক, মহেন্দ্র, নন্দী, স্থানীয়ভাবে তৈরি যান্ত্রিক যান ভটভটিসহ বিকল্প যানবাহন। কিন্তু এসব যানবাহনে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার গুণ ভাড়া দিয়ে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছতে হয়েছে।

খুলনা জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন সোনা বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে একমত হয়ে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ীসহ আরো ছয়টি জেলায়ও সেখানকার শ্রমিকরা ধর্মঘট পালন করছে।

বাগেরহাট থেকে ঢাকা যাবেন মো. শাহারিয়ার হোসেন নামের একজন সরকারি কর্মকর্তা। তিনি জানালেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঢাকায় পৌঁছতে না পারলে তাঁকে দুই হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা গুনতে হবে। একই সঙ্গে চরম ক্ষতির মুখে পড়তে হবে তাঁকে।

মেহেরপুরে বিপাকে পড়া যাত্রীরা বলেছে, আলোচনা সাপেক্ষে দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি।

চুয়াডাঙ্গায় ধর্মঘটের প্রথম দিন কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। গতকাল পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গাবাসীকে টানা পাঁচ দিন ভোগান্তি নিয়ে চলতে হয়েছে।

ঝিনাইদহে আবুল হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, ‘হঠাৎ করে শ্রমিকদের ধর্মঘটের ডাক দেওয়া ঠিক হয়নি। আমরা বাসের শ্রমিক-মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি। ’

বেনাপোলে পণ্য ও যাত্রী আটকা : বেনাপোল চেকপোস্টে আটকে পড়েছে ভারত থেকে আসা শত শত বাংলাদেশি যাত্রী। অন্যদিকে আমদানি করা মালামাল নিয়ে চার শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাকও আটকে পড়েছে বেনাপোল বন্দরে। বন্দর থেকে মালামাল খালাস বন্ধ রয়েছে। আটকে পড়া পণ্যের মধ্যে পাঁচ ট্রাকভর্তি মাছ রয়েছে। ভারতের ওড়িশা থেকে আসা ট্রাকচালক পলাশ প্রামাণিক বলছিলেন, বরফ গলে গিয়ে এসব মাছ পচে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।

বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি কামাল হোসেন জানান, যেসব ট্রাক বন্দরে পণ্য তুলেছে, ধর্মঘট শেষ হওয়ার আশায় বন্দরেই অপেক্ষা করতে হচ্ছে সেগুলোকে। যদি ধর্মঘট দ্রুত প্রত্যাহার করা না হয়, তাহলে বন্দরে ভয়াবহ যানজট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, ধর্মঘটের ফলে বেনাপোল বন্দরে চার শতাধিক ট্রাক আমদানি পণ্য নিয়ে বন্দর এলাকায় আটকে পড়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে শিল্প-কারখানায় ব্যবহূত কাঁচামাল ও জরুরি অক্সিজেন এবং পচনশীল বিভিন্ন ধরনের পণ্য রয়েছে।

ভারত থেকে ফিরে আসা যাত্রীদের কেউ কেউ বিকল্প উপায়ে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। আবার কেউ কেউ পরিবহন কাউন্টার, বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও চায়ের দোকানে অপেক্ষা করছিল।

চট্টগ্রামের বাসিন্দা আহম্মদ আলী তাঁর ক্যান্সার আক্রান্ত আট বছরের ছেলে মোহাম্মদ আলী সাদনানকে নিয়ে ভারত থেকে ফিরেছেন গতকাল বিকেলে। ধর্মঘটের কারণে বেনাপোল থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার গাড়ি পাচ্ছেন না। আহম্মদ আলী বলেন, তাঁর কাছে বেশি টাকা নেই, কী করে বাড়ি যাবেন বুঝতে পারছেন না। হতাশায় ভেঙে পড়েন তিনি।

বেনাপোলের সোহাগ পরিবহনের ব্যবস্থাপক আব্দুল জলিল জানান, পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত বেনাপোল বন্দর থেকে কোনো বাস ছাড়বে না।

এ ছাড়া খুলনা নগরীর কদমতলা এলাকায় শনিবার রাতে আসা মালভর্তি ট্রাক পণ্য ওঠানো ও নামানোর জন্য অপেক্ষায় রয়েছে।

জ্বালানি তেল উত্তোলনও বন্ধ : পরিবহন শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে খুলনা বিভাগীয় ট্যাংক লরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনও ধর্মঘট পালন করছে। ফলে খুলনার তিনটি ডিপো থেকে জ্বালানি তেল উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। এ কারণে দু-তিন দিনের মধ্যে বিভাগের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


মন্তব্য