kalerkantho


নিভে যাওয়ার আগে দপ করে জ্বলে ওঠা

নওশাদ জামিল

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নিভে যাওয়ার আগে দপ করে জ্বলে ওঠা

এবারের গ্রন্থমেলার আয়ু আছে আজ রবিবারসহ তিন দিন। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এবারকার এই আলোকিত মেলা। তাই গতকাল শনিবার শেষ ছুটির দিনের বইমেলা জমে উঠেছিল ‘প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে দপ করে জ্বলে ওঠা’র মতো।

গতকাল সকাল থেকেই খোলা ছিল মেলার দুয়ার। শেষ শিশুপ্রহরে ছিল কোমলমতিদের আলোকিত হওয়ার উচ্ছ্বাস। দুপুরের পর থেকেই ভিড় বাড়ছিল, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ গোটা প্রাঙ্গণ থইথই করছিল গ্রন্থপ্রেমীতে। বই কেনা, আড্ডায় উত্সবমুখর ছিল গোটা উদ্যান।

বিকেল থেকে মেলার প্রবেশপথগুলোতে তৈরি হয় লম্বা লম্বা সারি। জনসমাগম এত বেশি ছিল যে মনে হচ্ছিল ‘তিল ঠাঁই আর নাহি রে’। ক্রেতা-দর্শনার্থীর সঙ্গে বিক্রিও ছিল তুঙ্গে।

গতকাল মেলা ঘুরে দেখা যায়, যারা মেলায় আসছে, প্রায় সবার হাতেই কমবেশি বই।

বেশির ভাগ প্রকাশক জানিয়েছেন, অন্যবারের তুলনায় এবার বিক্রি বেড়েছে। মেলার পরিবেশ নিয়েও প্রকাশকরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। ক্রেতা-দর্শনার্থীরাও তৃপ্তির কথা জানিয়েছে।

অনিন্দ্য প্রকাশনীর কর্ণধার আফজাল হোসেন বলেন, ‘এবার মেলায় অন্যান্য বছরের তুলনায় বিক্রি ভালো। প্রথম সপ্তাহ থেকেই পর্যায়ক্রমে বিক্রি বেড়েছে। এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। আশা করি, শেষ কয়েকটা দিন বিক্রি আরো বাড়বে। ’

গতকাল শিশুপ্রহরে সকাল সাড়ে ১০টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে ছিল শিশুদের জন্য আয়োজন। সেখানে অমর একুশে উপলক্ষে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সংগীত এবং সাধারণ ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশু-কিশোরদের পুরস্কার দেওয়া হয়। এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। অনুষ্ঠান শেষে শিশু-কিশোররা অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় স্টলে স্টলে।

সকাল ১১টা বাজতেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিশু কর্নারে ঢুকে যার যার পছন্দের বই কিনতে বিভিন্ন স্টলে ছড়িয়ে পড়ে শিশু-কিশোররা। বর্ণমালার প্রিয় উত্সব শেষের দিকে হওয়ায় বেশি মাত্রায় বই কিনতে দেখা গেছে খুদে পাঠকদের।

পছন্দের বই কেনার পাশাপাশি সিসিমপুরের হালুম, টুকটুকিকে সরাসরি দেখে আত্মহারা শিশুরা। আনন্দের শতভাগ পুষিয়ে দিতে সন্তানদের বিভিন্ন কৌশলে সিসিমপুর জীবন্ত চরিত্রদের দেখানোর চেষ্টা করেন অভিভাবকরা। মাসব্যাপী প্রাণের বইমেলার রঙিন স্মৃতি শিশুদের কচি মনে সত্য ও সুন্দরের রং ঢালবে—এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

শিশুপ্রহর শেষ হওয়ার পর থেকেই বাড়ছিল বড়দের ভিড়। তবে তখনো পরিবারের সঙ্গে ছিল শিশু-কিশোররা। সব মিলিয়ে গতকাল ছুটির দিনে সব শ্রেণির মানুষের পদচারণে গোটা মেলা ছিল উত্সবমুখর।

গতকাল মেলায় ১৬৩টি নতুন বই এসেছে। ৪১টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

প্রতিদিনই মেলায় আসছে নতুন বই। পাঠকের সুবিধার্থে এই প্রতিবেদনে নির্বাচিত চারটি বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

নির্বাচিত প্রবন্ধ : কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদারের গ্রন্থ। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি এরই মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত আসন তৈরি করে নিয়েছেন। ছোটগল্প, উপন্যাসের পাশাপাশি লিখেছেন নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধ। তাঁর এই বইটিতে গল্পভাবনা, সমাজ-রাজনীতি-নন্দনতাত্ত্বিক ভাবনাগুলো নিয়ে লেখা সেরা প্রবন্ধগুলো স্থান পেয়েছে। বইটি প্রকাশ করেছে গ্রন্থকুটির। প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রব এষ। দাম ৪০০ টাকা।

শামসুদ্দীন আবুল কালাম—তাঁর অপ্রকাশিত চিঠি ও স্মৃতি : লেখক পূরবী বসু। সত্তরের দশকের এই খ্যাতিমান লেখক একাধারে গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও বিজ্ঞানী। গল্পকার হিসেবে পূরবী বসুর রয়েছে নিজস্ব ও আলাদা এক জগত্। লেখালেখির সূত্রে তাঁর সঙ্গে পরিচয় বরেণ্য লেখক শামসুদ্দীন আবুল কালামের। দীর্ঘদিন শিল্প-সাহিত্য নিয়ে পূরবী বসুকে চিঠি লিখেছেন তিনি। সেসব চিঠি এবং বরেণ্য এ লেখকের স্মৃতিকথা নিয়ে এই গ্রন্থ। প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রব এষ। দাম ৪০০ টাকা।

শিল্প-সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু : গবেষণাধর্মী এ বইটির লেখক ড. মিল্টন বিশ্বাস। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক সৃজনশীল লেখালেখি করছেন অনেক দিন ধরেই। শিল্প-সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু উঠে এসেছেন নানা আলোকে, মিল্টন বিশ্বাস তা বিশ্লেষণ করেছেন। সেসব নিয়েই এ গ্রন্থ। সম্প্রতি বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান। বইটি প্রকাশ করেছে নবযুগ প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন সৈয়দ ইকবাল। দাম ৫৮০ টাকা।

সংবাদের জন্মকাহিনি : শিরোনামেই বোঝা যায়, বইটি গণমাধ্যমবিষয়ক। লেখক সাংবাদিক এস এম রানা। সাংবাদিকতার শুরু থেকেই তিনি তথ্য সংগ্রহ ও পরিবেশনায় মুনশিয়ানার ছাপ রাখছেন। প্রতিভাবান এই সাংবাদিক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন। বইটি সেসব প্রতিবেদনের নেপথ্য কাহিনি নিয়ে। প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন নিয়াজ চৌধুরী তুলি। দাম ২০০ টাকা।

গ্রন্থমেলার অনুষ্ঠান : গতকাল বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে হয় ‘বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রফিকুর রশিদ। আলোচনায় অংশ নেন ইনাম আল হক, আমীরুল ইসলাম ও আসলাম সানী। সভাপতিত্ব করেন জাকির তালুকদার।

প্রাবন্ধিক রফিকুর রশিদ বলেন, ‘শিশুসাহিত্যে আমাদের অর্জন মোটেই কম নয়। বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন এবং সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্নাত হয়ে ভিন্নমাত্রা ও উচ্চতা লাভ করেছে। বিষয়বৈচিত্র্যের দিক থেকে আমাদের শিশুসাহিত্য যদিও হয়ে উঠেছে সর্বপ্রান্তস্পর্শী, তবে এ কথা মানতেই হবে দেশপ্রেমই যেন সাহিত্যের এই শাখাটিতে প্রাণের স্পন্দন এনে দিয়েছে। ’

সভাপতির বক্তব্যে জাকির তালুকদার বলেন, ‘শিশুসাহিত্য হচ্ছে জাতি গঠনের ভিত। সারা পৃথিবীর সব চিন্তাবিদ অনুভব করেছেন জাতি গঠনে শিশুসাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা। ম্যাক্সিম গোর্কি থেকে রোমা রলাঁ একই কথা বলেছেন। কিন্তু শিশুসাহিত্যে যতখানি মনোযোগ দেওয়ার কথা ততখানি মনোযোগ আমাদের লেখকরা দিচ্ছেন না। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। ’

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল মুজতবা আহমেদ মুরশেদের পরিচালনায় ‘স্বভূমি লেখক শিল্পী কেন্দ্র’ এবং হাসান আব্দুল্লাহ্র পরিচালনায় ‘ঘাসফুল শিশুকিশোর সংগঠন’-এর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এ ছাড়া সংগীত পরিবেশন করেন কমলিকা চক্রবর্তী, আরিফ রহমান, শ্যামল কুমার পাল, সালমা চৌধুরী, রাজিয়া সুলতানা, রেজাউর রহমান, আবিদা রহমান সেতু ও মনিরা ইসলাম। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন আব্দুল মতিন (তবলা), পুলিন চক্রবর্তী (তবলা), মো. ফারুক (প্যাড), মো. শহিদুল ইসলাম (বাঁশি) এবং রবিনস চৌধুরী (কিবোর্ড)।

আজকের অনুষ্ঠান : আজ রবিবার মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।   বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে হবে ‘আত্মজীবনীমূলক সাহিত্য’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কুষ্টিয়ায় অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. রাশিদ আসকারী। আলোচনা করবেন ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী, ড. এ এস এম বোরহান উদ্দীন। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।


মন্তব্য