kalerkantho


দেশের ভেতরে বিদেশি ব্যাংকিং

৪০ হাজার কোটি টাকা পাচারের ঝুঁকিতে

আবুল কাশেম ও শেখ শাফায়াত হোসেন   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



৪০ হাজার কোটি টাকা পাচারের ঝুঁকিতে

বিদেশি কম্পানিকে ঋণসুবিধাসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সেবা প্রদানে ১৯৮৫ সাল থেকে আলাদা ইউনিট খুলে অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। গত প্রায় ৩২ বছরে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও একটি সংক্ষিপ্ত নীতিমালায় চলছিল এর কাজ। সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কারণে অর্থপাচারসহ বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর ১৯টি ব্যাংক পরিদর্শন করে এ রকম বেশ কিছু অনিয়মের খোঁজ পেয়ে অফশোর ব্যাংকিং নীতিমালায় সংশোধনী আনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি এসংক্রান্ত একটি খসড়া তৈরি করে মতামতের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পেলে সংশোধিত এ নীতিমালা জারি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৩৩টি ব্যাংকের ৫২টি অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট রয়েছে। অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বর্তমানে ব্যাংকগুলোর সৃষ্ট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, যার বেশির ভাগই বিদেশি ব্যাংকের।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অফশোর ব্যাংকিং নীতিমালার সংশোধিত খসড়াটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচিব মো. ইউনুসুর রহমানের কাছে পাঠিয়ে এ বিষয়ে মতামত চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি)। বিআরপিডির মহাব্যবস্থাপক আবু ফরাহ মো. নাছের স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, দেশে মুদ্রার জোগানসহ মুদ্রানীতির কার্যকর প্রয়োগ, ঋণপদ্ধতি সমুন্নত রাখা এবং শিল্পে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে মুদ্রাবাজারে ভারসাম্যহীনতা দূর, অর্থের বিনিময় হার, সুশৃঙ্খল ঋণপদ্ধতি ও অর্থপাচারের (মানি লন্ডারিং) ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রম যথাযথ তদারকির আওতায় রাখা দরকার। আরো বলা হয়, অফশোর মূলত বিদেশি মুদ্রায় পরিচালিত ব্যাংকিং হওয়ায় এ ব্যবসার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এর মাধ্যমে অর্থপাচারের ঝুঁকিও প্রবল।

দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৮৫ সালের ১২ নভেম্বর এসআরও এবং ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর এ বিষয়ক নীতিমালা জারি করা হয়। এক পৃষ্ঠার ওই নীতিমালায় বিদেশ থেকে আমানত এনে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। তবে কারা ঋণ পাবে, ঋণগ্রহীতা সীমা, ঋণের ব্যবহার—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু নেই। এর সুযোগ নিয়ে ব্যাংকগুলো ঋণের অপব্যবহার করছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অভিযোগ এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বিদেশ থেকে আমানত সংগ্রহের নিয়ম থাকলেও মূল ব্যাংক থেকে ঋণ করে বিদেশে ঋণ দিচ্ছে অফশোর ইউনিট। অথচ এসব ঋণ গ্রহীতার কাউকে কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অর্থপাচারের ঝুঁকি বাড়ছে।

অফশোর ব্যাংকিং হলো ব্যাংকের ভেতরে বিদেশি ব্যাংকের কার্যক্রম। অফশোর ইউনিটের ব্যবস্থাপনা, হিসাব, আমানত, ঋণ—এসব কার্যক্রম একেবারেই আলাদা। শুধু বছর শেষে মুনাফা অথবা লোকসানের হিসাব যুক্ত হয় ব্যাংকের হিসাবে। অফশোর ব্যাংকিংয়ে দেশীয় মুদ্রায় কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হয় না। এর কার্যক্রম চলে ডলার, ইউরো, পাউন্ড ও ইয়েনে।

নীতিমালা সংশোধনীর খসড়া : এতে ব্যাংকগুলোর নতুন করে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট চালুর অনুমোদন নেওয়া থেকে শুরু করে কী কী ধরনের লেনদেন করা যাবে, কাদের সঙ্গে করা যাবে, কাদের সঙ্গে যাবে না, একটি প্রতিষ্ঠানকে কী পরিমাণ ঋণ দেওয়া যাবে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া অথরাইজড ডিলার (এডি), অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড), বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (পিইপিজেড), দেশীয় ব্যাংকিং ইউনিট (ডিবিইউ), হাইটেক পার্ক, অনিবাসী বাংলাদেশিসহ স্টেকহোল্ডারদের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে ইপিজেড, ডিইপিজেড, ইজেড ও হাইটেক পার্কের শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে আমানত ও ঋণ, বিনিয়োগ, বিল ডিসকাউন্টিং, ঋণপত্র ইস্যু ও গ্যারান্টি প্রদান ছাড়া অন্য কোনো সেবা দেওয়া যাবে না। দেশে বসবাস করেন না এমন বাংলাদেশিদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ করা ছাড়া অন্য কোনো লেনদেনে যাওয়া যাবে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের অনুমোদন ও ঋণমান সাপেক্ষে বিদেশ থেকে ঋণ আনা যাবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে কেবল আমানত ও ঋণ সংগ্রহ করা যাবে। এদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ফান্ডেড অথবা নন-ফান্ডেড ব্যাংকিং লেনদেন চলবে না। অফশোর ব্যাংকিংয়ের আমানতকারীকে চেক বা এ রকম অন্য কোনো হাতিয়ার দেওয়া যাবে না। অফশোর ব্যাংকের তহবিল মূল ব্যাংকে প্লেসম্যান্ট বা তাত্ক্ষণিক বিনিয়োগ করা যাবে না। অনুমোদিত বিষয় ছাড়া অন্য কোনোভাবে বিদেশে রেমিট্যান্স পাঠানো এবং প্রবাসী বা এনআরবিদের ব্যাংকের পরিচালকদের বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত কোটার বাইরে ঋণসুবিধা দেওয়া যাবে না।

অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের তহবিল হবে মূলত বিদেশ থেকে আনা আমানত ও ঋণের ওপর। তবে প্রয়োজনে মূল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক মূলধনের ২০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে ব্যবহার করা যাবে। প্রতিদিনের ব্যবসায় বাংলাদেশের অফশোর ব্যাংকিং সম্পদ কোনোভাবেই এর মেয়াদি ও তলবী দায়ের ৭৫ শতাংশের কম হতে পারবে না। অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলোকে অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২ ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ আইন ২০০৯ সম্পূর্ণ মেনে চলতে হবে। অফশোর ব্যাংকিংয়ের মেয়াদি ও তলবী দায় মূল ব্যাংকের মোট মেয়াদি ও তলবী দায়ের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং এর বিপরীতে নগদ সংরক্ষণ অনুপাত (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণ (এসএলআর) করতে হবে। নীতিমালার লঙ্ঘন বা গুরুতর কোনো অনিয়ম ঘটলে সংশ্লিষ্ট অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট বন্ধ করে দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমন কোনো নীতিমালা সংশোধনীর খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে কি না আমার জানা নেই। ’ এ বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। মহাব্যবস্থাপক আবু ফরাহ মো. নাছের বলেন, ‘আগের নীতিমালাটির গেজেট নোটিফিকেশন জারি করা হয়েছিল বলে সংশোধনীর বিষয়টি সরকারের বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছে। কেননা আমাদের ক্ষমতাবলে সংশোধন করা গেলেও আগের জারি করা গেজেট নোটিফিকেশন বাতিলের ক্ষমতা আমাদের নেই। ’


মন্তব্য