kalerkantho


চট্টগ্রামে আ. লীগ ও সহযোগী সংগঠনে হঠাৎ অস্থিরতা

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



চট্টগ্রামে আ. লীগ ও সহযোগী সংগঠনে হঠাৎ অস্থিরতা

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোয় হঠাৎ করেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, দরপত্র ও চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে বেড়ে গেছে নিজেদের মধ্যে সংঘাত। চলতি মাসেই নগরে এক ছাত্রলীগ কর্মী ও পটিয়ায় আওয়ামী প্রজন্ম লীগের এক নেতা খুন হয়েছেন। এ সময়ে আরো এক ডজনের বেশি ঘটনা ঘটেছে।

বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে। কমে গেছে সাংগঠনিক সভা-সমাবেশ। দু-একটি কর্মসূচির আয়োজন হলেও তাতে বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকছে। মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগে প্রায় ২০ বছর পর সম্মেলন ও কমিটি হলেও পদবঞ্চিতরা পাল্টা কমিটি গঠন করেছে।

এদিকে একের পর এক ঘটনা ঘটলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা চুপ। দলীয় অন্তঃকোন্দল ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলেও এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেই। এ কারণে সম্প্রতি দল ও বিভিন্ন নেতার নাম ভাঙিয়ে হরেক অপরাধের ঘটনা ঘটছে।

নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে এসব নিয়ে পুলিশ প্রশাসনেও গা-ছাড়া ভাব।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এ ব্যাপারে গত বহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলের পদ-পদবিতে থেকে কেউ অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের ভেতরে ও বাইরে যেই হোক না কেন অপরাধ করে কেউ রেহাই পাবে না। এ ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স। পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে। আর যারা দলের পদ-পদবিতে নেই অথচ নাম ব্যবহার করে অপকর্ম করছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। ’

চট্টগ্রামে সংগঠনে হঠাৎ বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, ‘চট্টগ্রামে যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলো সজাগ ও তীক্ষ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। দলে শৃঙ্খলা আনতে অপরাধী ও অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কেন্দ্রীয় নেতারা শিগগিরই চট্টগ্রামে গিয়ে সবার সঙ্গে বৈঠক করে সাংগঠনিকভাবে দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেবেন। ’

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, ‘যেসব ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে সেগুলোর একটিও দল ও সাংগঠনিক স্বার্থে নয়। কেউ নিজেদের স্বার্থে ঘটনা ঘটালে তাতে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি কেন ক্ষুণ্ন হবে? তবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াটা জরুরি। ’

মহানগর আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক চন্দন ধর বলেন, ‘সামনে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই এ ধরনের ঘটনা আরো ঘটতে পারে। সে জন্য এখন থেকেই সতর্ক

হতে হবে। এসব ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে ব্যাপারে সাংগঠনিকভাবে কাজ করে যেতে হবে। ’

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ সালাম বলেন, ‘হাটহাজারীতে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মারামারির ঘটনাটি ফুল দেওয়া নিয়ে। এ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সামনের দলীয় সভায় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি আধিপত্য বিস্তার নিয়েও ঘটতে পারে। ’

দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, ‘বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটনা ঘটছে। কারণ খুঁজলে দেখা যাবে ঘটনাগুলো দলীয় কর্মসূচিতে নয়। পটিয়ায় খুনের ঘটনাটি পুলিশ তদন্ত করছে। আমরাও ঘটনাটি কী কারণে হয়েছে তা বের করার চেষ্টা করছি। আর মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে যে বিশৃঙ্খলা হয়েছে তা অনভিপ্রেত। ’

মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি বলেন, ‘কোনো ঘটনা ঘটলেই ছাত্রলীগকে গড়পড়তা দোষারোপ করা হয়। পুলিশ কেন গ্রেপ্তার করছে না তা আমাদের প্রশ্ন। অনুপ্রবেশকারী বা নামধারী যারাই ঘটনা ঘটাবে তারা অপরাধী। এর সঙ্গে সরাসরি ছাত্রলীগকে জড়ানো ঠিক নয়। ’

সর্বশেষ গত বুধবার বিকেলে নগর ভবনে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ঘাট ইজারার দরপত্র জমা দেওয়া নিয়ে সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মামুন ও নগরের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিনের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় তিনজন গুলিবিদ্ধসহ আরো কয়েকজন আহত হয়। সাবেক ওই দুই নেতা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তবে ঘটনার পর সিটি মেয়র সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার দরপত্র হয়েছে। কোনো সিডিউল কেনা বা ড্রপ করা নিয়ে এ পর্যন্ত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বুধবারের ঘটনাটি ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছে। ’

এর আগে ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে পটিয়ার কোলাগাঁও ইউনিয়নে সিরাজ শাহ্ মাজার গেট এলাকায় ইউনিয়ন আওয়ামী প্রজন্ম লীগের সভাপতি মো. বাহাদুর (৩০) খুন হন। এ ঘটনাটি চিটাগাং ডক ইয়ার্ডে আধিপত্য বিস্তার ও দরপত্র নিয়ে ঘটেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি নগরের আমতল এলাকায় সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রলীগের দুই পক্ষে সংঘর্ষে ইয়াছিন আরাফাত (২২) নামে এক কর্মী নিহত হন। ১৫ ফেব্রুয়ারি কাতালগঞ্জ বৌদ্ধ বিহারের সামনে পাঁচ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় যুবলীগ নামধারী নুরুল মোস্তফা টিনুর ছোট ভাই নুরুল আলম শিপুকে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনার পর রাতেই যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কিছু কর্মী থানা ঘেরাও করে। যদিও যুবলীগ ও ছাত্রলীগ বিবৃতি দিয়ে জানায়, থানা ঘেরাওকারীরা সংগঠনের কেউ নয়।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে হাটহাজারী পার্বতী স্কুলমাঠে উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। ঘটনার সময় মঞ্চে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। বিশৃঙ্খলার কারণে তিনি বক্তব্য না দিয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন।

এ ছাড়া গত ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ৯ জন আহত হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা ও নগর ছাত্রলীগের এক নেতার অনুসারীদের মধ্যে জায়গা নিয়ে বিরোধের জের ধরে সংঘর্ষ হয়। এর আগের দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায় এবং বাঘাইছড়ির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনের চালককে তুলে নিয়ে যায়। ৯ ফেব্রুয়ারি নগরের মাস্টারপুল এলাকায় যুবলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি প্রবর্তক মোড়ে খাবার পরিবেশনে বিলম্ব হওয়ায় একটি রেস্টুরেন্টে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। ৬ ফেব্রুয়ারি আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় (ছাত্রলীগ) নগর ছাত্রলীগ নেতা তানজিরুল হক গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় সিআরবি ডাবল মার্ডার মামলার এক আসামিসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শাহজালাল হলের সামনে মোফাজ্জল হায়দার হোসেন নামে এক ছাত্রলীগকর্মীকে অন্য পক্ষ কুপিয়ে আহত করে। এ ছাড়া ১৪ ফেব্রুয়ারি মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন এবং ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারে দক্ষিণ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে হট্টগোল হয়।


মন্তব্য