kalerkantho


পাচারের শিকার ব্যক্তিরাই এখন গড়ছেন প্রতিরোধ

মেহেদী হাসান, কক্সবাজার থেকে ফিরে   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পাচারের শিকার ব্যক্তিরাই এখন গড়ছেন প্রতিরোধ

কক্সবাজারের রামু এলাকার নলকূপ মিস্ত্রি মো. ফোরকানকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়েছিল স্থানীয় এক দালাল। কিন্তু টাকা না থাকায় তাঁদের কথাবার্তা বেশি দূর এগোয়নি। একদিন সেই দালাল বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য টেকনাফে অন্য এক দালালের কাছে পাঠায়। সেদিন আর বাড়ি ফেরা হয়নি ফোরকানের।

ফোরকান জানান, সেদিন টেকনাফের কচুপানিয়া এলাকায় তাঁকে জুতা খুলে সাগরে অপেক্ষমাণ একটি ট্রলারের দিকে যেতে বলা হয়। তিনি তাই করেন। টেকনাফ থেকে ছোট ট্রলারে করে তাঁকে তুলে দেওয়া হয়। এই ছোট ট্রলার থেকে পরে তাঁকে সাগরে থাকা বড় একটি ট্রলার তুলে নেয়। মোট ২২৮ জনকে নিয়ে রওনা হয় সেই ট্রলার। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এরপর সেই ট্রলার ভেড়ে থাইল্যান্ডের এক জঙ্গলে। সেখানেই বন্দি করে রাখা হয় তাদের।

এরপর তাদের পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। সেই সঙ্গে চলে নির্যাতন। অনেকেই মারা গেছে। অবশেষে থাইল্যান্ডের পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। পরে থাইল্যান্ডের দূতাবাসের মাধ্যমে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

মো. ফোরকানের ঘটনাটি ২০১৪ সালের। বেকার জীবনের ইতি টানতে ২০১১ সালে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে দালালের শরণাপন্ন হয়েছিলেন কক্সবাজারের মোহাম্মদ ইসহাক। ট্রলারে করে দুঃসহ সমুদ্রযাত্রা আর অনাহারের দিনগুলো শেষ হয় শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। এরপর রেড ক্রস, দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন তিনি।

এই ফোরকান, ইসহাকের মতো মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিরাই এখন দেশে ফিরে পাচার প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছেন। তাঁরা নিজেদের প্রতারিত ও নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে। ফলে কক্সবাজার এলাকা থেকে অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা ও মানবপাচার আগের চেয়ে অনেকটাই কমে এসেছে।

গত বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলায় পাচারের শিকার বেশ কয়েকজনের সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের কথা হয়। সাগরে অনিশ্চিত যাত্রা ও পরে জিম্মি হওয়ার পর কোনো দিন দেশে ফিরতে পারবেন—এমন ভাবনাও তাঁদের অনেকের ছিল না। দেশে ফিরে তাঁরা এখন সংগঠিত হয়েছেন এবং গড়ে তুলেছেন অনির্বাণ নামে একটি সংগঠন।

সংগঠনের উদ্যোক্তারা জানান, ২০১১ সাল থেকেই তাঁরা জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছেন। সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় কক্সবাজার অঞ্চল থেকে ট্রলারযোগে অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বেশ পুরনো। অশিক্ষা, বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে আর বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দালালরা স্থানীয়দের আকৃষ্ট করে। এর সঙ্গে প্রভাবশালী মহলও জড়িত।

২০১৫ সালে থাইল্যান্ডে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের গণকবর আবিষ্কৃত হওয়ার পর প্রশাসনসহ সবার টনক নড়ে।

পাচার হওয়া ব্যক্তিরা জানায়, তাদের ট্রলারে করে থাইল্যান্ডে বা অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার পর জিম্মি করে এ দেশে তাদের স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। দুর্গম পথে যাত্রা আর নির্যাতনে অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে।

কক্সবাজারে মানবপাচার প্রতিরোধে সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি। তাদের সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা উইনরক ইন্টারন্যাশনাল ‘বাংলাদেশ কাউন্টার ট্রাফিকিং ইন পারসন’ (বিসিটিআইপি) কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। মানবপাচার বন্ধ ও নিরাপদ শ্রম অভিবাসনকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে তারা একযোগে কাজ করছে। কক্সবাজারের বেসরকারি সংস্থা ইপসাও মানবপাচারের শিকার হওয়া যুবক-যুবতীদের সংগঠন অনির্বাণকে সহায়তা দিয়ে আসছে।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় বিভিন্ন সংস্থা মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করছে। কেউ যেন কোনোভাবেই প্রলোভনের শিকার হয়ে ট্রলারযোগে বিদেশে না যায়, এ বিষয়েও কাজ করছে তারা। সেখানেও মানবপাচার প্রতিরোধে ইউএসএআইডির সহযোগিতায় বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা কাজ করছে।


মন্তব্য