kalerkantho


চট্টগ্রামে রাজস্ব সংলাপে এনবিআর চেয়ারম্যান

কাস্টম হাউসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’

ফারজানা লাবনী, চট্টগ্রাম থেকে   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কাস্টম হাউসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’

দেশের মোট আমদানি বাণিজ্যের ৭৫ শতাংশ এবং রপ্তানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর ও চট্টগ্রাম কাস্টমসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এ বন্দরে কোনো দুর্নীতি করতে দেওয়া হবে না।

শুধু এখানেই নয়, দেশের কোনো শুল্ক স্টেশনেই নিজের পকেট ভারী করতে দুর্নীতি করা যাবে না। গতকাল চট্টগ্রামে দ্বিতীয় পর্যায়ের রাজস্ব সংলাপ অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তৃতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান দুর্নীতিবাজদের উদ্দেশে এসব হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

মো. নজিবুর রহমান বলেন, দেশের জন্য কাজ করতে হবে। চোরাই কারবার বন্ধ করতে হবে। চোরাকারবারিরা দেশের শত্রু। এরা সরকারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে চায়। এদের থামানো প্রয়োজন। এই অসাধু ব্যক্তিদের যারা সহযোগিতা করবে তারাও একই অপরাধে অপরাধী। শুধু এনবিআরই নয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা অসাধু দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করতে কাজ করছে।

এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।

দেশে একটি রাজস্ববান্ধব সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় ফেব্রুয়ারি মাসকে ‘পার্টনারশিপ’ বা অংশীদারি মাস ঘোষণা করেছে এনবিআর। এ মাসে সব অংশীজনের সঙ্গে অংশীদারিমূলক সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গণমাধ্যম এনবিআরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। এ সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করতে গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ইআরএফের সঙ্গে রাজস্ব সংলাপ করে এনবিআর। এ অনুষ্ঠানের পরে এনবিআর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বন্দর সরেজমিনে পরির্দশন করা হয়। বিকেলে এনবিআর, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস অডিটরিয়ামে রাজস্ব সংলাপে অংশ নেন।   এসব সংলাপে চট্টগ্রাম বন্দর ও চট্টগ্রাম কাস্টমসের বিভিন্ন সমস্যা উঠে আসে। এসব সমস্যার সমাধান নিয়েও আলোচনা হয়।

প্রথম পর্যায়ের রাজস্ব সংলাপে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। উভয় অনুষ্ঠানেই উপস্থিত ছিলেন এনবিআর সদস্য (শুল্কনীতি) ফরিদ উদ্দিন, সদস্য (করনীতি) পারভেজ ইকবাল, সদস্য (লিগ্যাল অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) ড. মাহবুবুর রহমান, সদস্য (শুল্ক নিরীক্ষা ও গোয়েন্দা) ফিরোজ শাহ আলম, সিআইসির মহাপরিচালক বেলাল উদ্দিন, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান, ইআরএফ সভাপতি সাইফ ইসলাম দিলাল, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমানসহ ইআরএফের প্রতিনিধিরা, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার এ এফ এম আবদুল্লাহ খান, চট্টগ্রাম অঞ্চলের কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগের কমিশনার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

দ্বিতীয় পর্যায়ের সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।   এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল খালেদ ইকবাল, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা, চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা ও বিভিন্ন স্টেকহোল্ডাররা উপস্থিত ছিলেন।

সংলাপ অনুষ্ঠানে নজিবুর রহমান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কার্যক্রমের পদ্ধতিগত উন্নয়নের প্রত্যয় জানিয়ে বলেন, ‘চট্টগ্রাম কাস্টমকে একটি উন্নত ও আধুনিক মানের ব্যবসা সহায়তার কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাই। সে জন্য সকল স্টেকহোল্ডার ও অংশীজনদের সহযোগিতা চাই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহায়তার জন্য চট্টগ্রাম কাস্টম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে কোনো ধরনের গড়িমসি, ব্যত্যয়, আপস চলবে না। বাণিজ্য সহায়তার সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্য নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। ’ এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এই চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে কাউকে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। কাউকে ব্যক্তিগত লাভ করতে দেওয়া হবে না।

অতীতের ধারা থেকে বের হয়ে আসতে বাণিজ্য ও রাজস্ব নিরাপত্তায় কাস্টম হাউস এবং শুল্ক গোয়েন্দারা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এনবিআরের পাশাপাশি সরকারের সব সংস্থা কাস্টমসের ওপর নজর রাখছে। রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির জন্য কাস্টম হাউসের নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা কাস্টম হাউসের কর্মকর্তাদের জন্য হুমকি সৃষ্টি, নিরাপত্তা বিঘ্নিত ও কর্মকর্তাদের নাজেহাল করার চেষ্টা করছেন তাদের খেসারত দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন চেয়ারম্যান।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তার হুমকির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার কাজ ধীরে ধীরে চললেও এর গভীরতা থাকে অনেক বেশি। আমরা সমস্যার মূল উৎপাটন করতে চাই। যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এনবিআরের উদ্যোগ ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সহায়তায় আমরা বিপুল পরিমাণ জনবল নিয়োগ দিচ্ছি। এতে এনবিআরের জনবলের সমস্যা দ্রুত কেটে যাবে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে বেশ কিছু সৎ, অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হবে। ’

তিনি আরো বলেন, রাজস্ব নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের জন্য যারা হুমকি তৈরি করবেন তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকিদাতা হিসেবে গণ্য হবেন। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এনবিআর থেকে খুব শিগগিরই একটি নিরাপত্তা সম্মেলন করা হবে সেখানে সকল স্টেকহোল্ডার ও আইন-শৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িতদের আহ্বান জানানো হবে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক পদ্ধতিতে শুল্কায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ফালতু চিরতরে বিদায় নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ফালতুরা আর ফেরত আসতে পারবে না। ‘জিরো টলারেন্স নীতির’ আওতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, বিগত দিনে কিছু বহিরাগত চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউসে বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে। এসব বহিরাগতকে এনবিআর চেয়ারম্যান ফালতু হিসেবে অভিহিত করেন।  

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে নিলাম ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান এনবিআরের মেসেজ বিভিন্ন দপ্তরে চলে গেছে যে, জিনিসপত্র এনে বিনা পয়সায় আর ব্যবহার করা যাবে না। এ মেসেজের ফলে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের জিনিসপত্র দ্রুত খালাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মতবিনিমিয় সভায় কাস্টম হাউস, চট্টগ্রামের কমিশনার তাঁর দপ্তরের কার্যক্রম, সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে একটি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র বলেন, ‘এখন সময় এসেছে হাতে হাত ধরে কাজ করার। আমরা তাই করার চেষ্টা করছি। দেশপ্রেম আমাদের সঠিক পথ দেখাবে। ’

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, এনবিআর এবং ব্যবসায়ীদের একসঙ্গে কাজ করতে মাইন্ড সেট করতে হবে। জোর করে একসঙ্গে কাজ করানো যাবে না। এ জন্য রাজস্ব সংলাপের বিকল্প নেই।


মন্তব্য