kalerkantho


লেখকের সেরা বই

লাতিন আমেরিকার মন ও মনন

রাজু আলাউদ্দিন

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



লাতিন আমেরিকার মন ও মনন

বাংলা ভাষায় লাতিন আমেরিকার গল্প, উপন্যাস ও কবিতার একাধিক সংকলন থাকলেও প্রবন্ধের সংকলন আমার চোখে পড়েনি কখনো। অথচ এমন নয় যে লাতিন আমেরিকার প্রবন্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি।

ইউরোপ বা আমেরিকার মতো সাহিত্যতাত্ত্বিক কোনো ঐতিহ্য হয়তো সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে ওঠেনি সেখানে, কিন্তু সাহিত্য-সম্ভোগের জন্য যে অন্তর্দৃষ্টি ও সামগ্রিকতাবোধ প্রধান গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে, তার সব রকম লক্ষণ তীব্রভাবে উপস্থিত রয়েছে লাতিন আমেরিকার প্রবন্ধে। অর্থাৎ লাতিন আমেরিকার শুধু কথাসাহিত্য ও কবিতায়ই নয়, প্রবন্ধেও রয়েছে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর। কিন্তু যেহেতু কথাসাহিত্য ও কবিতার জন্যই লাতিন আমেরিকার ব্যাপক পরিচয়, তাই এ পরিচয় উজিয়ে তাদের মননশীলতার বাহক ‘প্রাবন্ধিক’ পরিচয়ের দিকে তাকানোর তাগিদ বোধ করিনি আমরা। অথচ এই পরিচয় বাদ দিয়ে তাদের সৃষ্টিশীল মনের তাত্পর্য বুঝে ওঠা অসম্ভব।

বাংলা ভাষায় এই প্রথম তাদের মননশীল সত্তার—খণ্ডিত আকারে হলেও—যৌথ আদলটি এই গ্রন্থে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। খুব যে পরিকল্পনা করে এই গ্রন্থ রচিত হয়েছে, তা নয়। নানা সময় বিভিন্ন উপলক্ষে লাতিন আমেরিকার যেসব প্রবন্ধ অনুবাদ করেছিলাম, তা-ই সংকলিত হলো এখানে। আশা করি, ভবিষ্যতে যোগ্যতম কেউ এ বিষয়টি আরো পূর্ণাঙ্গ ও বৃহৎ আকারে পাঠকদের সামনে হাজির করবেন। আপাতত এটি সেই বৃহতের সূচনা হয়ে থাকল।

সংকলিত প্রবন্ধগুলোর মধ্যে একটি বাদে বাকি সবই স্পানঞ্চল থেকে অনূদিত। প্রবন্ধগুলোর দুটি পর্বের প্রথম পর্বে আছে বিক্তোরিয়া ওকাম্পোর আর্হেন্তিনায় রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন; হোর্হে লুইস বোর্হেসের ‘রবীন্দ্রনাথের আগমন’, ‘কালেক্টেড পোয়েমস অ্যান্ড প্লেজ’, ‘জাতীয়তাবাদ এবং রবীন্দ্রনাথ’; ওক্তাবিও পাসের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাণ্ডুলিপি, সমালোচনা প্রসঙ্গে, হুয়ান রুলফোর ‘পেদ্রো পারামো সম্পর্কে আমার ভাবনা’, ফিদেল কাস্ত্রোর ‘তার স্মৃতিগুচ্ছের উপন্যাস’, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘তাহলে গানের কথাই বলি’, ‘এন্থনি কুইনের বোকামি, এদুয়ার্দো গালেয়ানোর ‘আকাঙ্ক্ষা’; হুয়ান হোসে সায়েরের ‘ঔপন্যাসিক বোর্হেস’, মারিও বার্গাস য়োসার ‘গ্রন্থ, যন্ত্র এবং মুক্তি’, ‘সহস্র এক রজনী’; আলোন্সো কুয়েতোর ‘সীমাতিক্রমের মহাকাব্য’; মারিয়া এলেনা বারেররা আগরওয়ালের ‘রবীন্দ্র অনুবাদ প্রসঙ্গে’। দ্বিতীয় পর্বে আছে মারিও বার্গাস য়োসাকে লেখা ফের্নান্দো দে সিসলো, হুলিও কোর্তাসার, কার্লোস ফুয়েন্তেস, পাবলো নেরুদাসহ হোসে দোনোসোর চিঠি, যা মারিও বার্গাস য়োসাকে জানতে সাহায্য করবে।

লাতিন আমেরিকার ননফিকশনের শুরু বলতে গেলে একেবারে ঔপনিবেশিকের সূচনা থেকেই। বিজয়ীদের সঙ্গে যেসব বর্ণনাকারী (ক্রনিকলার) আসতেন, আন্তেনিও পিগাফেত্তা, বের্নাল দিয়াস দেন কাস্তিইয়ো—তাঁদের হাতেই এক অর্থে ননফিকশনের সূচনা হয়েছিল। তবে সেগুলো ছিল প্রধানতই ইতিহাসনির্ভর বর্ণনা। সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্ব নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয় আরো পরে, অন্তত কয়েক শ বছর পরে। আমার ইচ্ছা আছে এই বইয়ের পরের সংস্করণে একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র দাঁড় করানোর। আপাতত একটা ধারণা যাতে পাওয়া যায়, সে জন্যই এ গ্রন্থের অবতারণা। আশা করি, আমার অনূদিত এই গ্রন্থটি পাঠকের ভালো লাগবে। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে গ্রন্থ কুটির, প্রচ্ছদ করেছেন মুস্তাফিজ কারিগর, মূল্য ২০০ টাকা।


মন্তব্য