kalerkantho

ডুগডুগির আসর

প্রশান্ত মৃধা

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ডুগডুগির আসর

‘ডুগডুগির আসরে’র প্রাথমিক পরিকল্পনা ভিন্ন ছিল। এমন না যে গল্প লেখার পরিকল্পনা থেকে উপন্যাস। তা কখনো কখনো অনেকেরই ঘটে। কাহিনির চুম্বকটা মাথার একদম ভেতরে দানা বাঁধে। তাকে প্রায় পরিকল্পনাহীনভাবে আদল দিতে গিয়ে সেই কাহিনি হাতছাড়া হয়। দীর্ঘ কাহিনির রূপ পায়, তা কখনো কখনো ভালো বড় গল্প হয়, কদাচ উপন্যাস। ডুগডুগির আসরের ক্ষেত্রে পরিকল্পনাটা ছিল এর উল্টোই। অনেক মানুষের সমাবেশ এই উপন্যাসে। তাদের প্রত্যেককে নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গল্প। একেকটি গল্পে প্রায় সবাই উপস্থিত, কিন্তু একজন সেখানে প্রধান। এই ভাবনা আসলে দানা বাঁধেনি, তার আগেই লিখতে শুরু করেছি।

দানা না বাঁধার কারণ, ওইভাবে ভাবতে গেলে পুরো ছবিটাকে এক জায়গায় প্রায় আনাই যায় না। খণ্ড খণ্ড হয়ে ধরা দেয়।

এরা সবাই এক কোর্ট চত্বরের ক্যানভাসার। কেউ কাপড়-কাচার পাউডার বিক্রেতা, কেউ বানর খেলা দেখায়, কেউ শুধু খেলা দেখায়। সঙ্গে আছে অশ্বত্থ গাছের নিচে বই বিক্রেতা, যৌনশক্তিবর্ধক তেলের ক্যানভাসার আর দাঁত তোলা, কান খোঁচানো মানুষজন। এদের সঙ্গে টাইপিস্ট কি দালাল কিসিমের কেউ কেউ তো আছেই। সঙ্গে এখানে প্রায় ভাসমান নারীরা আছে। অথবা আছে এদের কারোর সঙ্গে আত্মীয় সম্পর্কের এক-দুজন।

পেশার টানাপড়েন আর তা দিয়ে সম্পর্কের মাত্রা, তাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আশির দশকের শেষ দিকে এই ছোট্টো মফস্বল শহর থেকে যখন ট্রেন তুলে নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত হয়, তখন এই কোর্ট চত্বরে তার ছাপ পড়ে। এমনিতেই উপজেলায় আদালত চলে গেছে, আয়-রোজগার কমছে, রেলস্টেশন একটা জায়গা ছিল, সেটা উঠে গেলে তাদের অন্নের সংস্থানই প্রায় থাকে না।

আর এই মানুষগুলোর ভেতরে নারী-পুরুষ সম্পর্কেরও আলাদা আলাদা মাত্রা। তাও তো চিহ্নিত হয় যেন বেঁচে থাকারই প্রয়োজনে।

যদিও এই সব কোনো কথা বলে এই উপন্যাস সম্পর্কে কিছুই বলা হবে না। নিজের লেখা সম্পর্কে কিছু বলা শোভনও নয়। লেখার চেষ্টার কথাও কোনো কাজের নয়। যদি লেখাটা শেষ পর্যন্ত না দাঁড়ায়।

আর কোনো লেখা দাঁড়ালেই বা কী? যে মানুষদের নিয়ে এমন কাহিনি, সর্বহারার ভেতরেও যারা সর্বহারা, তাদের নিয়ে একখানি উপন্যাস রচনা করলে, তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। কোনো উত্তরণ ঘটে না। জীবনকে যাপন করার কোনো ধরনের অনিশ্চয়তাকে এক তিল নিশ্চয়তাও কোনোভাবে দেওয়া হয় না। আবার এই সব প্রকাশ্য মানুষজন, তাদের পেশার ছল বলি আর চাতুরীই বলি, বেঁচে থাকার পুরোটাই প্রকাশ্য। মানুষকে ঠকানোটাও প্রকাশ্য আবার তাতেই যে তার পেটের ভাত সেই দাবিও প্রকাশ্য। প্রেম কি অপ্রেম, ক্রোধ কি আনন্দ—তা সবার মতোই প্রকাশ্য আর সঙ্গোপন।

ওদিকে, পকেট থেকে যে ডুগডুগিটা বাজিয়ে তারা মানুষকে জড়ো করে। সেই ছোট্ট সমাবেশে সেই নেতা। বক্তৃতা দানের অসাধারণ ক্ষমতা তাদের মানুষ আটকে থাকে। অন্য অর্থে, জীবন তো এই ডুগডুগির ডাকের এক আসরেরই মতো, যা তার নিমিষে মিলায়, ক্ষণিক পরেই ভেঙে যায়।

ডুগডুগির আসর প্রকাশক : কথাপ্রকাশ। প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা। দাম : ২০০ টাকা।


মন্তব্য