kalerkantho


প্রকৃত পাঠকের ভিড়ে মুখরতা

নওশাদ জামিল   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রকৃত পাঠকের ভিড়ে মুখরতা

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় এখন ভিন্ন সুর। ভিড় ততটা প্রকট নয়। পহেলা ফাগুন, ভালোবাসা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি পেরিয়ে মেলা এখন শেষ সপ্তাহে। সাধারণত একুশে ফেব্রুয়ারির পর বাকি সময়টা থাকে বেশ নিরিবিলি পরিবেশ। অধিকাংশ বইও প্রকাশ হয়ে যায়। তাই দেখেশুনে বই কেনার জন্য এই দিনগুলোই বেছে নেন প্রকৃত পাঠকরা। তাঁরা দুই হাতে বই কেনেন। গতকাল বুধবার গ্রন্থমেলার পরিবেশ ছিল প্রকৃত পাঠকের আনাগোনায় মুখর।

গত দুই দিনের জমজমাট পরিবেশের পর গতকাল মেলায় লোকসমাগম ছিল তুলনামূলক কিছুটা কম। মেলার প্রবেশদ্বারে লম্বা লাইনেও দাঁড়াতে হয়নি আগতদের। তবে সন্ধ্যার পর ক্রেতা-পাঠকের ভিড় বেড়ে যায় কয়েক গুণ।

প্রকাশকরা জানিয়েছেন, এখন থেকে মেলায় বইপ্রেমী মানুষ আসবে বেশি।

মেলা ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েক দিন পর হঠাৎ পাল্টে গেছে অমর একুশে গ্রন্থমেলার দৃশ্যপট। অবিরাম জনস্রোত আর কোলাহলমুখর পরিবেশ ছিল না গতকালের মেলায়। আগতরা ছিমছাম পরিবেশে বিভিন্ন স্টল ঘুরে পাতা উল্টে পছন্দ করেছেন মনের মতো বইটি। সচ্ছন্দে স্টল থেকে স্টল গিয়ে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধের বইগুলো বেছে নিয়েছেন চাহিদামতো।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের সামনে দেখা গেল পাঠক ফাতেমা মুনের দুই হাত ভর্তি নতুন কেনা বই। সদ্য কেনা বইগুলো দুহাতে সামলে বললেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারির আগে মেলায় এলেও সাধারণত বই কিনি না। কারণ এত মানুষের ভিড়ে পছন্দের বইগুলো দেখার সুযোগ পাওয়া যায় না। তাই প্রতি বছর বই কেনার জন্য এ সময়টাকেই বেছে নিই। এ সময় স্বস্তিতে স্টলে স্টলে ঘুরে বই কিনতে পারি। ’

শুধু পাঠকের মধ্যে নয়, প্রকাশকদের মধ্যেও গতকাল ছিল স্বস্তির আভাস। কেননা নেই উপচে পড়া দর্শনার্থী, আছে প্রকৃত ক্রেতা। স্বভাবতই বেড়েছে বিক্রি। স্টলে আগতদের প্রায় সবাই কোনো না কোনো বই কিনে নিচ্ছেন।

ঐহিত্য প্রকাশনীর বিক্রয় কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন কাজল বললেন, ‘স্বস্তিতে আছি। খুব বেশি ভিড় নেই, তবে ভালো বিক্রি হচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারির দিন উপচে পড়া ভিড় ছিল। অথচ সে তুলনায় বিক্রির পরিমাণ ভালো ছিল না। বরং আজ (গতকাল) বিক্রির পরিমাণ আগের দিনের চেয়ে অনেক ভালো। ’

মূলত মেলায় বই বিক্রিতে গতি এসেছে একুশে ফেব্রুয়ারি থেকেই। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে মেলার শেষ দিন পর্যন্ত। বাকি দিনগুলোর মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার আছে। এই দুই দিন ধুন্ধুমার বিক্রি হবে বলে আশা করছেন প্রকাশকরা।

জ্ঞান ও সৃশনশীল প্রকাশক সমিতির নির্বাহী পরিচালক ও পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের পরিচালক কামরুল হাসান শায়ক বলেন, ‘আমার মনে হয় সার্বিকভাবে মেলার বিক্রি এবার গত বছরের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি হবে। এই বিক্রি বাড়ার অন্যতম কারণ এবারের গোছানো মেলা। কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত ভালো। সাধারণ মানুষ উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে মেলায় আসছেন এবং বই কিনছেন। ’

গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের তথ্য-পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

কন্যাকে নিয়ে লেখা : স্মৃতিবাহী গদ্যগ্রন্থটির লেখক বিশিষ্ট কবি কামাল চৌধুরী। সত্তরের মাঝামাঝি তারুণ্যদীপ্ত কবিতা নিয়ে কাব্যজগতে প্রবেশ তাঁর। জীবনযাপনের ব্যস্ততার ভেতরেও কবিতাই তাঁর আরাধনা। এ ছাড়া কিছু গদ্য লিখেছেন, সে সবও তাঁর কবিতার মতো উজ্জ্বল ও শাণিত। এ বইটি তাঁর দিনলিপি। কন্যাকে উচ্চশিক্ষার্থে দূরদেশে রেখে আসতে গিয়ে রচনা করছেন আবেগদীপ্ত এক দিনলিপি। তাতে উঠে এসেছে কন্যার জন্য, দেশের জন্য পবিত্র প্রার্থনার প্রতিচ্ছবি। উঠে এসেছে দূরদেশ সম্পর্কে, উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে তাঁর অন্তর্ভেদী অবলোকনও। পাশাপাশি এসেছে মাউন্ট হলিঅক কলেজ, প্রকৃতি, নিসর্গ ও কলেজের প্রাক্তনীদের কথা। বইটি প্রকাশ করেছে পাঠক সমাবেশ।

কনে দেখা আলোর অহং : কাব্যগ্রন্থটির লেখক কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ। শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখা-প্রশাখায় বিচরণ করলেও তিনি মূলত কবিই। কবিতাতেই প্রতিফলিত হয় তাঁর সৃজনসত্তার পূর্ণ অবয়ব। তাঁর এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সময়। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। সত্তরের দশকের শক্তিমান কবি হাসান হাফিজের এই কাব্যগ্রন্থে আছে মানবমনের সূক্ষ্ম অনুরণন, আধ্যাত্মবোধের প্রসন্ন ঝলক, অন্যায়-অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তাঁর কণ্ঠ উচ্চকিত না হলেও দৃঢ়, সুস্থির ও মানবিক। বইটির মূল্য ১২০ টাকা।

বিষম দাবার চালে : সাংবাদিক ও লেখক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার প্রবন্ধ-নিবন্ধের বই। কলামিস্ট হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। সমসাময়িক নানা বিষয়—রাজনীতি, সমাজনীতি, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সুনিপুণ বিশ্লেষক তিনি। প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় ভাষায় তিনি বইটিতে তুলে ধরেছেন রাজনীতির কূটচাল, গণতন্ত্রের টানাপড়েন, মানবাধিকার ও আইনের শাসনসহ সমাজব্যবস্থার নানা দিক। প্রতিটি রচনায় উঠে এসেছে রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর প্রজ্ঞা ও গভীর অন্তর্দৃষ্টি। বইটি প্রকাশ করেছে শ্রাবণ। প্রচ্ছদ করেছেন রবীন আহসান। দাম ২৫০ টাকা।

প্রতিবাদের নান্দনিকতা—বাংলাদেশের প্রথাবিরোধী চলচ্চিত্র : প্রথাবিরোধী চলচ্চিত্র, তার ভাষা, নির্মাণকৌশলসহ চলচ্চিত্রের খুঁটিনাটি নানা বিষয়ের গ্রন্থ। লেখক নাদির জুনায়েদ। বইটি প্রকাশ করেছে জনান্তিক। প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। দাম ২৭০ টাকা।

মোস্তফা কামালের চার বই : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মোস্তফা কামালের চারটি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ইতিহাসভিত্তিক সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘অগ্নিকন্যা’ প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে প্রেমের উপন্যাস ‘রূপবতী’। অনন্যা প্রকাশ করেছে কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস ‘প্রিন্স উইলিয়ামের আংটির খোঁজে’ ও রম্য রচনার বই ‘কিছু হাসি কিছু রম্য’।

মোড়ক উন্মোচন : গতকাল মেলায় এসেছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। তাঁরা বইমেলা ঘুরে দেখেন। পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে যোগ দেন তাঁরা। গতকাল মেলার মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে দৈনিক মানবকণ্ঠ সম্পাদক আনিস আলমগীরের ‘ধর্ম নিয়ে ব্যবসা’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমান, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল ও কলামিস্ট বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী। বইটি প্রকাশ করেছে আদর্শ প্রকাশনী।

নতুন বই : বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলার ২২তম দিনে নতুন ৮২টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ১০, উপন্যাস ১০, প্রবন্ধ ২, কবিতা ২৮, গবেষণা ১, ছড়া ২, শিশুসাহিত্য ২, মুক্তিযুদ্ধ ৩, বিজ্ঞান ২, ভ্রমণ ১, রাজনীতি ১, চিকিৎসা/স্বাস্থ্য ১, ধর্মীয় ১, অনুবাদ ১ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর ১৭টি বই রয়েছে।

বেহুলা বাংলা এনেছে বিশিষ্ট কবি ও কথাসাহিত্যিক খালেদ হামিদীর মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘সব্যসাচী’। অন্যপ্রকাশ এনেছে রাবেয়া খাতুনের ‘মুক্তিযুদ্ধের বাছাই গল্প’। শ্রাবণ এনেছে তসলিমা নাসরীনের ‘সকল গৃহ হারানো যার’। পাঞ্জেরী এনেছে আনিসুল হকের শিশুতোষ গ্রন্থ ‘আমার একটা পোষা দৈত্য আছে’।

মেলা মঞ্চের আয়োজন : গতকাল মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি : বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক জিনাত হুদা অহিদ। আলোচনায় অংশ নেন আবুল কাসেম ও ড. শাহিনুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল অধ্যাপক শফিউল আলমের পরিচালনায় গেণ্ডারিয়া কিশলয় কচিকাঁচার মেলার সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এ ছাড়া সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী কাদেরী কিবরিয়া, তপন মাহমুদ, শামা রহমান, মহিউজ্জামান চৌধুরী, নীলোত্পল সাধ্য ও শিখা আহমাদ।

আজকের অনুষ্ঠান : আজ বৃহস্পতিবার গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘অনুবাদ সাহিত্য : সাহিত্যের অনুবাদ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অধ্যাপক আবদুস সেলিম। আলোচনায় অংশ নেবেন কবি ড. মুহাম্মদ সামাদ, কবি শামীম আজাদ ও সাদাফ্ সায। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।


মন্তব্য