kalerkantho


সেই নবজাতক এখন শঙ্কামুক্ত

চট্টগ্রাম পুলিশের অনন্য নজির

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সেই নবজাতক এখন শঙ্কামুক্ত

কক্সবাজারের রামু উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এক শিশুকে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে হাসপাতালের দিকে ছুটছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কনস্টেবল শের আলী। পুলিশের এ ইতিবাচক ভূমিকার দৃষ্টান্ত এ কনস্টেবলের সেই ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এবার আরেকটি অনন্য নজির স্থাপন করলেন চট্টগ্রাম নগরের আকবর শাহ থানার ওসি আলমগীর মাহমুদ। দুই দিন ধরে তিনি এক নবজাতককে বাঁচানোর জন্য প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। ওই নবজাতকের জীবন এখন শঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।

কী ঘটেছিল : আকবর শাহ থানাধীন কর্নেল হাট এলাকার লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অবস্থান দোতলায়। দোতলার একটি বাথরুম থেকে অন্তত ১৫ ফুট উঁচু থেকে কিছু একটা ফেলে দেওয়ার আওয়াজ পায় আশপাশের লোকজন। এরপর কান্নার শব্দ শুনে স্থানীয় দুই ব্যক্তি গিয়ে দেখে নালায় পড়ে আছে এক নবজাতক। তারা আকবর শাহ থানার ওসি মোহাম্মদ আলমগীরকে খবর দেয়। তিনি দ্রুত পুলিশের একটি দলকে ঘটনাস্থলে পাঠান, যারা শিশুটিকে উদ্ধার করে। ততক্ষণে ঘটনাস্থলে আসেন আলমগীর মাহমুদ নিজে।

ক্লিনিকের বাথরুম থেকে নিচে ফেলে দিয়ে নবজাতক হত্যাচেষ্টার এ লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে গত ২০ জানুয়ারি রাতে। শিশুকে উদ্ধার করা হয় রাত সাড়ে ৯টার দিকে। এরপর পরবর্তী ৪০ ঘণ্টার বেশি সময় ওসি আলমগীর শিশুটিকে বাঁচিয়ে তোলার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা আলমগীর মাহমুদকে জানিয়েছেন, নবজাতক এখন আশঙ্কামুক্ত। তবে আরো চিকিৎসার প্রয়োজন।

ওসি আলমগীর মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, নর্দমা থেকে নবজাতককে উদ্ধারের পর কাদামাখা অবস্থায় তাকে নিয়ে যান পাশের আল আমিন হাসপাতালে। সেখানে নবজাতকের শরীর পরিষ্কার করার পর দেখা যায়, মাথা ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে। পরে ওই ক্লিনিকের চিকিৎসকদের পরামর্শে শিশুটিকে দ্রুত আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি। শিশুটিকে ইনকিউবেটরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই হাসপাতালে তখন একটি ইনকিউবেটরও খালি ছিল না। নিরুপায় হয়ে নবজাতককে নিয়ে তিনি ছুটে যান চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের একজন চিকিৎসক বন্ধুর মাধ্যমে দ্রুত নবজাতককে ইনকিউবেটরে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। পরদিন মঙ্গলবারও শিশুটির জীবন সংকটে ছিল।

ঘটনার বিষয়ে ওসি বলেন, ‘আমার নিজের একটি মেয়ে আছে। বয়স ১০ বছর। বাবা ডাক শোনার সুখ যে কী! পৃথিবীতে বাবা ছাড়া আর কে বুঝবে? এই নবজাতককেও আমি নিজের সন্তান মনে করেই বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়েছি। ’ তিনি জানান, নবজাতকটিকে বাঁচানোর চেষ্টায় ব্যস্ত থাকায় ঘটনার দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ পাননি। শিশুটির জীবন এখন অনেকটা শঙ্কামুক্ত। এর রহস্য উন্মোচনের দিকে নজর দেবেন তিনি।

ওসি জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাঁরা জেনেছেন যে লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বাথরুম থেকেই নবজাতকটিকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বাথরুমের ভেনটিলেটরে এখনো রক্তের দাগ আছে।

ওসি জানান, হাসপাতাল সূত্রেই তাঁরা জেনেছেন যে সোমবার রাতে লিপি বেগম নামের এক নারী ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে যায়। তার সঙ্গে দুজন পুরুষ ও এক নারী ছিল। ক্লিনিকটির সংশ্লিষ্ট শাখায় লিপি বেগমের বয়স লেখা হয়েছে ১৭ বছর। নাম নিবন্ধনের পর সঙ্গীদের সঙ্গে অপেক্ষা করছিল এ কিশোরী। একপর্যায়ে সে বাথরুমে যায়। সেখানে গিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা ছিল। সেখানেই সে সন্তান প্রসব করে এবং ভেন্টিলেটর দিয়ে নবজাতককে বাইরে ছুড়ে ফেলে বলে তাঁদের ধারণা। পরে যথারীতি লিপির আলট্রাসনোগ্রাফি হয় এবং চিকিৎসক এম কে পাশা তার পেটে বাচ্চা নেই বলে প্রতিবেদন দেন।

আলমগীর মাহমুদ বলেন, লিপি বেগম ও তার সঙ্গীদের খোঁজা হচ্ছে। তাদের ধরা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইদুল মজিদ দাবি করেছেন, তাঁদের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসাধীন নবজাতককে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলার পর হাসপাতালের পরিচালকের কাছে হস্তান্তর করবে। এর মধ্যে তাঁরাও আদালতকে বিষয়টি জানাবেন। আদালতের নির্দেশনা অনুসারে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এর মধ্যে অনেকেই শিশুটি দত্তক নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ফোন করছেন।


মন্তব্য