kalerkantho


একে একে ছোট ৩ ভাই-বোনকে কুপিয়ে হত্যা

আরেকজনকে জখম

নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



একে একে ছোট ৩ ভাই-বোনকে কুপিয়ে হত্যা

স্বজনদের আহাজারি

মাদরাসা থেকে সন্ধ্যায় মেজো ভাই রুবেল মিয়ার (২২) হাত ধরে বাড়ি ফিরেছিল ১০ বছরের ছোট ভাই ইয়াসিন মিয়া। এর দুই-আড়াই ঘণ্টা পর ঘুম পাড়ানোর কথা বলে ডাক দিলে সাত বছরের ছোট বোন মরিয়মও যায় রুবেলের কক্ষে। কিন্তু যে স্নেহ, মমতা আর ভরসার ডাক পেয়ে তারা ভাইয়ের কাছে গিয়েছিল, সেই ভাইটিই হলো হন্তারক। তাদের দুজনকেই শ্বাস রোধ করে হত্যা করে রুবেল। এরপর রাত ১০টার দিকে মায়ের সঙ্গে ঘুমিয়ে থাকা আরেক ছোট বোন পাঁচ বছরের মাহিয়াকেও শ্বাস রোধ করে করে সে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর নরসিংদী সদর উপজেলার চরাঞ্চল আলোকবালীর পূর্বপাড়া গ্রামে চার ঘণ্টার ব্যবধানে ছোট ছোট এই তিনটি শিশুকে হত্যা করে তাদের সহোদর ভাই রুবেল। এখানেই শেষ নয়, রাত ১১টার দিকে মাদরাসা শিক্ষক বড় ভাই আতিকুর মিয়াকে (২৪) মায়ের কথা বলে মাদরাসা থেকে ডেকে নিয়ে আসে রুবেল। বাড়ির কাছে আসতেই আতিককেও হত্যা করতে দা দিয়ে কোপানো শুরু করে সে। গুরুতর অবস্থায় প্রতিবেশীরা আতিকুরকে বাড়িতে নিয়ে এলে কিছুক্ষণ আগে বাড়িতে সংঘটিত তিন খুনের বিষয়টিও সবাই জানতে পারে।

গতকাল বুধবার ভোরে পুলিশ তিন সহোদরের মৃতদেহ উদ্ধার করে। আহত বড় ভাই আতিককে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

জনতা গতকাল সকালে ঘাতক রুবেলকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। গ্রেপ্তারকৃত রুবেল পুলিশ ও জনতার কাছে হত্যার কথা স্বীকার করলেও কী কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলেনি। এর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশায় থাকা পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ডে নিয়ে তাকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

ঘাতক রুবেল আলোকবালী পূর্বপাড়া গ্রামের শ্রমজীবী আবু কালামের ছেলে। আবু কালাম নদীপথে বাঁশ পরিবহনের কাজ করেন। এ কাজে তাঁকে ছেলেরাও সহায়তা করে থাকে। বড় ছেলে আতিক মিয়া (২৫) বাড়ির পাশে আলোকবালী দারুস সুন্নাহ মাদরাসার সাধারণ শিক্ষক। ছোট ছেলে নিহত ইয়াসিন (১০) ওই মাদরাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। নিহত ছোট দুই শিশুকন্যা মরিয়ম ও মাহিয়া কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি। কালামের বড় দুই ছেলের মধ্যে মেজো রুবেল বিয়ে করলেও বড় ছেলে আতিক বিয়ে করেননি।

পুলিশ ও নিহতদের স্বজনরা জানায়, গত মঙ্গলবার রুবেলের স্ত্রী ও সন্তান শ্বশুরবাড়িতে যায়। সন্ধ্যার আগে তার বাবা কালাম ছোট ভাই ইসমাইলকে (১৬) নিয়ে নদীতে বাঁশ পরিবহনের কাজে চলে যান। আর বড় ছেলে আতিক ও ছোট ছেলে ইয়াসিন ছিল ওই আবাসিক মাদরাসায়। ফলে বাড়িতে শুধু মা ও ছোট দুই বোন ছিল।

এই সুযোগে সন্ধ্যায় রুবেল মাদরাসা থেকে মায়ের কথা বলে ছোট ভাই ইয়াসিনকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে এসে নিজ কক্ষে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে। রাতে মায়ের কাছ থেকে ছোট বোন মরিয়মকে নিজ ঘরে ঘুমানোর কথা বলে ডেকে নিয়ে একইভাবে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে। মা ঘুমিয়ে পড়লে তাঁর সঙ্গে থাকা ছোট বোন মাহিয়াকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে সে।

পরে রাত ১১টার দিকে রুবেল মাদরাসা থেকে বড় ভাই আতিক মিয়াকে মায়ের কথা বলে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসে। পথে হঠাৎ করে রুবেল পেছন থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে বড় ভাইয়ের মাথায় আঘাত করলে তিনি চিত্কার শুরু করেন। ওই সময় এলাকাবাসী ছুটে এসে আতিকুরকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে গেলে অন্য ভাই-বোনদের হত্যার বিষয়টি নজরে আসে। আহত আতিককে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার সময় এই কয়েক ঘণ্টা বাড়ি ও পার্শ্ববর্তী মসজিদের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল রুবেল।

ছোট ছোট তিন ভাই-বোন সহোদর ভাইয়ের হাতে খুন হওয়ার ঘটনায় স্তম্ভিত আলোকবালী গ্রামের মানুষ। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে নিজ গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের হাজারো লোক ভিড় জমায় নিহতদের বাড়িতে। পুলিশ তাদের লাশগুলো সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেও ভিড় জমায় মানুষ।

আলোকবালী গ্রামের আবু তাহের বলেন, এটা হৃদয়বিদারক ঘটনা। সে যদি সুস্থ মাথায় এই শিশুগুলোকে হত্যা করে থাকে তাহলে তার ফাঁসি হওয়া দরকার।

নিজের মেজো ছেলের হাতে তিন ছেলে-মেয়ের হত্যার ঘটনায় বাকরুদ্ধ মা কুলসুম বেগম। তিনি সাংবাদিকদের জানান, প্রতিটি সংসারেই কিছু ছোটখাটো মনোমালিন্য থাকে। কিন্তু ভাই-বোনদের মেরে ফেলার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ তিনি জানাতে পারেননি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বড় ভাই আতিক মিয়া বলেন, ‘রুবেলের সঙ্গে পরিবারের কারো কোনো বিরোধ নেই। তবে সে একটু উদাসীন স্বভাবের। এক বছর আগে সে বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। সে প্রায়ই অভিযোগ করত, তার বউ পরিবারের বেশি কাজ করে। এমনকি সম্প্রতি আমার বিয়ের পাত্রী দেখায় তাকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে বলেও সে অভিযোগ করত। এসব ছোটখাটো বিষয় ছাড়া তার এমন হিংস্র হওয়ার বড় কোনো কারণ আমাদের জানা নেই। ’

এই ঘটনায় নিহতদের বাবা আবু কালাম বাদী হয়ে ছেলে রুবেলের বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সে আমার চোখের মণিদের হত্যা করেছে। আমি তার ফাঁসি চাই। ’

অন্যদিকে গতকাল বুধবার সকালে বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি ঝোপ থেকে ঘাতক রুবেল মিয়াকে আটক করে এলাকাবাসী। পরে তাকে স্থানীয় আলোকবালী বাজারে বেঁধে রেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। ওই সময় রুবেল এলাকাবাসীকে জানায়, সে মাকে ছাড়া পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু কী কারণে তাদের হত্যা করেছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলেনি। রুবেল পুলিশকে বলে, ‘আমার কী হয়েছিল বলতে পারব না, খুন করার পর বুঝেছি খারাপ কাজ করেছি। ’  ঘাতক রুবেল মিয়ার স্ত্রী সুফিয়া বেগম পুলিশকে জানান, সে গত তিন থেকে চার দিন ধরে অস্থিরতায় ভুগছিল।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শাহরিয়ার আলম বলেন, নিহতদের লাশ নরসিংদী সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের লোকজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতদের পরিবার ও গ্রেপ্তারকৃতকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায়নি। যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা আপন ভাই-বোন খুন করার মতো বিষয় নয়। গতকাল বিকেলে সিআইডির একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

ঘটনাটির বর্ণনা শুনে নরসিংদী সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলাউদ্দিন আল আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মানুষের মধ্যে যদি অস্থিরতা ও বৈকল্যতা থাকে তখন মানুষের মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে যায়। জেগে ওঠে পাশবিকতা। এটা বড় ঘটনার পাশাপাশি ছোট ঘটনা থেকেও তৈরি হতে পারে। এ জন্য পারিবারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।


মন্তব্য