kalerkantho

গল্পগাথা

শাহ্ৎনাজ মুন্নী

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গল্পগাথা

প্রথমেই একটা কথা বলে নিই, প্রতিবছর বইমেলা এলেই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি নতুন বইয়ের খোঁজ-খবর করতে। কিন্তু নতুন বইয়ের বাইরেও বাজারে থাকে গত বছর বা তারও আগে প্রকাশিত অনেক বই। বই নিশ্চয়ই ‘ওয়ান টাইম ইউজে’র মতো কোনো পণ্য নয় যে এক বছর গেলেই সেটা পুরনো হয়ে গেল। লেখকরা তাঁদের পুরনো বইগুলোর প্রতিও তো কম টান অনুভব করেন না। তার পরও নতুন বই বলে কথা। তবে সত্যি বলতে কি, নিজের বই নিয়ে কোনো কথা বলতে আমার বরাবরই খুব সংকোচ হয়, একরকম লজ্জাই লাগে। কী বলবো ঠিক ভেবে পাই না। মনে হয়, একটা বই নিজেই তো যথেষ্ট তার নিজের কথা বলার জন্য। লেখকের সেখানে আলাদা করে আর কী বলার থাকে? তা ছাড়া একজন লেখক যখন একটা বই জনসমক্ষে প্রকাশ করে ফেলেন, তখন সেই বই নিয়ে কিছু বলার অধিকার হয়তো একমাত্র তার পাঠকেরই থাকে।

সে যা-ই হোক, এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে আমার একটি ছোটগল্প সংকলন। প্রকাশ করেছে চিত্রা প্রকাশনী।

কালের কণ্ঠ’র আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘গল্পগাঁথা’ সংকলনটি নিয়েই দু-চার কথা বলছি।

এই সংকলনে আমার নতুন-পুরনো মিলিয়ে মোট ১০টি গল্প সংকলিত হয়েছে। পাঠকদের জন্য গল্পের সূচিটি উল্লেখ করছি—‘উনার নাম আলাউদ্দিন’, ‘আমি আর আমিন যখন আজিমপুর থাকতাম’, ‘বাঘা আইড়’, ‘ফেয়ার এন্ড ফাইন লুক’, ‘জ্বিনের কন্যা’, ‘মেয়ে মানুষের গোশত’, ‘বৃষ্টির প্যারাসুট’, ‘নানার কাহিনী’, ‘ছেরাদ্দ’ ও ‘চিল্লা’।

এগুলো সবই ছোটগল্প। মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবন তো এক অনিঃশেষ গল্পই—যে গল্পের শেষ নেই, শুরু নেই, আদি-অন্ত কিছুই নেই; এ এক এমন গল্পময় জগৎ, যেখানে আছে মায়াবী বিভ্রম, আছে আলো-আঁধারের লুকোচুরি, আছে সত্য-মিথ্যার মিশেলে তৈরি এক অলৌকিক নান্দনিকতা।

বাংলা গল্পের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। গত এক শ বছরে নানা বৈচিত্র্য, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে বাংলা গল্প একটা পরিণত অবস্থায় পৌঁছেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে গল্পের প্লট, চরিত্র, আঙ্গিক ও চিন্তাকাঠামো। রবীন্দ্রনাথের ‘ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা’র সংজ্ঞা বহু আগেই পেছনে ফেলে গল্প এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। ভাষা, আঙ্গিক, বিষয় ও শৈলীতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন।

২০-২৫ বছর ধরে গল্পচর্চার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জেনেছি, এই সমাজের প্রতিটি মানুষের জীবনেই একটা গল্প আছে। সমাজের বিভিন্ন ঘটনা, ব্যক্তিমানুষের মানবিক টানাপড়েন, দুঃখ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি—সব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই ব্যক্তি লেখক যান। কিন্তু সব গল্পই তো আর গল্প হয়ে ওঠে না। তবু লেখক এর মাঝেই গল্প খোঁজেন, গল্প নির্মাণ করেন, বাস্তবতার মাটিতে পা রেখে নির্মাণ করেন ভিন্ন বাস্তবতা। তাঁর কল্পনা ও অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে জন্ম নেয় শিল্প। ভাষার ওপর তাঁর দক্ষতা ও চিন্তার কারুকৌশল মিলিয়ে নির্মিত হয় গল্প।

গল্পের নানা রকমভেদ থাকে। এই বইয়েও সে রকম নানা ধরনের গল্প সংকলিত আছে। কিছু আছে বাস্তবতানির্ভর, কিছু কল্পনানির্ভর, কিছু বিষয়বস্তুপ্রধান, কিছু আাাঙ্গিকপ্রধান বা চরিত্রপ্রধান। গল্পে সব কিছুই থাকে—থাকে বাস্তবতা, থাকে কল্পনা, থাকে বিষয়ের বৈচিত্র্য, থাকে আঙ্গিকের খেলা, চরিত্রের ঘনঘটা। আবার হয়তো এসবের কোনোটাই থাকে না, বরং গল্প তার আপন ভঙ্গিমায়ই হয়ে ওঠে আলাদা। শিল্প এমনই, এর কোনো স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম-কানুন নেই, সুনির্দিষ্ট আকৃতি-প্রকৃতি নেই।

তবে গল্পের আঙ্গিক নিয়ে খুব বেশি জোর-জবরদস্তি করি না আমি; কেননা প্রায় সময়ই লিখতে গিয়ে দেখেছি, বিষয়ই বলে দেয় গল্পটি কোন আঙ্গিকে লেখা উচিত। অনেক সময় রাস্তায় শোনা একটি-দুটি ছেঁড়াখোঁড়া বাক্য মাথায় নিয়ে লিখতে বসি, জানি না পরের লাইনে কী লিখব। আবার অনেক সময় হয়তো গল্পের শুরুটা জানি, শেষটা জানি না। কখনো শেষটা জানি, কিন্তু শুরুটা জানি না। এই জানা-অজানার মধ্য দিয়েই চলে গল্প নির্মাণ। তবে প্রায় সময় গল্পের একটা কঙ্কাল থাকে মাথায়, লিখতে বসে ধীরে ধীরে সেই কঙ্কালেই রক্ত-মাংসের আস্তরণ পড়ে। ধীরে ধীরে একটা অবয়ব নির্মিত হয়। নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা সেই গল্পকে কখনো চিনতে পারি, কখনো পারি না। মাঝে মাঝে মনে হয়, গল্প লেখা অনেকটা কাপড় বোনার মতো—কয়েকটা রঙিন সুতা থাকে হাতে, তারপর সেই সুতাকে বিন্যাস করে শুরু হয় গল্প বুনন। সুতাগুলো তখন আর সরল, রঙিন, লম্বা সুতা থাকে না; হয়ে যায় একটা নকশাদার শাড়ি বা রঙিন গামছা। তবে সফল গল্পে সাধারণত আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুর সুন্দর সমন্বয় ঘটতে দেখা যায়। দেখা যায় বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কল্পনার চমত্কার মিশেল। গল্পে বক্তব্য থাকে, তবে সেই বক্তব্য থাকে প্রচ্ছন্ন; গল্প ছাপিয়ে বক্তব্য প্রকট হয়ে উঠলে প্রায়ই গল্পের সৌন্দর্য নষ্ট হয়।

ইদানীং গল্পের কাহিনী বা আখ্যানকে অস্বীকার করে গল্পহীন গল্প লেখার চর্চা করছেন অনেকে। গল্পের প্রচলিত কাঠামোকে ভেঙেচুরে গল্পে আনতে চাইছেন নতুনত্বের ঝাঁজ। গল্প নিয়ে যেকোনো নিরীক্ষাকে আমি স্বাগত জানাই। আমি নিজেও কিছু কিছু নিরীক্ষার চেষ্টা করেছি; কেননা আমার বিশ্বাস, নিরীক্ষা সব সময়ই নতুন কিছুর জন্ম দেয়।

শুরুতে যেমন বলেছিলাম, কী লিখেছি তা পাঠকই বলবে। শেষেও তেমনি বলছি, বই প্রকাশের পর লেখকের মৃত্যু ঘটে, সহৃদয় পাঠকই নতুন ব্যখ্যায়, ভিন্ন অর্থে বই ও লেখকের পুনর্জন্ম ঘটান। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে পাঠাভ্যাস আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এই বইমেলায় প্রত্যাশা করি, মানুষের পাঠাভ্যাস বাড়ুক। জন্ম নিক নতুন ও সৃজনশীল পাঠক।


মন্তব্য