kalerkantho


একুশের দিনে এলো পূর্ণতা

নওশাদ জামিল   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



একুশের দিনে এলো পূর্ণতা

অমর একুশের দিনে গতকাল মঙ্গলবার গ্রন্থমেলা জনসমাগমে ছিল উত্তাল; কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যে জনস্রোতের সূচনা থেকেছে দিনভর। সন্ধ্যা নাগাদ সেই ঢল রূপ নেয় জনসমুদ্রে। একপর্যায়ে মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের সড়কগুলোতে একটু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ পাওয়াও দুষ্কর হয়ে ওঠে।

অমর একুশের দিনটি শোকের। বাংলা ভাষার জন্য যাঁরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর। ভাষা দিবসের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে এদিন পথে নামে মানুষের ঢল। সব পথ গিয়ে মিশে যায় শহীদ মিনারে। শহীদ বেদিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো শেষে সবাই আসে একুশের চেতনালালিত বইমেলায়। গতকালও ছিল তা-ই। বইমেলার দ্বার খুলে যায় সকাল ৮টায়। চলে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত।

বেলা যতই গড়িয়েছে মেলায় ভিড়ও তত বেড়েছে।

প্রবেশপথে দীর্ঘ সারি, দীর্ঘক্ষণ ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থেকে ঢুকতে হয়েছে মেলা প্রাঙ্গণে। তাতেও ক্লান্তির ছাপ ছিল না আগতদের চোখে-মুখে। দিনভর ক্রেতা-দর্শনার্থীর ভিড়ে জমজমাট ছিল একুশের গ্রন্থমেলা। প্রাণের মেলায় আগত মানুষের ভিড় কেবল ভেতরে নয়; তা ছড়িয়েছে টিএসসি, দোয়েল চত্বরসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ক্যাম্পাসে। টিএসসি মোড় থেকে পাশাপাশি দুটি লাইন এসে থেমেছে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশ ও বাংলা একাডেমির প্রবেশমুখে। একইভাবে শহীদ মিনার এলাকা থেকে সর্পিল আকৃতির লাইন এসে মিশেছে দক্ষিণের প্রবেশমুখে।

মেলায় আগতদের মধ্যে একুশের সাজও ছিলও চেতনার ঢংয়ে সজ্জিত। ‘অ’ ‘আ’ কিংবা ‘ক’ ‘খ’ বর্ণমালা লেখা বাহারি শাড়ি পরা তরুণীদের হাত ধরে আসা তরুণদলের পরনেও ছিল বর্ণখচিত পাঞ্জাবি-ফতুয়া। গালে-কপালে জাতীয় পতাকা ও শহীদ মিনার এঁকে কচি-কাঁচার উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পরিপূর্ণতা পেয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা।

কথা হলো সাবেক সংসদ সদস্য মোশতাক আহমেদ রুহীর সঙ্গে। বললেন, ‘ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমরা যেমন গর্ব করি, তেমনি গর্ব করি এই গ্রন্থমেলা নিয়ে। ’ কথা প্রসঙ্গে জানান, গতকালই তাম্রলিপি থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘রাজনীতি হ য ব র ল’।

জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ও অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘মেলায় প্রচুর পাঠকের সমাবেশ ঘটেছে। তবে আয়োজনে কিছু অসংগতি এখনো রয়ে গেছে। পাইরেটেডে ও ভারতীয় লেখকদের বই বিক্রি করা হচ্ছে অনেক স্টলে। এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। ’

মেলায় এদিন বইয়ের বিক্রিও ছিল আশানুরূপ। পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের পরিচালক কামরুল হাসান শায়ক বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারিতে বরাবরই মেলায় ভিড় হয়। তবে এমন ভিড় সত্যিই নজিরবিহীন। বইয়ের বিক্রিও বেশ হয়েছে। তবে এ দিনটি শুধু বই বিক্রির জন্যই নয়। এই যে এত মানুষ মেলায় আসছে, অনেকে আবার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আসছেন—এটা বইয়ের প্রতি ভালোবাসা আর ভাষা আন্দোলনের প্রতি আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ’

মোড়ক উন্মোচন : গতকাল সকালে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে দৈনিক বর্তমানের নির্বাহী সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রতনের লেখা ‘আমার দেখা আমার লেখা’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন দৈনিক বর্তমানের উপদেষ্টা সম্পাদক স্বপন কুমার সাহা, জাতীয় প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহেদ চৌধুরী ও বইটির প্রকাশক বিপ্লব ফারুক। বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় লেখা নানা বিষয়ের নিবন্ধ ও প্রবন্ধ নিয়ে বইটি প্রকাশ করেছে লেখা প্রকাশনী।

বইমেলায় আসা চারটি নির্বাচিত বইয়ের তথ্য-পরিচিতি ছাপা হলো।

দুর্বিনীত কাল : বইটির লেখক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। ষাটের দশক থেকে গল্পের সঙ্গে তাঁর যাত্রা। লিখছেন শুধু গল্পই। তবে কয়েক বছর ধরে লিখছেন নভেলও। তাঁর লেখা স্বতন্ত্র, নিঃসঙ্গ, গীতিময়। কবিতার মতো করে সুরেলা, ইঙ্গিতময় ও রহস্যপূর্ণ। শুরু থেকেই তিনি বেছে নিয়েছেন এই নিঃসঙ্গ ধারা। তাঁর এ বইটিও গল্পগ্রন্থের। সময়, রাজনীতি এবং ব্যক্তিজীবনের সংকটসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে তাঁর জাদুকরী লেখনীতে। তাতে যেমন বিষাদ রয়েছে, তেমনি আছে আশার কথা। বইটি প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস। প্রচ্ছদ রাজীব রাজু। দাম ১৬০ টাকা।

ভ্রমর যেথা হয় বিবাগী : বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক লুৎফর রহমান রিটনের স্মৃতিকথা। তাঁর গদ্যশৈলী যেমন নান্দনিক, তেমনই পাঠকনন্দিত। আকর্ষণীয় ভাষায় তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর জীবনের নানা কথা। মেলে ধরেছেন বিখ্যাত মানুষদের সান্নিধ্যে আসা তাঁর স্মৃতিরাশি। রয়েছে তাঁর সাহিত্যজীবনের কথকতাও। বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ৪০০ টাকা।

সুখী মানুষের জামা : সাংবাদিক ও লেখক প্রভাষ আমিনের নিবন্ধগ্রন্থ। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানামাত্রিক সাহিত্য সৃষ্টিতে জড়িয়ে রেখেছেন নিজেকে। তাঁর রচনা যেমন প্রাঞ্জল, তেমনই বুদ্ধিদীপ্ত। সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গ ধরে তিনি রচনা করেন আকর্ষণীয় সব মুক্তগদ্য। তাতে যেমন প্রজ্ঞা জড়িয়ে, তেমনই রয়েছে রসদীপ্ত নানা কাহন। রাজনীতি, সমাজনীতি, ব্যক্তিমানুষের দ্বন্দ্ব, নগরজীবনের টানাপড়েনসহ নানা বিষয় নিয়ে তাঁর এই বই। প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ৩৫০ টাকা।

গণমাধ্যম : সনাতন ও নতুনের জয় পরাজয় : সাংবাদিক ও লেখক তুষার আবদুল্লাহ সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন সাংবাদিকতার নানা গতিপথ বিশ্লেষণ করেছেন বইটিতে। পাশাপাশি তুলে ধরেছেন মিডিয়া জগতের নানা তথ্য। তাতে যেমন পুরনো মাধ্যমের কথা রয়েছে, তেমনই এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্বও। ঝরঝরে ও আকষর্ণীয় ভাষাভঙ্গিমায় বর্ণনা করেছেন গণমাধ্যমের নানা পথ ও মত। সংবাদকর্মী থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার জন্যই বইটি পাঠ জরুরি। প্রকাশ করেছে আদর্শ। প্রচ্ছদ করেছেন মাসুক হেলাল। দাম ১৫০ টাকা।

নতুন বই : বাংলা একাডেমির সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলার ২১তম দিনে নতুন ২৬১টি বই প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে গল্প ৩৪, উপন্যাস ৩৪, প্রবন্ধ ১৪, কবিতা ৭৯, গবেষণা ৭, ছড়া ৪, শিশুসাহিত্য ১১. জীবনী ৫, মুক্তিযুদ্ধ ৮, নাটক ১, ভ্রমণ ১২, ইতিহাস ৩, রাজনীতি ১, চিকিৎসা/স্বাস্থ্য ২, কম্পিউটার ২, অনুবাদ ১, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ৩ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর আরো ৪০টি বই রয়েছে।

গ্রন্থমেলায় এসেছে তরুণ কথাসাহিত্যিক হারুন পাশা সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘পাতাদের সংসার’। পত্রিকাটি পাওয়া যাচ্ছে মেলার লিটলম্যাগ চত্বরে।

নতুন আসা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে খান চমন-ই-এলাহির ‘মৃত্যুবার্ষিকীর আগে প্রথম শোকসভা’ (দেশ পাবলিকেশনস), দীপক চৌধুরীর ‘দিনবদলে শেখ হাসিনা’ (মম প্রকাশ), তাজ মোহাম্মদের ‘সততার অনন্ত বলয়’ (সুবর্ণ), সহিদ রাহমানের ‘নির্বাচিত কবিতা’ (দেশ পাবলিকেশনস), শোয়াইব জিবরানের ‘ঘোর ও শূন্য জলধিপুরাণ’ (চৈতন্য), শাকুর মজিদের ‘ময়ূরের গ্রাম’ (পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস), শামসুজ্জামান খানের ‘সাম্প্রতিক ফোকলোর ভাবনা’ (অনিন্দ্য প্রকাশ), সৈয়দ শামসুল হকের ‘সায়েন্স ফিকশন সমগ্র’ (অনিন্দ্য প্রকাশ), কামাল চৌধুরীর ‘কন্যাকে নিয়ে লেখা’ (পাঠক সমাবেশ), হাবীবাহ নাসরিনের ‘টুম্পা ও তার বেড়ালছানা’ (বাবুই), জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘দাম্পত্য জীবনের গল্প’ (পুঁথিনিলয়), অধ্যাপক আবু সাঈদের ‘কোর্ট মার্শাল আমি মৃত্যুকে পরোয়া করি না’ (সূচীপত্র)।

মূল মঞ্চের অনুষ্ঠান : মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হয় স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। এতে ১২০ জন নবীন-প্রবীণ কবি আবৃত্তি করেন। সভাপতিত্ব করেন কবি মোহাম্মদ সাদিক। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘ধর্মীয় বহুত্ববাদ : বাঙালি গৌরবময় উত্তরাধিকার’ শীর্ষক বক্তৃতা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইতিহাসবিদ ড. আবদুল মমিন চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল ফকির সিরাজের পরিচালনায় ‘ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী’। এ ছাড়া সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আবদুল জব্বার, ফকির আলমগীর, নমিতা ঘোষ, শিবু রায়, আবদুল হালিম খান ও স্বর্ণময়ী মণ্ডল। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ পাল (তবলা), সাহেদ সরকার বাপ্পী (প্যাড), সুমন রেজা খান (কি-বোর্ড) ও শাহরাজ চৌধুরী (গিটার)।

আজকের আয়োজন : আজ বিকেল ৩টায় মেলা শুরু হয়ে টানা চলবে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি : বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।


মন্তব্য