kalerkantho


৩২ বিলিয়ন রিজার্ভেও ডলার আমদানি

আবুল কাশেম   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



৩২ বিলিয়ন রিজার্ভেও ডলার আমদানি

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার, তবু বাজারে ডলারের সংকট বাড়ছে। রিজার্ভের অর্থ বিদেশের ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা স্থিতি, বন্ড ও এসডিআর আকারে রাখা আছে, নোট আকারে নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও ডলার জমা নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভরসা শুধু বিভিন্ন সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জব্দ করা ক্ষুদ্র স্থিতি। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে মজুদের খুব সামান্য অংশই থাকে নোট আকারে। ফলে বাজারে নগদ ডলারের সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে ডলারের বিনিময়মূল্য ৮০ টাকার কম হলেও ৮৪ টাকার বেশি দরে বিক্রি করছে ব্যাংকগুলো। এ অবস্থায় সরবরাহ বাড়িয়ে দাম সহনীয় পর্যায়ে নামাতে এক কোটি ডলার নোট আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় কমিয়ে ডলারের দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানি শুল্ক মওকুফের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নগদ ডলারের সংকটের কথা জানিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মো. মাসুদ বিশ্বাস স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যথেষ্ট উচ্চ অবস্থায় রয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোর (এডি ব্যাংক) কাছেও পর্যাপ্ত তহবিল আছে। কিন্তু রিজার্ভের অর্থ নোট আকারে সংরক্ষণ করা হয় না। ফলে বিভিন্ন সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জব্দ করা ক্ষুদ্র স্থিতি ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বৈদেশিক মুদ্রা নোটের স্থিতি নেই। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রাসম্পদের বেশির ভাগই প্রতিসঙ্গী ব্যাংকের কাছে স্থিতি আকারে জমা থাকে। এর খুব সামান্য অংশই নোট আকারে রাখা হয়।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদেশফেরত বাংলাদেশি ও অন্যান্য দেশ থেকে আসা বিদেশিদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো ডলার কিনে থাকে। ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসাসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিদেশে গমনেচ্ছুরা কিনে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা ডলারের নোট ও কয়েনের স্থিতি অনেকটাই কমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত গড় নগদের পরিমাণ নেমে আসে ৮৩ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। ২০১৬ সালে এর পরিমাণ ছিল এক কোটি ২৮ লাখ ৩০ হাজার, ২০১৫ সালে দুই কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার, ২০১৪ সালে দুই কোটি ৮৪ লাখ ও ২০১৩ সালে ছিল দুই কোটি ৭০ লাখ ৭০ হাজার ডলার।

টাকার বিপরীতে ডলারের দর বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনুসুর রহমানের কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এডি ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা ডলার নোটের স্থিতি হ্রাস পাওয়ায় মুদ্রাবাজারে বিনিময় হার এবং আমদানি পর্যায়ে বিনিময় হারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তারতম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। একপর্যায়ে টাকা-মার্কিন ডলারের বিনিময় হার আমদানি পর্যায়ে (যা বিসি সিলিং হার নামে পরিচিত) প্রায় ৭৯ দশমিক ৫০ টাকা হলেও নগদ বা ক্যাশ নোট বিক্রয়ে কোনো কোনো ব্যাংক ৮৪ দশমিক ৫০ টাকা নিচ্ছে মর্মে পরিলক্ষিত হয়, যা অস্বাভাবিক। এর ফলে বিদেশ গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। আবার অনেক ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত নোট মজুদ না থাকায় গ্রাহকদের চাহিদা মিটছে না। বাজারে ক্যাশ মার্কিন ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমেই এ বিনিময় হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামানো সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ডলারকে পণ্য হিসেবে ধরে তা আমদানির ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক-কর ও মূসক আরোপ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ফলে প্রতি ডলারের আমদানি ব্যয় দাঁড়াবে ১১২ টাকা। এ কারণে শুল্ক-কর ও মূসক প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এনবিআর এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় ডলার আমদানি সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মো. মাসুদ বিশ্বাস এ প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে বলেছেন, ডলার নোট আমদানির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আমদানিতে উচ্চ শুল্ক থাকায় এখনো নোট আনা সম্ভব হয়নি। শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এনবিআরকে অনুরোধ করা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

এর আগে ২০১১ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এক কোটি মার্কিন ডলার আমদানি করতে চেয়েছিল, যার প্রথম পর্যায়ে ৩০ লাখ নোট আমদানি করে ব্যাংকটি। ওই সময় ব্যাংকটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর শুল্ক মওকুফ করেছিল।

নগদ ডলারের সংকট দেখা দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী অর্থবিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদকে চিঠিতে জানান, সাম্প্রতিককালে স্থানীয় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নগদ ডলারের সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় ফরমাল মার্কেট থেকে বিদেশ ভ্রমণকারীরা চাহিদা অনুযায়ী ডলার না পেয়ে কার্ব মার্কেটের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে কার্ব মার্কেটে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। তবে জোগান কম থাকায় কার্ব মার্কেটে ডলারের বিনিময়মূল্য মুদ্রাবাজারের তুলনায় চার-পাঁচ টাকা বেশি।

তিনি আরো জানান, কার্ব ও ফরমাল মার্কেটে ডলার-টাকার বিনিময় হারের পার্থক্য অনুকূলে না থাকায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসাও কমে গেছে। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে নগদ মার্কিন ডলার আমদানিতে প্রচলিত শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে স্থানীয় বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল থাকবে, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয়ও বাড়বে।


মন্তব্য