kalerkantho


আজ সকাল থেকেই মেলা

নওশাদ জামিল   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আজ সকাল থেকেই মেলা

সাজসজ্জা শুরু হয়েছিল সকাল থেকেই। শাহবাগসংলগ্ন সড়কদ্বীপগুলোতে বর্ণমালার নানা ফেস্টুন।

টিএসসি থেকে শহীদ মিনারের পথে নানা রঙের সুদৃশ্য নকশা। যে বীরসন্তানরা বুকের তাজা রক্তে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন রাজপথ, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাতে আজ ভোরের আলো ফোটার আগেই অগণিত মানুষ যাবে শহীদ মিনারে। এরপর সেই ঢল ঢুকবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আজ মেলাও খুলবে অনেক আগে, সকাল ৮টায়। সবার সব পথ এসে আজ মিলে যাবে শহীদ মিনার হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, গ্রন্থমেলার প্রাণের প্রাঙ্গণে।

ভাষা আন্দোলনের যে মহান চেতনাকে ধারণ করে এই গ্রন্থমেলা, তার আগের দিন তো সেখানে একুশের আবহ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। মেলায় আসা ক্রেতা-দর্শনার্থীর পোশাক থেকে শুরু করে বই কেনার তালিকা, চিবুকে বাহুতে আঁকা নকশা, মেলা মাঠের সাজসজ্জা—সবখানেই গতকাল ছিল একুশের ছাপ। গতকাল সোমবার গ্রন্থমেলা ঘুরে দেখা যায়, অনেক ক্রেতা-দর্শনার্থী মেলায় এসেছে বিভিন্ন বুটিক হাউসের ‘অ আ ক খ’সহ বাংলা বর্ণমালাখচিত পোশাক পরে। কারো কারো কপালে বাঁধা মানচিত্র।

কেউ বা নিজের চিবুককে চিত্রপট করে আঁকিয়ে নিয়েছে জাতীয় পতাকা বা শহীদ মিনারের প্রতিকৃতি। কারো টি-শার্টে ছিল ভাষাশহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরের প্রতিকৃতি।

গতকাল সকাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক তত্পরতা দেখা যায়। বিকেলে তা আরো জোরদার হয়।

উদ্যানের প্রবেশ গেটে দায়িত্বরত এসআই রইচ উদ্দিন বলেন, বইমেলায় ঢাকা মহানগর পুলিশ এমনিতেই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। আর মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে তা একটু বেশিই থাকবে। বইমেলায় ১০টি ওয়াচ টাওয়ার বসানো হয়েছে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের দুটি ক্যাম্পও রয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা তো আছেই।

গতকাল মেলায় এসেছিলেন জনপ্রিয় সাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাঁকে পেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ভক্তরা। শুরু হয়ে যায় অটোগ্রাফ আর সেলফির হিড়িক।

জার্নিম্যান বুকস প্রকাশিত কবি মুহাম্মদ সামাদের ‘সাত দেশের কবিতা’ বইটির পাঠ উন্মোচন হয় গতকাল। এতে চীন, জর্জিয়া, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সার্বিয়া ও সুইডেনের ১০ জন কবির ১০১টি কবিতার অনুবাদ রয়েছে। চীনের চিতি মাচিয়া, জাই ইয়ংমিংয়, জর্জিয়ার লুরাব আর্তভেলিয়াসভিলি, ভিয়েতনামের ন্যুয়েন ফান কোই মাই, যুক্তরাষ্ট্রের সাইমন যে আর্টিজ, জ্যামি প্রক্টর শ্যু, যুক্তরাজ্যের নিয়া ডেভিস, সার্বিয়ার দ্রগান দ্রাগোইলভিচ, ক্রিস্টিয়ান কার্লসন ও সুইডেনের লারস হেগারের কবিতা আছে বইটিতে।

অনলাইনে হুমায়ূন আহমেদের বই : গতকাল উদ্বোধন করা হয়েছে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘লীলাবতী’ বইয়ের ই-ভার্সন। উদ্বোধন করেন এই বরেণ্য লেখকের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন। সঙ্গে ছিল দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত।

শাওন বলেন, ‘বর্তমান সময়ে ই-বই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অনেকেই অনৈতিকভাবে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের পিডিএফ কপি প্রকাশ করেছে। ফলে লেখক ও তাঁর পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখন যদি বৈধভাবে পিডিএফ কপি ছাড়া হয় তবে পাঠক অবশ্যই বৈধটিকেই গ্রহণ করবে। এর ফলে বৈধ স্বত্বাধিকারীরাই লাভবান হবে। ’

বইমেলায় আসা নির্বাচিত চারটি বইয়ের তথ্য-পরিচিতি :

কাছিম ও দুটি হাঁসের কথা : বইটির লেখক বিশিষ্ট কবি আসাদ চৌধুরী। তিনি মনোগ্রাহী টেলিভিশন উপস্থাপনা ও চমত্কার আবৃত্তির জন্যও জনপ্রিয়। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর পদচারণ। কবিতা ছাড়াও তিনি বেশ কিছু শিশুতোষ গ্রন্থ রচনা করেছেন। কিছু অনুবাদও আছে তাঁর। এ বইটি শিশু-কিশোরদের জন্য। অত্যন্ত আকর্ষণীয় ভাষায় কবি তুলে ধরেছেন অন্যতর এক আখ্যান। বইটি প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন আইয়ুব আল আমিন। দাম ৯০ টাকা।

একজন কমলালেবু : বইটি এবারের বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক শাহাদুজ্জামানের। নিজস্ব চেতনার আলোয় তিনি লিখেছেন অভূতপূর্ব কিছু ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস। দেশ, কাল, সমাজ, ভাষা এবং মানুষের বহুমাত্রিক জীবন তাঁর লেখার উপজীব্য। এবারের বইটি কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে। প্রকাশ করেছে প্রথমা। প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। দাম ৪৫০ টাকা।

অগ্নিকন্যা : সাড়া জাগানো এ উপন্যাসের রচয়িতা বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মোস্তফা কামাল। ইতিহাসভিত্তিক দীর্ঘ উপন্যাস এটি। সময়কাল ১৯৪৭ থেকে ৬৬। দেশভাগের জটিল অঙ্ক, কুটিল রাজনীতির প্যাঁচ, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আর শোষিত পূর্ব বাংলার বঞ্চিত হওয়ার নেপথ্য কাহিনি এ উপন্যাসের পটভূমি। লেখক আকর্ষণীয় ভাষায় তুলে ধরেছেন ইতিহাসের আলোয় অন্যতর এক আখ্যান। বইটি প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশনস। প্রচ্ছদ ধ্রুব এষ। মূল্য ৫০০ টাকা। এ ছাড়া অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে লেখকের প্রেমের উপন্যাস ‘রূপবতী’। অনন্যা প্রকাশ করেছে কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস ‘প্রিন্স উইলিয়ামের আংটির খোঁজে’ ও রম্য রচনার বই ‘কিছু হাসি কিছু রম্য’।

আমার গল্প : আত্মকথামূলক এই আখ্যানের রচয়িতা কবি ফরিদ কবির। আশির দশকের বিশিষ্ট কবি তিনি। কবিতা ছাড়াও গদ্যচর্চায়ও সমান শক্তিশালী। বইটিতে তিনি প্রাণোচ্ছ্বল ভাষায় তুলে ধরেছেন তাঁর জীবনসংগ্রামের কথামালা। শুধু নিজের কথা নয়, এতে উঠে এসেছে দেশের সাহিত্য ও সাংবাদিকতার নানা অলিগলির অজানা কাহিনি। বইটি প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন এস এম সাইফুল ইসলাম। দাম ৮০০ টাকা।

নতুন বই : গতকাল মেলার ২০তম দিনে নতুন ৯৪টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ১৫, উপন্যাস ১৭, প্রবন্ধ ১, কবিতা ৩০, ছড়া ২, শিশুসাহিত্য ২, জীবনী ৫, মুক্তিযুদ্ধ ২, নাটক ১, বিজ্ঞান ১, ভ্রমণ ১, সায়েন্স ফিকশন ১ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর এসেছে আরো ১৬টি বই। অন্যপ্রকাশ এনেছে পূরবী বসুর ‘শামসুদ্দিন আবুল কালামের অপ্রকাশিত চিঠি ও স্মৃতি’। অনুপম এনেছে সুব্রত বড়ুয়ার ‘গুণীজন’। পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস এনেছে ইমদাদুল হক মিলনের শিশুতোষ রচনা ‘বানরের রাজ্যে অজগর’। উত্তরণ এনেছে সুধীর কৈবর্তের গল্পগ্রন্থ ‘সৌপ্তিক’।

মূল মঞ্চের আয়োজন : বিকেলে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘উন্নতমানের শিক্ষা : সামাজিক অগ্রগতির চাবিকাঠি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. হারুন-অর-রশিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল লোপা খানের পরিচালনায় ‘আবৃত্তিশীলন’-এর বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশনা। এ ছাড়া আবৃত্তি করেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়েরা হাবীব, ঝর্ণা সরকার ও তামান্না নীপা।

আজকের অনুষ্ঠান : আজ বিকেলে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘ধর্মীয় বহুত্ববাদ : বাঙালির গৌরবময় উত্তরাধিকার’ শীর্ষক বক্তৃতানুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ড. আবদুল মমিন চৌধুরী। স্বাগত ভাষণ দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করবেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।


মন্তব্য