kalerkantho


রংপুর বিভাগের ছয় কারাগার

‘বিনা বিচারে’ ৯ বছর বন্দি ৩৬ আসামি

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘বিনা বিচারে’ ৯ বছর বন্দি ৩৬ আসামি

রংপুর বিভাগের ছয় জেলা কারাগারে ৩৬ জন আসামি ‘বিনা বিচারে’ আটক রয়েছে। এসব আসামি পাঁচ বছর থেকে শুরু করে ৯ বছর পর্যন্ত বন্দি জীবন কাটাচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে অসংখ্যবার তাদের আদালতে আনা-নেওয়া করা হলেও এখনো কারো মামলার বিচার শুরু হয়নি। বারবার মামলার তারিখ পিছিয়ে যাচ্ছে আর ‘বিনা বিচারে’ কারাগারে ধুঁকছে আসামিরা। পরিবারের সদস্যরা বিচারের আশায় আদালত আর কারাগারে ধরনা দিতে দিতে এখন অতিষ্ঠ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ‘বিনা বিচারে’ রংপুর কারাগারে চারজন, গাইবান্ধায় দুইজন, কুড়িগ্রামে চারজন, নীলফামারীতে ১২ জন, দিনাজপুরে ৯ জন ও ঠাকুরগাঁও কারাগারে পাঁচজন বন্দি রয়েছে। এ অবস্থায় মানবাধিকারকর্মীরা প্রধান বিচারপতির সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

রংপুর ডিআইজি প্রিজন কার্যালয় সূত্রে আরো জানা যায়, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেপারীপাড়া গ্রামের ওমর আলীর ছেলে আবদুর রহিম ২০০৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আটক আছেন। প্রায় ১০ বছরে ১১৬ বার তাঁকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। কিন্তু আজও তাঁর বিচার শুরু হয়নি। একই অবস্থা রংপুর নগরীর খামারপাড়া এলাকার মমতাজ আলীর ছেলে নাজমুল হোসেনের।

তিনি ২০০৮ সালের ৬ ডিসেম্বর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে প্রায় আট বছর ধরে কারাগারে আটক আছেন। এই দীর্ঘ সময়ে ৮৮ বার তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মামলার বিচার শুরু হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা রয়েছে। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার ভুষিরবন্দর গ্রামের জহর আলীর ছেলে খায়রুল ইসলাম ২০০৭ সালের ১২ অক্টোবর থেকে কারাগারে আটক আছেন। ১০ বছরে তাঁকে ৪১ বার আদালতে হাজির করা হয়েছে। তাঁর মামলার বিচার এখন পর্যন্ত শুরু হয়নি। আবদুর রহিম, নাজমুল হোসেন আর খায়রুল ইসলামের মতো রংপুর বিভাগের ছয় জেলার কারাগারে এভাবেই ৩৬ জন বন্দি দীর্ঘদিন ধরে বিনা বিচারে আটক আছেন।

রংপুর কারাগারে আটক নগরীর খামারপাড়া এলাকার নাজমুল হোসেনের চাচা সিরাজুল ইসলাম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘পুলিশের হাতে আটক হয়ে প্রায় আট বছর ধরে বন্দি আছে সে। অভাবী সংসারে তাকে বাঁচাতে দৌড়ঝাঁপ করতে এতদিনে নিঃস্ব হয়েছি। এখনো বিচারই শুরু হয়নি। ’ সিরাজুল ইসলাম আরো বলেন, ‘তার অপরাধের শাস্তি হলেও হবে। কিন্তু এরপর বিচার শুরু হলে শেষ হতে লাগবে আর কত বছর! নাজমুলসহ এমন বিনা বিচারে আটকদের দ্রুত বিচার শুরুর দাবি জানাই। ’

রংপুরের সিনিয়র আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের রংপুর বিভাগীয় আহ্বায়ক এম এ বাশার বলেন, ‘আমাদের দেশে বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এখানে মানবতার কোনো স্থান নেই। তা না হলে বিনা বিচারে কিভাবে ৩৬ বন্দি বছরের পর বছর ধরে কারাগারে আটক থাকে। ’

এম এ বাশার আরো বলেন, “আইনের পরিভাষায় ‘বিলম্বিত বিচার’ বিচার না পাওয়ারই শামিল। এভাবে কাউকে আটক রাখা আইনের পরিপন্থী। যারা দীর্ঘদিন ধরে বিনা বিচারে কারাগারে আটক আছে তারা যদি অপরাধ করে থাকে তাহলে তাদের বিচার করে শাস্তি দেওয়া হোক। তাই বলে তাদের বিনা বিচারে আটক রাখা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। ”

মানবাধিকার ও পরিবেশ আন্দোলন বাপার প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট মুনীর চৌধুরী বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি ইতিমধ্যে বিনা বিচারে আটক বন্দিদের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ’ তিনি প্রধান বিচারপতির সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করে এই ৩৬ বন্দির দ্রুত বিচার শুরুর দাবি জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারাগারের এক কর্মকর্তা জানান, রংপুর বিভাগের চার জেলা কারাগারে তিন নারীসহ ৬২ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আটক রয়েছে। তাদের মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। এদের মধ্যে রংপুর কারাগারে তিন নারীসহ ৪৫ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, গাইবান্ধা কারাগারে তিনজন, নীলফামারী কারাগারে একজন এবং দিনাজপুর কারাগারে ১৩ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে রংপুর বিভাগীয় ডিআইজি প্রিজন অসীম কান্ত পালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসেই আটক বন্দিদের সার্বিক তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠাই। ৩৬ বন্দির ব্যাপারেও সর্বশেষ অবস্থা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। ’


মন্তব্য