kalerkantho

আগমনী সুর একুশের

নওশাদ জামিল

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আগমনী সুর একুশের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড় থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে। অন্যটি গেছে বাংলা একাডেমির দিকে।

শাহবাগ মোড় থেকে টিএসসি ছাড়িয়ে গোটা এলাকা সেজেছে নানা আলপনায়। রংতুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ভাষাশহীদদের কথা, শহীদদের চেতনার কথা। তরুণ আঁকিয়েরা আত্মনিবেদিত হয়ে ভরিয়ে তুলছেন ঐতিহ্যবাহী নকশা আর বর্ণমালার নানা আলপনা। নবীন বসন্তের হাওয়ায় ভাসছে সেই রঙের গন্ধ; অমর একুশের আগমনী সুর। গতকাল রবিবার অমর একুশে গ্রন্থমেলায়ও ছিল আসন্ন একুশের আবহ।

প্রকাশকদের প্রত্যাশা—আগামীকাল মঙ্গলবার অমর একুশের দিনটিতে বরাবরের মতোই পূর্ণতা পাবে গ্রন্থমেলা। গ্রন্থপ্রেমীদের আগমনে ফুটে উঠবে মেলার প্রকৃত স্বরূপ আর একুশে চেতনার প্রতিচ্ছবি। জমজমাট হয়ে উঠবে প্রাণের গ্রন্থমেলা।

গতকাল রবিবার মেলা ঘুরে দেখা যায়, এবার গ্রন্থমেলায় একুশ তথা ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রকাশনা একেবারেই অপ্রতুল।

গতকাল মেলার ১৯তম দিন পর্যন্ত দুই হাজার ৩৯০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক বইয়ের মধ্যে একুশ ও ভাষা নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা মাত্র সাত-আটটি। যেই একুশের সৃষ্টি না হলে গ্রন্থমেলার সৃষ্টি হতো না, সেই আয়োজনে একুশ আর বাংলা অবহেলিত।

এবারের মেলায় একুশ ও ভাষা নিয়ে প্রকাশনা সংস্থা আগামী প্রকাশ করেছে রফিকুল ইসলাম রচিত ‘একুশের শহীদেরা বাংলা ভাষার শহীদেরা’ ও ‘অমর একুশে ও শহীদ মিনার’। অবসর প্রকাশ করেছে সৌরভ সিকদারের ‘বাংলা ভাষা বাংলাদেশের ভাষা’। নালন্দা প্রকাশ করেছে এম আর মাহবুবের ‘একুশের স্মারক’। অনিন্দ্য প্রকাশ করেছে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও অনুষঙ্গ ১ম, ২য় ও ৩য় খণ্ড’ ইত্যাদি।

প্রকাশকরা জানান, ভাষা আন্দোলন ও একুশ নিয়ে ভালো পাণ্ডুলিপির বড় অভাব। ভাষা নিয়ে, অমর একুশ নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজের অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে তেমন কাজ নেই। এসব কারণেই গ্রন্থমেলায় একুশের প্রকাশনা যৎসামান্য।

প্রকাশিত হলো গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব-৩’ : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ অবলম্বনে গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব-৩’ এসেছে গ্রন্থমেলায়। বইটি প্রকাশ করেছে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। বইটির প্রকাশক বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক।

সিআরআইয়ের স্টলে গতকাল বইটির প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক, নভেলটির গ্রাফিক শিল্পী রাশাদ ইমাম তন্ময় প্রমুখ।

নসরুল হামিদ বিপু বলেন, ‘বইটির প্রুফ রিডিং থেকে শুরু করে সম্পাদনা করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অসংগতির জায়গাগুলোতে তিনি পরিবর্তন করতে বলেছেন। চিত্রণের যে জায়গাগুলোতে সমস্যা ছিল সেগুলো চিহ্নিত করেছেন। যেমন বঙ্গবন্ধু তরুণ বয়সে কেমন ছিলেন, সেই চিত্রণটি পরিবর্তন করতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, গোঁফটি প্রথমে ঠিকমতো হয়নি। পরে পরিবর্তন করতে হয়েছে। ১৯৪৫ সালে বা ১৯৪৭ সালে বঙ্গবন্ধু কেমন ছিলেন, সেটি অনুধাবন করে চিত্রণ দেওয়া অতটা সহজ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নিজে বিষয়টি দেখেছেন। ’ তিনি আরো বলেন, “বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীকে শিশুদের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা থেকেই এই গ্রাফিক নভেল প্রকাশ হচ্ছে। এর আগে এ সিরিজের দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এবার ‘মুজিব-৩’ প্রকাশিত হলো। পরবর্তী সময়ে এই সিরিজের আরো ৯টি খণ্ড প্রকাশিত হবে। ”

শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিদেশে বাংলা মিডিয়ামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বইটি শিক্ষার্থীদের প্রদান করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ’

এক বার্তায় প্রকাশকের বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক বলেন, ‘নেলসন ম্যান্ডেলা, উইনস্টন চার্চিল, জওয়াহেরলাল নেহরু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধীসহ বিশ্বের বড় বড় নেতাদের জীবনী নিয়ে কমিক পড়তাম। এসব পড়ে পড়ে ভাবতাম একদিন না একদিন আমি নানাকে নিয়ে কমিক তৈরি করব। নতুন প্রজন্ম কমিক পড়ে জাতির জনকের সম্পর্কে সব কিছু জানতে পারবে। ’ তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হাতে লেখা নোটবুক পাওয়ার পর মা-খালার জন্য অসমাপ্ত আত্মজীবনী বের করা সত্যিই কঠিন ছিল। আমাদের জন্য বিষয়টি অন্য রকম ছিল। তাঁর লেখা হাতে পাওয়ার পর অনুভূতি বোঝাতে পারব না। তখন মনে হলো সত্যিই নানার সঙ্গে কথা বলছি। বই দুটি প্রকাশিত হওয়ার পর আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল—বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কমিক নোবেল বের করলে তরুণ প্রজন্ম অনেক কিছু জানতে পারবে। সে ভাবনা থেকেই এই গ্রাফিক নভেল করা। ’ বইটির মূল্য ১৫০ টাকা।

বইমেলায় প্রকাশিত নির্বাচিত চারটি বইয়ের তথ্য-পরিচিতি ছাপা হলো।

বেদনার বংশধর : বিশিষ্ট কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার কাব্যগ্রন্থ। জাতিসত্তার কবি বিশেষণে খ্যাত তিনি। আদতে তিনি বহুমাত্রিক লেখক। কেবল কবিতা নয়, তাঁর রয়েছে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত উপন্যাস। তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রবন্ধ লেখক। সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও বরণীয়। দীর্ঘ কাব্যযাত্রায় তিনি উপহার দিয়েছেন নানা কালজয়ী কবিতা। তাঁর এ বইয়ে পত্রস্থ হয়েছে ভিন্ন স্বাদের নানা কবিতা। বইটি তিনটি ভাগে বিভক্ত—হৃৎ দুনিয়া, মৃৎ দুনিয়া ও যুগল দুনিয়া। বইটি প্রকাশ করেছে পরিবার পাবলিকেশন্স। প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রব এষ। দাম ২০০ টাকা।

বটফলের গল্প : বরেণ্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের কিশোর উপন্যাস। বইটির ছাপা ঝকঝকে, ভেতরে আছে রঙিন ছবি। প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। সেলিনা হোসেন তাঁর প্রাঞ্জল ভাষায় বইটিতে তুলে ধরেছেন এক মানবিক আখ্যান—সিডরে মা-বাবাকে হারায় ছোট্ট মালা। কষ্ট তার নিত্যসঙ্গী। এ সময় তার মনের কষ্ট দূর করতে এগিয়ে আসে চাচাতো বোন সেতু। তারা দুজন ঘুরে বেড়ায় বনেবাদাড়ে। বটগাছের নিচে তাদের সঙ্গে গল্প করে নাপিত কাকু। এরপর ঘটতে থাকে নানা মজাদার ঘটনা। বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন গৌতম ঘোষ। দাম ১৫০ টাকা।

প্রকাশকনামা ও হুমায়ূন আহমেদ : হুমায়ূন আহমেদ চলে গেলেও তাঁকে নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই। মৃত্যুর পর নানাজন তাঁকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করছেন। সেসব নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ প্রবল। সময় প্রকাশনীর কর্ণধার ফরিদ আহমেদ বেশ কাছে থেকে দেখেছেন হুমায়ূন আহমেদকে, যার অনেক কথাই পাঠক জানে না। সেই অকথিত গল্প লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি তাঁর ‘প্রকাশকনামা ও হুমায়ূন আহমেদ’ গ্রন্থে। শুধু হুমায়ূন আহমেদ নন, লেখক তাঁর প্রকাশক জীবনের নানা স্মতিচারণা করেছেন। বলেছেন দেশের প্রকাশনাশিল্প নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার গল্প। বইটি প্রকাশ করেছে সময়। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ৪৬০ টাকা।

চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফাত বলছি : জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফাতের আত্মকথা। বইটিতে লেখক তাঁর ক্রীড়াজীবনের নানা খুঁটিনাটি স্মৃতি বর্ণনা করেছেন। তাতে শুধু তাঁর কথা নয়, দেশের ক্রীড়াজগৎ সম্পর্কে আছে নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা। বইটি প্রকাশ করেছে শিখা প্রকাশনী। প্রচ্ছদ মশিউর রহমান। দাম ২৫০ টাকা।

নতুন বই : বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র থেকে জানা যায়, গতকাল মেলার ১৯তম দিনে ১১৫টি নতুন বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ১২, উপন্যাস ১৮, প্রবন্ধ ২, কবিতা ৪৩, গবেষণা ৪, ছড়া ৯, শিশুসাহিত্য ২, জীবনী ৪, রচনাবলি ১, মুক্তিযুদ্ধ ২, ভ্রমণ ২, ইতিহাস ২, চিকিৎসা/স্বাস্থ্য ২, অনুবাদ ৩ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর আরো ৯টি বই রয়েছে।

কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামালের চারটি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ইতিহাসভিত্তিক সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘অগ্নিকন্যা’ প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে প্রেমের উপন্যাস ‘রূপবতী’। অনন্যা প্রকাশ করেছে কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস ‘প্রিন্স উইলিয়ামের আংটির খোঁজে’ ও রম্য রচনার বই ‘কিছু হাসি কিছু রম্য’।

মেলায় এসেছে বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক মাহবুব রেজার চারটি বই। তাঁর কিশোর উপন্যাস ‘পুরান ঢাকার কাজল ১৯৭১’ এনেছে নালন্দা। অনন্যা প্রকাশ করেছে রোমান্টিক উপন্যাস ‘পাষাণসুন্দরী’। বটেশ্বর বর্ণন এনেছে কিশোর গল্পগ্রন্থ ‘সব গল্পই বাবার’। চন্দ্রাবতী একাডেমি এনেছে মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প ‘রঞ্জুদের বাড়ি’।

অন্বেষা এনেছে তরুণ কথাসাহিত্যিক আব্দুল্লাহ আল ইমরানের উপন্যাস ‘দিবানিশ’। শোভা প্রকাশ এনেছে ‘রবীন্দ্র-ভাষাচিন্তার অভিধান’। বইটি সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন তরুণ গবেষক ও লেখক মাইনুল ইসলাম। অনন্যা এনেছে তরুণ কবি হোসনে আরা জাহানের কবিতার বই ‘নিশিন্দা পাতার ঘ্রাণ’। মুহাম্মদ মিজানুর রহমানের গল্পগ্রন্থ ‘স্বপ্নবোনা মন’ মেলায় এনেছে সূচিপত্র প্রকাশনী। ইতি প্রকাশনী এনেছে মাইদুর রহমান রুবেলের শিশুতোষ বাই ‘ভূতের রাজ্য’।

মূল মঞ্চের আয়োজন : গতকাল মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আবুল মোমেন। আলোচনায় অংশ নেন রফিকুল হক, আলী ইমাম ও সুজন বড়ুয়া। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল আমানুল হকের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ ব্যালে ট্রুপের পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী লাকী সরকার, বদিয়ার রহমান, অনিমা মুক্তি গোমেজ, শরণ বড়ুয়া, শাপলা পাল ও মুরাদ হোসেন।

আজকের অনুষ্ঠান : আজ সোমবার গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘উন্নতমানের শিক্ষা সামাজিক অগ্রগতির চাবিকাঠি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মনজুর আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেবেন আবদুল মান্নান, হারুন-অর-রশিদ ও রাশেদা কে চৌধুরী। সভাপতিত্ব করবেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।


মন্তব্য