kalerkantho


নিম্নমানের বিটুমিন আসছে বিদেশ থেকে উৎপাদন হয় দেশেও

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নিম্নমানের বিটুমিন আসছে বিদেশ থেকে উৎপাদন হয় দেশেও

টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। মহাসড়কগুলোর বিভিন্ন স্থানে ভাঙাচোরা ও এবড়োখেবড়ো অবস্থাই এর সাক্ষ্য দেয়।

আর এর অন্যতম কারণ ৮০/১০০ গ্রেডের বিটুমিন আমদানি ও উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অভিযোগ রয়েছে, সড়ক-মহাসড়ক প্রকল্পে তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই নির্মাণ ও মেরামতের অল্প দিনেই সড়ক ও মহাসড়কগুলো বেহাল হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা জানান, দেশে প্রতিবছর বিটুমিনের মোট চাহিদা প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টন। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে (ইআরএল) উৎপাদন হয় ৭০ হাজার টন। চাহিদার বাকি বিটুমিন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি করা হয়। আর এই সুযোগে দেদার নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি হচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের মহাসড়কের উন্নয়নকাজ চলাকালে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ আন্তর্জাতিক মান অর্জনের লক্ষ্যে ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন কিছু ঠিকাদার বিদেশ থেকে আমদানি করা নিম্নমানের ৮০/১০০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহারের চেষ্টা চালান।

অপেক্ষাকৃত পাতলা ৮০/১০০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার করলে গ্রীষ্মকালে তা দ্রুত গলে যায় এবং সড়কের উপরিভাগে এবড়োখেবড়ো অবস্থার সৃষ্টি হয়। এরপর বর্ষাকালে বৃষ্টিতে সড়কের পিচ উঠে গিয়ে দ্রুত গর্তের সৃষ্টি হয়।

সওজ সূত্র জানায়, সড়ক-মহাসড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সওজ তাদের অধীনে নির্মাণ করা সব সড়কেই ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহারের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে। ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই জারি করা ওই প্রজ্ঞাপন (স্মারক নং-৩৫.০০.০০০০.০৩২.০৬.০৩৯.১৫-৪১১) পরে সরকারের অন্য বিভাগগুলোতেও মানার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। কারণ স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশনসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে সওজের মানকেই সর্বোচ্চ হিসেবে ধরে নিয়ে কাজ করে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল মো. মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলো পিচঢালা করার কাজ শুরু করেছি। এ কাজে ঠিকাদারদের ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহারের জন্য স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। ’

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাস্তা নির্মাণের নকশা, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ঠিক থাকলে বাংলাদেশে যেকোনো রাস্তা ১৫ বছরে নষ্ট হবে না। অথচ বর্ষা শুরু হতে না হতেই রাস্তাঘাট বেহাল হয়ে যায়। ’ তিনি বলেন, ‘বিদেশেও তো বৃষ্টি হয়। সেখানে তো রাস্তার তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। এখানে যে বিটুমিন ব্যবহার করা হয় সেগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মাঠপর্যায়ে যে ধরনের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ দরকার তা নেই। এটা তদারকি করলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ’

৮০/১০০ গ্রেডের বিটুমিন উৎপাদন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারির সদ্যবিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমদাদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, রিফাইনারিতে উৎপাদিত বিটুমিনের বেশির ভাগ ৮০/১০০ গ্রেডের। ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিন চাহিদার ভিত্তিতে সরবরাহ করা হয় বলে তিনি জানান। তবে তিনি স্বীকার করেন, ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিনের মান ভালো ও ঘন। আর ৮০/১০০ গ্রেডের বিটুমিন তুলনামূলক পাতলা।

কালের কণ্ঠ’র প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আমদানিকারক বলেন, ‘আমি নিজে সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। তাই নিজের ঠিকাদারি কাজে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সময় বিদেশ থেকে বিটুমিন আমদানি করতে হয়। বিদেশি বিটুমিনের দাম কম হওয়ায় ঠিকাদারদের মধ্যে আমদানি করা বিটুমিনের প্রতি আগ্রহ বেশি। ’


মন্তব্য