kalerkantho


সাইবার অপরাধ বাড়ছে পার পাচ্ছে অপরাধীরা

ওমর ফারুক   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সাইবার অপরাধ বাড়ছে পার পাচ্ছে অপরাধীরা

পুরান ঢাকার এক কলেজ ছাত্রীকে রামপুরায় একটি হোটেলে নিয়ে জোর করে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় অশালীন অবস্থার ছবি তোলে তার এক বন্ধু। পরে সেই ছবি ছেড়ে দেয় ইউটিউবে। ঘটনা জানাজানি হলে কয়েক মাস আগে ওই ছেলের বিরুদ্ধে রামপুরা থানায় তথ্য-প্রযুক্তি আইনে মামলা করে ছাত্রীর পরিবার। পরে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে এর বিচার হয়। কিন্তু পুলিশের দুর্বল অভিযোগপত্রের কারণে এবং জোরালো তথ্য-প্রমাণের অভাবে ছেলেটি রেহাই পেয়ে যায় মামলা থেকে।

দেশে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। বাড়ছে এ-সংক্রান্ত মামলাও। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাইবার অপরাধের বিষয়ে থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে প্রতি মাসে হাজারখানেক অভিযোগ জমা পড়ছে। অভিযোগের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। বেশির ভাগ অভিযোগেরই শিকার নারীরা। এসব অপরাধের বিচার হয় ঢাকায় একটিমাত্র ট্রাইব্যুনালে।

একমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ৩৫০টি মামলা বিচারাধীন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অভিযোগ বেশি হওয়ায় তদন্ত করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলো। এ ছাড়া সক্ষমতার অভাবে প্রযুক্তিনির্ভর এসব অপরাধের পর্যাপ্ত প্রমাণও অনেক ক্ষেত্রেই হাজির করতে পারছেন না তদন্তকারীরা। ফলে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। সাইবার ট্রাইব্যুনালে ৬০ শতাংশের বেশি মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় আসামিরা খালাস পেয়েছে।

এ অবস্থায় সাইবার অপরাধ রোধ করতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) জন্য স্থাপন হয়েছে শতকোটি টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দুটি সাইবার ল্যাব। এ ছাড়া সাইবার পুলিশ ব্যুরো (সিপিবি) নামের একটি ইউনিটও গঠন করা হয়েছে।

প্রতি মাসে হাজার অভিযোগ : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী একাধিক সংস্থা সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে সাইবার অপরাধের অভিযোগ জমা পড়েছিল আট হাজারের মতো। গত বছর সেই সংখ্যা ১০ হাজারে উন্নীত হয়। গত তিন মাসে প্রায় তিন হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। এত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোকে। দেশের একমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ৩৫০ মামলা বিচারাধীন। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনটি মামলার বিচারকাজের মধ্য দিয়ে এই ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ২০১৪ সালে এই ট্রাইব্যুনালে ৩২টি মামলার বিচারকাজ চলে। পরের বছর বিচারের জন্য আসে ১৫২টি মামলা। আগের বছরগুলোর চেয়ে ২০১৬ সালে দুই শতাধিক মামলা বিচারের জন্য আসে। আবার অনেক ঘটনায় মামলাও হয় না।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের প্রধান কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে অভিযোগগুলো আসে। পরে সেসব অভিযোগ নিয়ে কাজ করা হয়। এ পর্যন্ত অনেককে এ অপরাধের জন্য গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাইবার ট্রাইব্যুনালে যে ৩৫০টি মামলার বিচার চলছে সেগুলোর ৬০ শতাংশই ফেসবুকে নারীদের নিয়ে আপত্তিকর ছবি এবং অশ্লীল ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার অপরাধসংক্রান্ত। দেশের ভিভিআইপি ব্যক্তিদের নিয়ে কটূক্তি, ধর্ম অবমাননার মামলারও আছে।

অভিযোগের চেয়ে ঘটনা বেশি : সূত্র মতে, প্রতিদিন যত সংখ্যক সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটছে তার চেয়ে অভিযোগ জমা পড়ছে অনেক কম। অনেকেই মানসম্মানের ভয়ে অভিযোগ করতে যায় না।

রাজধানীর উত্তরা এলাকার এক কলেজ ছাত্রী কালের কণ্ঠকে জানান, কিছুদিন আগে তাঁর ছবির মাথা কেটে অন্য এক মেয়ের নগ্ন দেহের সঙ্গে লাগিয়ে ছবি তৈরি করে সেই ছবি আপলোড করা হয় তাঁর এক বন্ধুর ফেসবুক আইডিতে। লজ্জায় বিষয়টি কাউকে জানাতেও পারেননি ওই ছাত্রী। নিজের ও পরিবারের কথা চিন্তা করে পুলিশের কাছেও যাননি তিনি। পরে ওই বন্ধুকে অনুরোধ করে সেটি তার আইডি থেকে ডিলেট করিয়ে স্বস্তি পান।

অভিযোগ করেও বিচার পায় না অনেকে : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাইবার ট্রাইব্যুনালে ৬০ শতাংশের বেশি মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় আসামিরা খালাস পেয়েছে। এতে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে ভুক্তভোগীরা। অভিযোগ করেও বিচার না পেয়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয় কেউ কেউ।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জামাল উদ্দিন খন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, সাইবার অপরাধ প্রমাণ করার মতো প্রযুক্তি পুলিশের কাছে না থাকায় অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়। ফলে আসামিরা মুক্তি পাওয়ার সুযোগ পায়। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া এসব অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

তবে এ বিষয়ে সাইবার ট্রাইব্যুনালের পিপি নজরুল ইসলাম শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে ৬৫ শতাংশ মামলায় সাজা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো আইনেই শতভাগ সাজা হওয়ার নজির নেই। তবে এই আইনের বিষয়ে দিন দিন দক্ষতা বাড়ছে সবার। ফলে সামনের দিনগুলোতে মামলায় সাজা পাওয়ার হার আরো বাড়বে। আরেক প্রশ্নের জবাবে এই সরকারি কৌঁসুলি বলেন ‘বেশির ভাগ মামলাই আসে নারীঘটিত বিষয়ে। অপরাধীরা নারীদের ছবি বিকৃত করে, ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে অশ্লীল ছবি আপলোড করে—এ ধরনের অভিযোগ থাকে। ’ তিনি জানান, সাইবার ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ৩৫০টির মতো মামলা বিচারাধীন।

প্রতিরোধে নতুন ল্যাব ও ইউনিট : সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এরই মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে দুটি অত্যাধুনিক ল্যাব। এতে অর্থ সহায়তা দিয়েছে কোরিয়া অন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (কোইকা)। রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় মিল ব্যারাকে এবং মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে স্থাপিত ল্যাব দুটি পুলিশ সপ্তাহে উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া সাইবার পুলিশ ব্যুরো (সিপিবি) নামের একটি ইউনিটও গঠন করা হয়েছে।

ইন্টারনেট ব্যবহার করে প্রতারণা, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎসহ প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে সাইবার ল্যাব কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন পুলিশ ও সিআইডি কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশের কাছে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ আসে। এ কারণে সিআইডিতে সাইবার ল্যাব বসানো হয়েছে। এখন থেকে সাইবার অপরাধীদের ধরতে সুবিধা হবে।

পুলিশ ও সিআইডি সূত্রে জানা যায়, টুইটার, ইউটিউব, ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো অপব্যবহারের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে সাইবার-সন্ত্রাস। বিশেষ করে ফেসবুকে নারীদের নামে জাল আইডি খুলে প্রতারণা চলছে। এতে অনেকেই আত্মহননের পথে পা বাড়াচ্ছে। কারো কারো জীবনে দাম্পত্য কলহের কারণ প্রযুক্তি-সন্ত্রাস। হ্যাকিং, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, ই-মেইলের মাধ্যমে প্রতারণা, ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনাও ঘটছে অহরহ। এ ছাড়া দেশি ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের অন্যতম হাতিয়ার ইন্টারনেট। সিআইডির নতুন ইউনিট এসব অপরাধ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে পুলিশ মনে করে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মির্জা আবদুল্লাহেল বাকী এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, সাইবার পুলিশ ব্যুরো এরই মধ্যে মাঠে নেমেছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যে দুটো ল্যাব বসানো হয়েছে সেগুলোতে প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো ধরনের সাইবার অপরাধীর অপরাধ ধরা যাবে। কারো পার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। ’


মন্তব্য