kalerkantho


একাত্তরে পরাজয়ের আগের দিনগুলোতে ইয়াহিয়া খান

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



একাত্তরে পরাজয়ের আগের দিনগুলোতে ইয়াহিয়া খান

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাঁর এডিসি স্কোয়াড্রন লিডার আর্শাদ সামি খাঁকে ডেকে বলেছিলেন যে বিকেল ঠিক ৪টায় জেনারেল হামিদ (চিফ অব আর্মি স্টাফ বা সেনাপ্রধান) ইসলামাবাদে রাষ্ট্রপতি ভবনে আসবেন। তাঁরা এমন একটা জায়গায় যাবেন, যেটার কথা নিজের এডিসিকেও বলতে পারবেন না আগে থেকে।

৪টার সময় জেনারেল হামিদ নিজের মিলিটারি জিপ চালিয়ে এসেছিলেন। জিপে তাঁর পাশেই চড়ে বসেছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া। আর দুজন এডিসি পেছনের আসনে। বিপত্তি বাধল শুরুতেই। কোথা থেকে একটা বড় শকুন এসে জিপের সামনে বসে পড়ল। হর্ন দেওয়া হলো, কিন্তু তাতেও শকুনটার নড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। ইয়াহিয়া খান জিপ থেকে নেমে হাতের ব্যাটন দিয়ে শকুনটাকে সরানোর চেষ্টা করলেন। তা-ও সে নড়ে না! শেষমেশ বাগান থেকে এক মালি দৌড়ে এসে হাতের কোদালটা দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে খোঁচা দিয়ে শকুনটাকে সরাল ওখান থেকে।

দুই জেনারেলকে নিয়ে এগুলো জিপ। কিছুক্ষণ পরে গিয়ে পৌঁছাল একটা ভবনের সামনে, যেটাকে বাইরে থেকে দেখলে গুদাম মনে হয়। হর্ন বাজাতেই এক রক্ষী বাইরে এসে জেনারেল ইয়াহিয়াকে দেখেই স্যালুট করে দরজা খুলে দিল। ভবনের সামনেই অপেক্ষা করছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল রহিম খাঁ।

ওই ভবনটি আসলে ছিল পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সদর দপ্তর। সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে রাখা হয়েছিল সেটিকে।

ভেতরে যখন বৈঠকে বসছেন সবাই, ততক্ষণে পাকিস্তানের এফ-৮৬ বোমারু বিমানগুলো ভারতের ওপরে হামলা করার জন্য উড়ে গেল। আধা ঘণ্টার বৈঠকের পর যখন জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ফিরে যাওয়ার সময় হলো, তখনই বিমান হামলার সাইরেন বাজতে শুরু করল।

জেনারেল খানের এডিসি আর্শাদ সামি বিবিসি হিন্দিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘দেখলাম খুব নিচ দিয়ে বেশ কয়েকটা যুদ্ধ বিমান উড়ে গেল। ইয়াহিয়া খান ড্রাইভারকে ইঞ্জিন বন্ধ করে, আলো নিভিয়ে দিতে বলেছিলেন। তখন উল্টোদিক থেকে আরো কয়েকটা বিমান উড়ে আসতে দেখলাম। ইয়াহিয়া খান বেশ গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন, এগুলো আমাদের ইন্টারসেপ্টার বিমান। ’

আসলে একাত্তরের যুদ্ধটা তখন ইয়াহিয়া খানের প্রত্যাশার ঠিক উল্টোদিকে গড়াচ্ছিল। চারদিক থেকেই ব্যর্থতার খবর আসছে। চীন থেকে কোনো সাহায্য পাওয়ার আশা ত্যাগ করেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে ফোন করেছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া, কিন্তু নিক্সন তখন একটা বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন।

আর্শাদ সামি খাঁ বলেন, ‘১৩ ডিসেম্বর রাত প্রায় ২টার সময় রাষ্ট্রপতি ভবনের টেলিফোন অপারেটর আমকে জানিয়েছিলেন যে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ফোন করেছেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ঘুম থেকে ডেকে তুলি। টেলিফোন লাইনটা খুব খারাপ ছিল। জেনারেল আমাকে ঘুম জড়ানো গলায় বলেছিলেন, আমি যেন অন্য টেলিফোনে সব কথা শুনি, আর লাইন কেটে গেলে আমিই যেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাই। ’

প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কথার মূল বিষয়টা ছিল যে তিনি পাকিস্তানের সুরক্ষার জন্য খুবই চিন্তিত আর তাই সাহায্যের জন্য সেভেন্থ ফ্লিট (সপ্তম নৌবহর) বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা করিয়ে দিয়েছেন।

‘নিক্সনের ফোন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জেনারেল ইয়াহিয়া আমাকে বললেন, জেনারেল হামিদকে ফোন করো। হামিদ ফোনটা ধরতেই ইয়াহিয়া প্রায় চিত্কার করে বলেছিলেন, ‘উই হ্যাভ ডান ইট। আমেরিকান্স আর অন দেয়ার ওয়ে,’ বলেন স্কোয়াড্রন লিডার আর্শাদ সামি খাঁ।

সেভেন্থ ফ্লিট পরের দিন তো দূরের কথা, ঢাকার পতনের দিন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায়নি।

শেষমেষ দেশ দুই টুকরো করে ‘নিজের ধার শোধ’ করতে হয়েছিল জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে! জেনারেল এস কে সিনহা তাঁর আত্মজীবনী ‘আ সোলজার রিমেমবার্স’-এ লিখেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশর কাছে ইয়াহিয়া খানের সেই ধার নেওয়ার কাহিনী।

১৯৪৭-এ স্বাধীনতার সময়ে মানেকশ আর ইয়াহিয়া দুজনেই দিল্লিতে সেনা সদর দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। ইয়াহিয়ার অনেক দিনের পছন্দ ছিল মানেকশর লাল রঙের মোটরসাইকেলটা। ১৯৪৭-এ যখন ইয়াহিয়া পাকিস্তানে চলে যাচ্ছিলেন, তখন মানেকশ নিজের লাল মোটরসাইকেলটা ইয়াহিয়ার কাছে এক হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিলেন। ইয়াহিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে পাকিস্তানে পৌঁছেই টাকাটা তিনি মানেকশকে পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু সেটা তিনি ভুলে যান। একাত্তরের যুদ্ধের পরে মানেকশ মজা করে বলেছিলেন, ‘ইয়াহিয়া খানের চেক আসবে বলে ২৪ বছর অপেক্ষা করেছি, কিন্তু চেক আর আসেনি। সেই সাতচল্লিশে যে ধার করেছিলেন, নিজের দেশের অর্ধেকটা দিয়ে সেই ধার শোধ করলেন ইয়াহিয়া। ’

ইয়াহিয়া খানের যে শুধু মানেকশর লাল মোটরসাইকেলের প্রতি নজর ছিল, তা নয়। তাঁর নারীপ্রীতিও সবার জানা। তাঁকে ‘লেডিজ ম্যান’ বলা হতো। অনেক নারীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সংগীতশিল্পী ‘মালিকা-এ-তরন্নুম’ নূরজাহান। জেনারেল ইয়াহিয়া নূরজাহানকে নূরি বলে ডাকতেন, আর তিনি ইয়াহিয়াকে ‘সরকার’ বলে সম্বোধন করতেন। নূরজাহান আর ইয়াহিয়ার সম্পর্ক নিয়ে একটা গল্পও শোনান আর্শাদ সামি।

শুধু নারীতে নয়, সুরাতেও অসম্ভব আসক্ত ছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া। পার্টিতে যাওয়া ছিল তাঁর একটা অন্যতম শখ। একবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ) গিয়েছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া। সঙ্গে ছিলেন আর্শাদ সামি খাঁ। সামি বিবিসিকে বলেন, ‘ইয়াহিয়া এক দিন সন্ধ্যায় আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, পার্টিতে যাবে? আমি হ্যাঁ বলতেই তিনি জানতে চেয়েছিলেন আমি কোন গাড়ি ব্যবহার করি। মার্সিডিজের কথা বলতেই তিনি বলেছিলেন আজ অন্য কোনো গাড়ি নাও। ড্রাইভারকে বলে দেবে তোমার ঘরের পাশে পার্ক করে রাখতে। ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিও। ঠিক রাত ৯টা পাঁচ মিনিটে পেছনের বারান্দার কাছে এসে গাড়ির লাইট নিভিয়ে দেবে, পেছনের দরজাটা খুলে রাখবে। আমি ৯টা ১৫-এ গাড়িতে উঠব। একটি চাদর দিয়ে ঢেকে দেবে আমাকে। কেউ যেন বুঝতে না পারে গাড়িতে কে আছে। ’

সেই মতোই জেনারেল ইয়াহিয়াকে নিয়ে ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে বেরিয়েছিলেন আর্শাদ। তবে কিছুদূর গিয়েই পেছন থেকে চালকের পাশের আসনে চলে আসেন ইয়াহিয়া। আরো একটু পরে তিনি বলেন, মিসেস খন্দকারের জন্য ফুল কিনতে হবে।

বন্ধু মি. খন্দকারের বাড়িতে পৌঁছে নিজের হাতেই দরজায় বেল দিয়েছিলেন ইয়াহিয়া। ‘খন্দকার সাহেব তো দরজায় ইয়াহিয়া খানকে দেখে অবাক। তিনি ভাবতেও পারেননি যে সাইরেন না বাজিয়ে, লোকলস্কর না নিয়ে চুপচাপ ইয়াহিয়া তাঁর বাড়িতে পৌঁছে যাবেন! তবে ইয়াহিয়া অবাক হয়ে যাওয়া বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘কী কানু, তুমি ভেতরে যেতে বলবে না?’ ভারি চেহারা নিয়েও পার্টিতে খুব ভালো নাচতে পারতেন ইয়াহিয়া। সেই রাতে খন্দকারের পার্টিতে যতজন মহিলা ছিলেন, প্রত্যেকের সঙ্গে নেচেছিলেন ইয়াহিয়া। মাঝে মাঝে আমাকে জিজ্ঞাসা করছিলেন যে আমার ঘুম পাচ্ছে কি না,’ বিবিসি হিন্দিকে বলছিলেন আর্শাদ সামি খাঁ।

ইয়াহিয়ার আরেকটা শখ ছিল লোকজনকে উপহার দেওয়া। এডিসি আর্শাদকে প্রথম দিনেই বলে দিয়েছিলেন যে দেশ-বিদেশের অতিথিদের দেওয়ার জন্য সব সময় যেন কিছু উপহার মজুত থাকে।

একাত্তরের যুদ্ধটাও যেন অনেকটা সে রকমই ছিল ইয়াহিয়া খানের কাছে। একবার হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার পরে আর যুদ্ধটাকে নিজের কবজায় ফিরিয়ে আনতে পারেননি তিনি। তবে তার জন্য ইয়াহিয়া আর তাঁর অন্য জেনারেলদের অত্যধিক আত্মবিশ্বাসই অনেকটা দায়ী বলে মনে করেন সত্তরের দশকে পাকিস্তানের বিদেশসচিব হিসেবে কাজ করা সুলতান মুহম্মদ খাঁ। তিনি নিজের আত্মজীবনী ‘মেময়ার্স অ্যান্ড রিফ্লেকশন অব আ পাকিস্তানি ডিপ্লোম্যাট’ বইয়ে লিখেছিলেন, ‘ইয়াহিয়া খান এটা বিশ্বাস করতে তৈরি ছিলেন না যে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ করবে। সেই সময় পাকিস্তানের অন্য জেনারেলদের মধ্যেও এ ভুল ধারণা ছিল যে তাঁরা ছররা বন্দুক দিয়েই বাঙালিদের মাথানত করিয়ে দিতে পারবে, কারণ বাঙালিরা যুদ্ধ করতে জানে না। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে তাঁরা কতটা ভুল ছিলেন। ’

আর্শাদ সামি খাঁর সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন বিবিসি হিন্দির রেহান ফজল। গতকাল শনিবার এটি বাংলায় প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা অনলাইন।


মন্তব্য