kalerkantho


গবেষণাধর্মী বইয়ের কদর

পার্থ সারথি দাস   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গবেষণাধর্মী বইয়ের কদর

মেলায় একেবারে নতুন প্রকাশিত বইয়ের বাইরে আগে প্রকাশিত আলোচিত বইয়ের নতুন সংস্করণের প্রতিও পাঠকের যে প্রবল আগ্রহ আছে এর প্রমাণ মিলল গতকাল। একুশের গ্রন্থমেলায় এশিয়া পাবলিকেশন্সের স্টলে আছে ‘মুক্তিযুদ্ধে সামরিক অভিযান’-এর সাত খণ্ড।

গবেষণাধর্মী এ বইগুলোর মূল উদ্যোক্তা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালের যুদ্ধচিত্র তাতে উঠে এসেছে। প্রায় ১৪ বছর ধরে কাজ চলেছে এর। মোমিন উদ্দিন খালেদ এঁকেছেন সুন্দর প্রচ্ছদ। গতকাল মেলায় এশিয়া পাবলিকেশন্সের প্রকাশক ইসমাইল হোসেন বকুল প্রথম খণ্ডের পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে বলেন, ১৫ বছর আগে কাজ শুরু হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে যুদ্ধের বিবরণ ও বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল বিভিন্ন জেলা থেকে। পরে তা যাচাই-বাছাই করা হয়। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কাজটি গতি পায়। ২০০৯ সালে প্রথম বের হয়েছিল খণ্ডগুলো। তখন নাম ছিল ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’। তিন বছর আগে নতুন কমিটি হয় সৈয়দ আনোয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক করে। আবার যাচাই-বাছাই শেষে ‘মুক্তিযুদ্ধে সামরিক অভিযান’ নামে এটি বের করা হয়েছিল ২০১৫ সালের মে মাসে। এবারের মেলায় এসেছে এর সর্বশেষ সংস্করণ। এটি সত্যি একটি বড় কাজ।

২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এস এম মুশফিকুর রহমান। গত রাতে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, তথ্য সংগ্রহকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাতটি ডিভিশনের সাতটি এরিয়া ছিল। তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছিল ২০০০ সালে। ২০০৮ সালে কাজটি শেষ করার তাগাদা দেওয়া হয়। বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধেরই বিশদ বিবরণ আছে এতে। বিভিন্ন জেলার বর্ণনা, মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন বাহিনীর ভূমিকাও এতে উঠে এসেছে। ইসমাইল হোসেন বকুল জানান, প্রকাশের পর এ পর্যন্ত ৯০০ সেট বিক্রি হয়েছে। সাত খণ্ডের মূল্য রাখা হয়েছে ছয় হাজার ৫০০ টাকা। বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে ২৫ শতাংশ কমিশনে।

‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র’ ১৯৮৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর হাক্কানী পাবলিশার্স থেকে ২০০৩, ২০০৯ ও ২০১০ সালে ১৫ খণ্ডের সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। দাম ১৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর সম্পাদনা ও গ্রন্থনায় ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র’ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড এখানে পাওয়া যাচ্ছে। দাম তিন হাজার টাকা। অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘বাংলাদেশ রক্তের ঋণ’ নামের বইটির অষ্টম সংস্করণও পাওয়া যাবে এ স্টলে। হাক্কানী পাবলিশার্সের স্টলে বিক্রয় সহকারী সাজ্জাদ হোসেন শাওন কালের কণ্ঠকে বলেন, “এবারের মেলায়ও ১৫ সেটের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র’ কিনতে ক্রেতারা স্টলে আসছেন। ‘বাংলাদেশ রক্তের ঋণ’ও ভালো বিক্রি হচ্ছে। আমাদের বেশির ভাগ ক্রেতা দামদর করেন না, ফিরে যান না। কাঙ্ক্ষিত বইটি নিয়ে যান। ”

সৈয়দ আলী আহসানের ‘জয়নুল আবেদিন, শিল্পী ও শিল্পকর্ম’ বইটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের স্টলে দেখা গেল। দাম ৯০০ টাকা। জিনাত শাহরুখ বানুর ‘বাংলাদেশের দারুশিল্প’ বইয়ের দাম রাখা হয়েছে দুই হাজার ৫০০ টাকা। গবেষণাধর্মী বইয়ের দাম কেমন তা না দেখেই অনুসন্ধিত্সু পাঠক ও গবেষকরা তা কিনে নিচ্ছেন।

বিদ্যাপ্রকাশের স্টলে বিভিন্ন বইয়ের ভিড়ে চোখে পড়ে হোসেন উদ্দিন হোসেনের ‘বাংলার বিদ্রোহ’। দুই খণ্ডের বইয়ে ইতিহাসের সন্ধান করেছেন লেখক। তাঁর বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছার কৃষ্ণনগরে। গ্রামের কৃষক হিসেবেই নিজের পরিচয় দেন তিনি। ‘বাংলার বিদ্রোহ’র প্রথম খণ্ড গত বছর বের হয়েছিল। এবার বের হলো দ্বিতীয় খণ্ড। দাম রাখা হয়েছে ৪৫০ টাকা। বিদ্যাপ্রকাশের বই এবার এসেছে প্রায় ৫০টি। এর মধ্যে হোসেন উদ্দিন হোসেনের ‘যশোরাদ্য দেশ’ নামে ইতিহাস অনুসন্ধানী বইটিও আছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৩০ কপি। এর দাম রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা। বিক্রয়কর্মী মো. শাহজাহান জানান, এ লেখক দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরই লেখেন। অনেক কষ্ট করেন। জানা গেছে, হোসেন উদ্দিন সাদত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার-২০১৬ পেয়েছেন।

বিদ্যাপ্রকাশ প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধুর উক্তি’র সম্পাদনা ও সংকলন করেছেন তরুণ সুদীপ্ত সালাম। বঙ্গবন্ধুর ৩০টির বেশি বড় উক্তি রয়েছে এতে।

উৎস প্রকাশনের স্টলে নুরুল ইসলাম মনজুরের ‘বাঙালীর ইতিহাস চর্চার ধারা’ গ্রন্থটির পৃষ্ঠা ওল্টাচ্ছিলেন ক্রেতা ইকবাল পারভেজ। তিনি বলেন, ৫৫০ টাকা দাম। কমিশন মাত্র ২৫ শতাংশ। মেলায় আরো কমিশন দিলে ভালো হয়। তরুণ লেখক সাহাদাত পারভেজের ‘গজারিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ বের করেছে উৎস প্রকাশন। দাম রাখা হয়েছে ৫০০ টাকা।

চট্টগ্রামের প্রকাশনী সংস্থা আবির প্রকাশনের স্টলে ড. দীপংকর শ্রীজ্ঞান বড়ুয়ার ‘বাঙালী বৌদ্ধদের ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতি’ নামের বইটি গবেষকদের নজরে পড়েছে। বিক্রয়কর্মী মেহেদী হাসান জানান, এর অনেক কপি বিক্রি হয়েছে। গবেষণাধর্মী, ইতিহাস সন্ধান করে রচিত বইগুলো একশ্রেণির পাঠক ঠিকই খুঁজে নিচ্ছেন।

মুক্তিযুদ্ধে সামরিক অভিযান : প্রকাশ করেছে এশিয়া পাবলিকেশন্স। সাতটি খণ্ড আছে এটির। দাম ধরা হয়েছে ছয় হাজার ৫০০ টাকা। এতে প্রায় ৪০০ স্থানের যুদ্ধের বিবরণ আছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রায় দেড় দশকে শ্রমের ফসল এটি। এর মূল উদ্যোক্তা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

অর্ক : হরিশংকর জলদাসের এ বইটি প্রকাশ করেছে অবসর প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। দাম ২০০ টাকা। লেখকের জন্ম চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গা গাঁয়ের জেলেপল্লীতে। মধ্য বয়সে লিখতে এসে পাঠকের সাড়া পেয়েছেন। ‘অর্ক’ উপন্যাসে তিনি এক তরুণের কাহিনি তুলে এনেছেন।

আম জনতার আম : ফলের রাজা আম নিয়ে বইটি লিখেছেন সাংবাদিক ফখরে আলম। আমের ইতিহাস, আমের জাতপাত, আম দারোগা ছাড়াও বইটিতে ফজলি, ল্যাংড়া আমের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি নামিদামি সব আমের ভেতরের খবরও আছে। প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। প্রকাশ করেছে বিদ্যাপ্রকাশ। দাম ১৩৫ টাকা।

স্বামীসূত্র : বইটির লেখক আশা নাজনীন। এটি বের করেছে অবসর প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন চারু পিন্টু। প্রবাসী লেখিকা সুন্দর উপস্থাপনায় তুলে ধরেছেন সত্যচিত্র। স্থান, মাস ও বছর ধরে ঘটনার বর্ণনায় এগিয়েছেন। বইটির দাম রাখা হয়েছে ২৫০ টাকা।

লেখক-প্রকাশক, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীর উচ্ছ্বাসে মেলা প্রাণ পায় সন্ধ্যায়। এসেছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্য মতে, গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ১৫৬টি। এর মধ্যে গবেষণামূলক গ্রন্থ চারটি। প্রকাশনা সংস্থা ‘ভিন্নচোখ’ থেকে বের হয়েছে ভাস্কর চৌধুরীর সংস্কৃতিকর্মী তনু-হত্যাকাণ্ড নিয়ে উপন্যাস ‘চার্জশিট’, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স এনেছে ইমদাদুল হক মিলনের ‘নির্বাচিত ৩ উপন্যাস’সহ অন্য লেখকদের বিভিন্ন গ্রন্থ। ৬১টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে গতকাল। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অবস্থিত মেলার মূল মঞ্চে বিকেলে ছিল ‘নব্বইয়ের দশকের কবিতা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি মোস্তাক আহমাদ দীন। আলোচনা শেষে সন্ধ্যায় একই মঞ্চে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাগরিক নাট্যাঙ্গনের পরিবেশনায় পরিবেশিত হয় নাটক ‘ক্রীতদাসের হাসি’।


মন্তব্য