kalerkantho

উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গে

ব্রাহ্ম আন্দোলন

মুনতাসীর মামুন

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ব্রাহ্ম আন্দোলন

যৌবনে আমি ও আমার বন্ধু আলী ইমাম লেখালেখি ছাড়াও ঢাকা শহরের নানা অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতাম। ঢাকা শহর মানে পুরনো ঢাকা শহর। ঠাটারি বাজারের আলী ইমামের ঢাকা সম্পর্কিত জ্ঞান আমার চেয়ে ঢের বেশি ছিল। পাটুয়াটুলীতে পূর্ববঙ্গ ব্রাহ্মসমাজের রামমোহন লাইব্রেরির খোঁজ আমাকে প্রথম দেয় আলী ইমাম। গ্রন্থাগারটি সে-ই আমাকে প্রথম দেখায়। ব্রাহ্মসমাজের এক পাশে সরু একটি দালান, এখনো চোখে ভাসে। ঢাকা শহরের খুব পরিচিত গ্রন্থাগার ছিল রামমোহন রায় লাইব্রেরি। ব্রাহ্মসমাজ, সমাজ মন্দির, এসব আমাকে কৌতূহলান্বিত করেছিল। ব্রাহ্মসমাজ সম্পর্কে যে একেবারে কিছুই জানতাম না তা নয়, জানতাম। কিন্তু ব্রাহ্মসমাজের সে ইতিহাসে পূর্ববঙ্গের কোনো স্থান ছিল না। ১৯৭১ সালে রামমোহন রায় লাইব্রেরিতে আগুন দেওয়া হয়।

কিছু বইপত্র সদরঘাটের ফুটপাতে বিক্রি হতে থাকে। এভাবে ঢাকা শহরের পুরনো একটি গ্রন্থাগার বিলুপ্ত হয়।

স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই। গবেষণার বিষয় হিসেবে বেছে নিই আমাদের পরিচিত এই ছোট ভূখণ্ড পূর্ববঙ্গ। কারণ, বঙ্গের ইতিহাসে পূর্ববঙ্গের কোনো স্থান ছিল না।

উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গ নিয়ে কাজ করার সময় একটি বিষয় নিয়ে অভিসন্দর্ভে একটি অধ্যায় রচনা করার প্রচেষ্টা নিই। বিষয়টি হলো সামাজিক আন্দোলন। সামাজিক আন্দোলনের একটি আন্দোলন ছিল ব্রাহ্ম আন্দোলন। এই সময় আলী ইমাম আমাকে একটি মূল্যবান বই দেয়আদিনাথ সেনের ‘দীননাথ সেন ও তত্কালীন পূর্ববঙ্গ’। তিন খণ্ডে মূল্যবান এই বইটি রচনা করেছিলেন দীননাথপুত্র আদিনাথ। আদিনাথ অবশ্য তখন আমাদের কাছে বেশি পরিচিত ছিলেন সুচিত্রা সেনের শ্বশুর হিসেবে।

এই বইটি পড়ে ঢাকা/পূর্ববঙ্গ ব্রাহ্মসমাজ সম্পর্কে খানিকটা ধারণা পাই।

ব্রাহ্মসমাজ নিয়ে পড়াশোনা করার সময় দেখেছি বেশির ভাগ বই/প্রবন্ধের মূল বিষয়কলকাতায় ব্রাহ্মসমাজের উত্পত্তি (রামমোহন রায়), বিকাশ (দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্র) ও ধর্মসম্পর্কিত তাদের ধ্যান-ধারণা ও বিতর্ক। একমাত্র শিবনাথ শাস্ত্রীর অমূল্য গ্রন্থ ‘হিস্ট্রি অব ব্রাহ্মসমাজ’-এ পূর্ববঙ্গ ও অন্যান্য এলাকার ব্রাহ্মসমাজ নিয়ে সংক্ষিপ্ত ধারাবাহিক ইতিহাস দেওয়া আছে। এর বাইরে কোথাও বিস্তারিত কিছু লেখা হয়নি।

ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে পড়াশোনার সময় পূর্ববঙ্গে বিভিন্ন ব্রাহ্মসমাজ প্রকাশিত কিছু পুস্তিকাও পেয়েছিলাম। সংবাদ-সাময়িকপত্র থেকেও কিছু সহায়তা পেয়েছিলাম। এসব দিয়ে পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্ম আন্দোলনসম্পর্কিত একটি অধ্যায় রচনা করেছিলাম। বলা যেতে পারে, শিবনাথ শাস্ত্রীর বইয়ের পর পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন সমাজ নিয়ে এটি ছিল প্রথম আলোচনা। যে কারণে এর সীমাবদ্ধতা ছিল। পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্মসমাজ নিয়ে আমার আগ্রহের কারণ ছিল দ্বিবিধ।

বাংলায় ব্রাহ্ম আন্দোলন, পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্মরা অধিকতর নিপীড়িত হয়েছিল, কিন্তু ব্রাহ্ম আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে পিছপা হয়নি, যে কারণে শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছিলেন, পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্মরাই তাদের বিশেষ জোর। ওই সময়ের গ্রামীণ রক্ষণশীল, অজ্ঞ সমাজের মুষ্টিমেয় কয়েকজনের এই আন্দোলন সমাজকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল। সমাজে গতিশীলতার সৃষ্টি করেছিল। পূর্ববঙ্গে ১৮৭০ সালের দিকে যে জাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল, যাকে আধুনিকীকরণের সময়ও বলতে পারি, তার একটি উপাদান ব্রাহ্ম আন্দোলন। পূর্ববঙ্গের সমাজ ইতিহাসে তাই ব্রাহ্ম আন্দোলন খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাহ্মসমাজ সম্পর্কিত আমার ওই প্রবন্ধটি পরে ‘সমাজ নিরীক্ষণ’ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। সেই সময়ই ঠিক করি (১৯৮০-এর দশকে), পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্মসমাজ সম্পর্কিত তথ্যবহুল একটি ইতিহাস রচনার চেষ্টা করব।

ব্রাহ্মসমাজের প্রথম ভাঙনের আগে যেসব সমাজ গঠিত হয়েছিল ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত, সেসব আদি সমাজের সঙ্গেই যুক্ত ছিল। ১৮৬৫ সালে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ গঠিত হলে, পূর্ববঙ্গে বেশির ভাগ সমাজ এর সঙ্গে যুক্ত হয়। আবার ১৮৭৮ সালের পর ব্রাহ্মসমাজ বিভক্ত হলে বেশির ভাগ সমাজ সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। নববিধান ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল বা চট্টগ্রামে গঠিত হয়েছিল। কিন্তু ঢাকারটি ছাড়া বাকিগুলো ছিল হীনবল। তাই নববিধান সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা হয়নি, তথ্যও নেই। ব্রাহ্মসমাজের যে তালিকা আমি প্রস্তুত করেছি, সেখানে নববিধান সমাজগুলো অন্তর্ভুক্ত করিনি। যেখানে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ ছিল না, কিন্তু নববিধান ছিল, তার নাম শুধু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিবনাথ শাস্ত্রীর তালিকায় ৪২টি সমাজের নাম ছিল। আমার তালিকায় ৭২টি সমাজের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাতে ব্রাহ্মসমাজের ব্যপ্তি খানিকটা স্পষ্ট হলো।

এই গ্রন্থ দুটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে ব্রাহ্মসমাজের উত্থান ও বিকাশ আলোচিত হয়েছে ১৮৪৬ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত। এতে দেখানো হয়েছে, কিভাবে ব্রাহ্ম আন্দোলন আন্দোলনে পরিণত হলো এবং ৫৫ বছরে পূর্ববঙ্গের সমাজে তা কি অভিঘাতের সৃষ্টি করেছিল। দ্বিতীয় পর্বে শুধু পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্মসমাজ সম্পর্কিত বিভিন্ন সংবাদের সংকলন।

এ ছাড়া আলাদা একটি অধ্যায় ‘ব্রাহ্ম চরিতাভিধান’। পূর্ববঙ্গে ব্রাহ্ম আন্দোলনে যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। পরিশিষ্টে যেসব প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে, সেসব আমার সংগ্রহেও ছিল। পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্মসমাজের নতুন একটি তালিকাও প্রস্তুত করেছি, তাও সংযোজিত হলো। পূর্ববঙ্গ বলতে বর্তমান বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানা বোঝানো হয়েছে।

পূর্ববঙ্গবিষয়ক এই গ্রন্থটিই ছিল আমার চার দশকের আগে পরিকল্পিত পূর্ববঙ্গবিষয়ক বইগুলোর মধ্যে জটিলতম গ্রন্থ। আজ বইটির প্রকাশ আমাকে শুধু সন্তুষ্ট নয়, ভারমুক্তও করেছে। আশা করি ভবিষ্যতের গবেষক এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত লিখবেন এবং আমার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করবেন। বইটি প্রকাশ করেছে অনন্যা।


মন্তব্য