kalerkantho


উপন্যাসের দিকে বেশি নজর

পার্থ সারথি দাস   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



উপন্যাসের দিকে বেশি নজর

ছুটির দিন। শুক্রবার।

সকাল থেকেই বইমেলায় শুরু হয় জনস্রোত। দুপুরের পর সেই জনস্রোত টিএসসি থেকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে পরিণত করে জনসমুদ্রে। গতকাল ভিড় ও বিক্রি দুটোই ছিল বেশি। তবে এখনো খুঁজে খুঁজে উপন্যাস কেনার দিকেই পাঠকের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে।

সস্তা প্রেম, সুরসুরি দেওয়া গল্পকে ধারণ করে রচিত বেশির ভাগ উপন্যাস ফুড়ুৎ করে শেষ হয়ে যায়। তবে দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, বিরল প্রেম কিংবা ব্যতিক্রম কোনো বিষয়কে ধরে রচিত বইয়ের দিকে পাঠকের কৌতূহল আগের চেয়ে বাড়ছে। গতকাল বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্টলে স্টলে মৌলিক উপন্যাসেরও খোঁজ করতে দেখা গেছে পাঠকদের। অনেক স্টলে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রিয় ও প্রখ্যাত লেখকরাও। ক্রেতাদের অনেকে বই কিনে প্রিয় লেখকের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিয়েছে, কেউবা লেখকের সঙ্গে সেলফিও তুলেছে, সাহিত্য নিয়ে আড্ডা দিয়েছে।

কথাপ্রকাশের স্টলে এসেছে প্রশান্ত মৃধার উপন্যাস ‘ডুগডুগির আসর’। তিনি বললেন, “ইতিহাসের পটভূমিতে উপন্যাস লেখার প্রবণতা ১০-১৫ বছর ধরে বেড়েছে। হুমায়ূন আহমেদের ‘জ্যোত্স্না ও জননীর গল্প’, ‘মধ্যাহ্ন’, আনিসুল হকের ‘যারা ভোর এনেছিল’—এগুলোর পটভূমি ছিল ইতিহাস। ”

কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল বলেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব-পশ্চিম বের হওয়ার পর বাংলাদেশে ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস রচনার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। প্রয়াত সৈয়দ শামসুল হক ও হুমায়ূন আহমেদ এ ধরনের কাজ করেছেন। আনিসুল হকসহ আরো বেশ কয়েকজন কাজ করে চলেছেন। গত বইমেলায় তাজউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে সোহান রিজওয়ান লিখেছিলেন ‘সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ’। স্বকৃত নোমানের ‘কাল কেউটের সুখ’ও ইতিহাসনির্ভর। ইতিহাসকে আশ্রয় করে রচিত উপন্যাসগুলোর বেশির ভাগই হয়ে যাচ্ছে ডকো-ফিকশন। কোনটি কতটা ইতিহাসকে ধরে রাখছে তার বিচার করবেন পাঠক।

পার্ল পাবলিকেশনেসর স্টলে দেখা গেল ব্যাপক ভিড়। ভিড়ের মধ্যেও সুন্দর প্রচ্ছদের উপন্যাস ‘অগ্নিকন্যা’ চোখে পড়ে সমাগতদের। ইতিহাসকে আশ্রয় করে লেখা মোস্তফা কামালের উপন্যাস এটি। ‘অগ্নিকন্যা’ রচনায় লেখক উপন্যাসের আঙ্গিক বিনির্মাণের পাশাপাশি গুরুত্ব দিয়েছেন ইতিহাসের পরম্পরায়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সময়ের রূপায়ণ হয়েছে এতে। কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামালের ভাষায়, ‘আমি অনেক শ্রম ও কষ্টে এটি রচনা করেছি। ’

মেলায় আসা ধানমণ্ডির জহুরা হক বললেন, ‘সিরিয়াস উপন্যাস খুঁজছি। কোন স্টলে কী কী উপন্যাস এসেছে দেখছি। ’ তাম্রলিপির স্টলে ভিড় ছিল বিকেল থেকেই। এবার এই প্রকাশনীর ৯০টি বইয়ের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত আসা উপন্যাস ছিল আটটি। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন ‘রিটিন’ কিনতে আসা নদী রহমান বললেন, ‘নতুন উপন্যাসের দিকে আমার আগ্রহ বেশি। ’ অবসর প্রকাশনীর স্টলে ৩৫টি বইয়ের মধ্যে উপন্যাস এসেছে দুটি। হরিশংকর জলদাসের ‘অর্ক’ কিনতে আসা ইব্রাহীম খলিল বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া, জেলেপল্লীতে অসহায় নারীদের ওপর নির্যাতনের কাহিনী উঠে এসেছে বলে জানতে পেরেছি। তাই বইটি কিনতে চাই। ’

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাঞ্জেরীর স্টলে নতুন বই এসেছে ৬৯টি। এর মধ্যে উপন্যাস পাঁচটি। এই প্রকাশনী থেকে গতকাল পর্যন্ত মেলায় এসেছে কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের ‘হাতি গিয়েছিল মানুষ দেখতে’সহ বিভিন্ন লেখকের দুই শতাধিক বই। প্রতিষ্ঠানটির বিপণন ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা জানান, মোশতাক আহমেদের সেরা পাঁচটি কিশোর উপন্যাস তাঁরা এনেছেন।

বাঙালি প্রকাশনীর স্টলে থরে থরে সাজানো নতুন সব বই। এ প্রকাশনীর প্রকাশক আরিফ নজরুল জানান, এবার সব মিলিয়ে তাঁরা ৩০টি বই আনবেন। তার মধ্যে এসেছে ২৫টি। এর মধ্যে উপন্যাস দুটো। প্রবন্ধের বই তাঁরা প্রকাশ করেছেন বেশি। মাহবুব তালুকদারের কাব্যগ্রন্থ ‘মৃত্যুশয্যায় আমি একা’ দেখিয়ে বললেন, এটি নতুন এসেছে। গত ডিসেম্বরে বাঙালির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে জানিয়ে আরিফ বললেন, আগামী বছরের মেলায় ১০টি উপন্যাস আনবেন তাঁরা।

ভিড়ের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখা গেল, ঐতিহ্য প্রকাশনীর স্টলে এসেছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’সহ তিনটি নতুন উপন্যাস। ঐতিহ্যের আমজাদ হোসেন খান জানান, গতকাল বের হয়েছে মাহবুব আলমের ‘অষ্ট ব্যঞ্জন’সহ অন্য দুই লেখকের দুটি বই।

বাতিঘরের স্টলে গিয়ে জানা গেল, এবার ছয়টি উপন্যাস এসেছে। তার মধ্যে রাশেদ রউফের ‘খোলা আকাশের দিন’টি শেলফে জ্বলজ্বল করছিল। প্রকাশনীটির কর্মকর্তা সঞ্জয় সূত্রধর জানান, ক্রেতার চেয়ে ভিড় বেশি।

কাকলী প্রকাশনীর সামনেও ছিল খুব ভিড়। সেখানেও উপন্যাসের ক্রেতাই ছিল বেশি। কাকলী মেলায় নতুন বই এনেছে ৩৫টি। এর মধ্যে উপন্যাস ১৯টি। কাকলী প্রকাশনীর প্রকাশক এ কে নাছির আহমেদ সেলিম জানান, হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন উপন্যাস ছাড়াও আনিসুল হকের ‘মায়ের জন্য ভালোবাসা’, সুমন্ত আসলামের ‘জ্যোত্স্না নিমন্ত্রণ’ নিয়ে পাঠকের আগ্রহ আছে। অনিন্দ্য প্রকাশের স্টলে আসা ৭৫টি বইয়ের মধ্যে ১৪টি উপন্যাস।

নতুন উপন্যাস এসেছে তিন শতাধিক : এ পর্যন্ত মেলায় উপন্যাস এসেছে ৩১৫টি। বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মেলার ১৭তম দিনে নতুন বই এসেছে ২৪১টি। এর মধ্যে উপন্যাস ছিল ২৭টি। অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে মাসুদা ভাট্টির ‘মেয়েটি কখনও কোন কৃষককে ভালোবাসেনি’, কথাপ্রকাশ থেকে সৈয়দ আজিজুল হকের ‘বাংলা কথাসাহিত্যে মানবভাবনা’, চয়ন প্রকাশন থেকে কাওসার পারভীন চৌধুরীর উপন্যাস ‘সংরক্ষণ’সহ বিভিন্ন উপন্যাস বের হয়েছে। এ ছাড়া ৬৪টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়।

‘আপন মাহমুদ সমগ্র’-এর মোড়ক উন্মোচন : অকালপ্রয়াত কবি আপন মাহমুদের সব লেখা নিয়ে প্রকাশিত ‘আপন মাহমুদ সমগ্র’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। গতকাল বিকেলে বাংলা একাডেমির বহেরাতলায় লিটলম্যাগ চত্বরে গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করেন কবি সরোজ মোস্তফা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক রেজা ঘটক, কথাসাহিত্যিক জেসমিন মুন্নী, কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান, কবি রুদ্র আরিফ, কবি ফেরদৌস মাহমুদ, কবি মামুন খান, কবি জুয়েল মোস্তাফিজ, কবি সফেদ ফরাজী প্রমুখ।

বইটির প্রকাশক চৈতন্যের স্বত্বাধিকারী রাজীব চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপন মাহমুদ সমগ্র প্রকাশ করতে পেরে আমরা গর্ববোধ করছি। মনে হচ্ছে, একটি মহৎ কাজ করেছি। এমন শক্তিমান কবি, অসম্ভব ভালো যাঁর কবিতা, তিনি এত অল্প বয়সে চলে গেলেন! তাঁর চলে যাওয়া আমাদের ব্যথাতুর করে। তবে তিনি হারিয়ে যাননি। তাঁর বইটি প্রকাশের ক্ষেত্রে আমরা ব্যবসাকে প্রাধান্য দিইনি; আমরা চাচ্ছি তাঁর বইটি পাঠকের হাতে হাতে পৌঁছে যাক, পাঠক ভালো কবিতার স্বাদ উপভোগ করুক। ’

এখানে পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চারটি বইয়ের পরিচিতি তুলে ধরা হলো—

মৃত্যুশয্যায় আমি একা : কাব্যগ্রন্থটির লেখক মাহবুব তালুকদার। বইটি প্রকাশ করেছে বাঙালি প্রকাশনী। এটি লেখকের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। এ গ্রন্থে কেবল অসুখের কবিতা নয়, রোগমুক্তি ও মৃত্যুচিন্তার কবিতা রয়েছে। অসুস্থ মনে ও মননে যে ঐন্দ্রজালিক মোহ তৈরি হয় তার স্বরূপ অন্বেষণ করেছেন লেখক।

বাংলা কথাসাহিত্যে মানব ভাবনা : বইটির লেখক সৈয়দ আজিজুল হক। প্রকাশক কথাপ্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। কথাশিল্পের জন্মের সঙ্গেই অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে আছে মানবের জয়গাথা। ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী যুগে মানুষই যখন হয়ে উঠেছে সব কিছুর কেন্দ্র, তখন নতুন সাহিত্যরূপ হিসেবে অনিবার্য আগমন ঘটে উপন্যাসের। এ বইয়ে লেখকের কথাশিল্প বিবেচনার যোগসূত্রে পাঠকও এই বহুমাত্রিক জীবনবোধের সঙ্গে একান্তে পরিচিত হতে পারবেন।

সন্ধ্যায় ফেরার সময় : গল্পগ্রন্থটির লেখক কাজী আলিম-উজ-জামান। বইটি প্রকাশ করেছে অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স। বিষয় যেন গণমানুষেরই মনের কথাকে অম্লমধুর রম্যভাষায় গল্পের জাল বোনে পাঠক-পাঠিকার জন্য। এটি এক অর্থে লেখক হিসেবে গল্পকারের সামাজিক দায়িত্ববোধ তথা বিপুল জনগোষ্ঠীর সার্বিক মুক্তির ভাষা চিত্ররূপ দান করেছে। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন মাসুক হেলাল। মূল্য ১৭০ টাকা।

আপন মাহমুদ সমগ্র : এ গ্রন্থের লেখক শূন্য দশকের অন্যতম প্রভাববিস্তারী কবি আপন মাহমুদ, যিনি ২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। এ বইটিতে তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সকালের দাঁড়ি কমা’, প্রায় শখানেক অগ্রন্থিত কবিতা ও বেশ কিছু গদ্য রয়েছে। বইটি পাঠে আধুনিক বাংলা কবিতার নতুন আঙ্গিক, নতুন চিন্তা ও হৃদয় দিয়ে অনুভব করা মানুষ ও পৃথিবী সম্পর্কে অন্যতর উপলব্ধির দেখা পাবেন পাঠক। নান্দনিক প্রচ্ছদ, চমত্কার মুদ্রণ ও গেটাপ-মেকআপে সাড়ে ১০ ফর্মার বইটি প্রকাশ করেছে চৈতন্য। প্রচ্ছদ করেছেন রাজীব দত্ত। মূল্য ২৫০ টাকা।

মেলামঞ্চের আয়োজন : গতকাল বিকেলে মেলার মূলমঞ্চে ‘আশির দশকের কবিতা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান হয়। সন্ধ্যায় একই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আজ শনিবার সকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে শিশুকিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। বিকেলে মেলার মূলমঞ্চে হবে ‘নব্বই দশকের কবিতা’ শীর্ষক আলোচনা। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কবি মোস্তাক আহমদ দীন। আলোচনায় অংশ নেবেন ড. শহীদ ইকবাল এবং ড. এ এম মাসুদুজ্জামান। সভাপতিত্ব করবেন কবি সাজ্জাদ শরিফ। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।


মন্তব্য