kalerkantho


এক ওয়াক্ফ সম্পত্তি বারবার বিক্রি করেছেন তানবীর

আপেল মাহমুদ   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



এক ওয়াক্ফ সম্পত্তি বারবার বিক্রি করেছেন তানবীর

বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সাবেক মন্ত্রী ও বলিয়াদী জমিদার এস্টেটের মালিক চৌধুরী তানবীর আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে প্রতারণার একাধিক অভিযোগ আছে। তিনি যেমন বিএনপি অফিসের দলিল ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করেননি, তেমনি এক জমি বারবার বিক্রি করে পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীরা চকবাজার থানা ও ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতে মামলা করেছেন। তিনি এর একটি মামলায় জামিনও নিয়েছেন।

জানা যায়, পুরান ঢাকার আলী হোসেন খান রোডে কালিয়াকৈরের বলিয়াদী জমিদার এস্টেটের ৪২ কাঠা ওয়াক্ফ সম্পত্তি রয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৯০ জন ভাড়াটিয়া থাকে। তাদের কাছ থেকে ছাপানো হাবেলি ভাড়ার দাখিলা দিয়ে যে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে সেখানে ওই সম্পত্তি ওয়াক্ফ এস্টেট হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। মোতোয়ালির নাম চৌধুরী তানবীর আহমেদ সিদ্দিকী। তবে কিছুদিন ধরে রসিদে ওয়াক্ফ কথাটি বাদ দিয়ে তানবীর আহমেদ সিদ্দিকীর নামে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, ওয়াক্ফ শব্দটি গোপন করে তানবীর আহমেদ সিদ্দিকী ওই সম্পত্তি থেকে চার কাঠা জমি দুই কোটি ৮০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেন। এরপর বাকি ৩৮ কাঠা ২০ কোটি ১৪ লাখ টাকা দামে ব্যবসায়ী মো. বশির উদ্দিনের কাছে বিক্রির জন্য চুক্তি করেন।

এ জন্য অগ্রিম হিসেবে ৩০ লাখ টাকা গ্রহণও করেন। একই সম্পত্তি আবার তিনি গোপনে মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী হাজি হাফেজ এনায়েত হোসেনের কাছে বিক্রির কথা বলে এক কোটি টাকা গ্রহণ করেন। শেষ পর্যন্ত তানবীর কাউকেই সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে না দিয়ে পুরো ৪২ কাঠা জমি ছেলে চৌধুরী ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীর নামে হেবা করে দেন।

মৌলভীবাজার এলাকার বাসিন্দা আফজাল হোসেন এ বিষয়ে বলেন, ‘বিতর্কিত তানবীর ও তাঁর ছেলে ইশরাক শুধু ওয়াক্ফ সম্পত্তিই নয়, ১৬ দিলকুশার বলিয়াদী ম্যানশন ডেভেলপারদের দেওয়ার কথা বলে কোটি কোটি টাকা নিয়েছেন। এরপর তাঁরা আর চুক্তিপত্র করেননি, অগ্রিম নেওয়া টাকাও ফেরত দেননি। বর্তমানে তানবীর সিদ্দিকী বয়সের ভারে ন্যুব্জ থাকায় তাঁর ছেলে সব কলকাঠি নাড়ছেন। তিনি জামায়াতের পলাতক নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। ’

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, ওয়াক্ফ সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য তানবীর আহমেদ সিদ্দিকী দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করছেন। সে অনুযায়ী তিনি পুরো ৪২ কাঠা জমি নিজের নামে আরএস ও সিটি জরিপভুক্ত করান। অথচ ওই সম্পত্তি তাঁর পূর্বপুরুষ কাজেম উদ্দিন আহমেদ সিদ্দিকী ওয়াক্ফ করে যান। যার ইসি নম্বর-৮০৪।

গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার বলিয়াদী গ্রামের একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, সরকার জমিদার প্রথা বাতিল করলেও তানবীর আহমেদ সিদ্দিকীরা মামলা ঠুকে কয়েকটি মৌজা নিজেদের দখলে রাখেন। এসব সম্পত্তি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা নিয়েও নানা প্রতারণা করেছেন তাঁরা। বসে বসে খাওয়ায় তাঁদের জমিদারি এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এ ধরনের সম্পত্তি কেউ বিক্রি তো দূরের কথা, তা ভোগ পর্যন্ত করতে পারেন না। ওয়াক্ফ দলিলের বাইরে যাওয়ার কোনো বিধান আইনে নেই।

ওয়াক্ফ প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া জানান, তাঁদের অনুমতি ছাড়া কেউ এই সম্পত্তির একটি ধূলিকণাও সরাতে পারেন না। অথচ তানবীর ও ইশরাক এ সম্পত্তি নিজেদের নামে রেকর্ড করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করছেন, যা রীতিমতো জালিয়াতি ও প্রতারণার শামিল।

মো. বশির উদ্দিন অভিযোগ করেন, তানবীর এক জমি একাধিক জায়গায় বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আবার সে সম্পত্তি গোপনে ছেলের নামে হেবা দলিলমূলে হস্তান্তর করেছেন। এ তথ্য আমরা লালবাগ এসি ল্যান্ড অফিস থেকে জানতে পারি। সেখানে নামজারি করতে গেলে পুরো ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়। যার কারণে চৌধুরী ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীর নামে নামজারি বাতিল হয়ে যায়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ওয়াক্ফ এস্টেটের সম্পত্তি জানার পর ব্যবসায়ী  বশির উদ্দিন ও এনায়েত হোসেন তা কেনা থেকে বিরত থাকেন। তাঁরা এখন টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু টাকা ফেরত দেওয়ার নামও করছেন না তানবীর। ফোন করলেই তিনি বলেন, ‘তানবীর সিদ্দিকী এখনো দেশের জমিদার। সে একবার যার কাছ থেকে টাকা নেয় তা আর ফেরত দেয় না। ’ এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন তিনি। যে কারণে কেউ কেউ থানায় জিডিও করেছেন।

প্রতারণার শিকার বশির উদ্দিন চকবাজার থানায় জিডি করেও কোনো প্রতিকার পাননি। পরে তিনি ঢাকা সিএমএম আদালতে একটি মামলা করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তানবীর আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। এরপর তিনি আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেন।

বলিয়াদী এস্টেটের ম্যানেজার মো. শহীদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মৌলভীবাজারে বলিয়াদী ওয়াক্ফ এস্টেট হিসেবে যে সম্পত্তি চিহ্নিত করা হচ্ছে সেটা আমাদের সাহেব চৌধুরী তানবীর আহমেদ সিদ্দিকীর পরিবারিক সম্পত্তি। তবে ওই জমি বিক্রি করার কথা বলে তিনি কারো কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়েছেন কি না তা আমার জানা নেই। ’

এসব অভিযোগের ব্যাপারে মতামত জানতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তানবীর আহমেদ সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপনি অযথা আমার বিরুদ্ধে লেগেছেন। আমি এসবের কোনো জবাব দেব না। ’


মন্তব্য