kalerkantho


স্মৃতিগদ্য বন্ধনহীন গ্রন্থি

হাসান আজিজুল হক

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্মৃতিগদ্য বন্ধনহীন গ্রন্থি

‘স্মৃতিগদ্য : বন্ধনহীন গ্রন্থি’ গ্রন্থের গ্রন্থভুক্ত লেখাগুলো বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে। টুকরো টুকরো শৈশবের স্মৃতি, মা-বাবা, জানু আপাসহ অনেক স্মৃতিচারণামূলক লেখা এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

গ্রন্থটির গদ্যগুলো ব্যক্তিগত ও আত্মজৈবনিক, রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজ ও সমকালীন বিষয়-আশয়সহ মোট তিনটি পর্বে বিভক্ত। ব্যক্তিগত ও আত্মজৈবনিক পর্বে আছে মায়ের মুখ, শৈশবস্মৃতি, বালক বয়স, একটুখানি ছেলেবেলা : মা ও বাবা, ছেলেবেলার উৎসব, শৈশবের মেলার স্মৃতি, খানিকটা বেলা হলে, চুরুলিয়ার স্মৃতি, খানিকটা ফিরে দেখা, আমার আলমামাতের, জানু আপার লেখক হয়ে ওঠা, স্মৃতি সততই সুখের নয়সহ প্রভৃতি গদ্য। আর রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজ পর্বে আছে রাষ্ট্র হোক জনগণের, প্রকৃত গণতন্ত্র হনুজ দূরস্থ, তবু ভালো কিছু হোক, ’৭৫-এর ঘটনা গণতন্ত্রের মূলে কুঠারাঘাত, ভুল অঙ্কেরও সঠিক উত্তর হয়। সমকালীন বিষয়-আশয় পর্বে আছে গুরুত্বের জায়গা তো উচ্চশিক্ষায় বাংলা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়, শরণার্থী, সমাধান জানা নাই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভরসার একমাত্র ভূমি, নিখোঁজদের ঠিকানা, শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষায় এগিয়ে আসুন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, দেশের সব জঙ্গিগোষ্ঠীর অভিভাবক জামায়াত, কোরবানি : ত্যাগের বদলে প্রদর্শনের উৎসব!, দেশকে ভালোবাসতে হলে দুঃসাহসিক হতে হবে, প্রশ্নগুলোকে অ্যাকিলিসের বর্শা করে তুলুন, স্বাধীন দেশে এ কোন নতুন অভিজ্ঞতাসহ গদ্যগুলো।

আমরা বর্তমানে বাঁচি, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি, কল্পনা করি। পেছনে যেটা ফেলে আসি সেটা অতীত, তা নিয়ে যখন কথা বলি সেটা হয়ে যায় স্মৃতিচারণা। মানুষের জীবনে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ—অতীত, বর্তমান, না ভবিষ্যৎ? নিশ্চয় বর্তমানটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তা সরাসরি এই মুহূর্তে বেঁচে থাকার সঙ্গে যুক্ত। তাহলে ভবিষ্যৎ কতটা গুরুত্বপূর্ণ? কিছুটা বটে, কিন্তু বর্তমানের সঙ্গে তুল্য নয়।

ভবিষ্যতের একটা বিরাট অংশ স্বপ্ন আর কল্পনা। রবীন্দ্রনাথের কথায় বলতে হয়, ‘আমি কেবলি স্বপন করেছি বপন আকাশে। ’ মাটি ছাড়া কোনো বীজ বপন করা কি যায়? কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষার বীজ বুনে থাকি। তা না হলে বেঁচে থাকাটা অসম্ভব কষ্টকর হয়। এত যন্ত্রণা? প্রতিনিয়ত ক্ষয়। প্রতিনিয়ত মৃত্যু। আমরা মৃত্যু বলি একটি বিশেষ সময়ে যখন সব স্থির, নিথর হয়ে আসে। সেটা তো একদিনে ঘটে না। সেটা শুরু হয় জন্মের পর থেকেই। মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে। এক মুহূর্তের মৃত্যু হলে পরের মুহূর্তের জন্ম হয়। এই মুহূর্তটির মৃত্যু হলে নতুন আর একটি মুহূর্তের জন্ম হয়। তবু আমি জীবনটাকে আগ্রাসী হয়েই গ্রহণ করি। আমার হিসাব খুব সহজ। জন্মের আগের কোনো স্মৃতি আমার কাছে নেই। প্রতি মুহূর্তে মরি আর প্রতি মুহূর্তে বাঁচি।

মাকে নিয়ে আমার বহু স্মৃতি আছে। আমার উপন্যাস ‘আগুনপাখি’, মাকে নিয়ে লেখা। মা ছেড়ে গেছেন অনেক দিন হলো। আমার মা আমার জন্য কী ছিলেন তা আমি জানি। মাকে মনে করতে গিয়ে, মায়ের কথা বলতে গিয়ে আমার ক্যালেন্ডারের কোনো প্রয়োজন নেই। মায়ের কথা মনে করতে আমার কোনো উপলক্ষের দরকার হয় না। বাড়িতে মায়ের অসংখ্য ছবি আছে। বাড়িতে মায়ের একটা তৈলচিত্র আছে বড়।

রাঢ়দেশে বিরাট এক একান্নবর্তী পরিবারে আমার জন্ম। এখন হিসাব করে দেখছি পরিবারের লোকসংখ্যা ছিল তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। গরু ছাগল ভেড়া দেখাশোনার জন্য লোকজন, ক্ষেত-খামারের কাজের সঙ্গে যুক্ত মাহিন্দার ইত্যাদি হিসাব করলে সংখ্যা চল্লিশ ছাড়িয়ে যাবে। আর বর্ষায় চাষের সময় কিংবা শীতে ফসল বোনার মৌসুমে পঞ্চাশ ছাড়িয়ে যেতে পারত এই সংখ্যা। পাঁচ ভাইয়ের যৌথ পরিবারের মাত্র একজনই সপরিবারে জেলা শহর বর্ধমানে বাসা করে থাকতেন। মনে পড়ে, বর্ধমান শহরের এই ছোট্ট একতলা বাড়িটি বড় টানত আমাকে। আমার অন্তর্জীবনের  ভূসংস্থানে অনেকটা জায়গাজুড়ে ছিল বহিলাপাড়ার এই বাড়ি আর পুরনো বর্ধমান শহর। এরকম অনেক গদ্যই লিখেছি আমি এই গ্রন্থে। সঙ্গে আছে রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজ নিয়ে দু-চার কথা, আছে সমকালীন অন্যান্য বিষয়-আশয় নিয়েও। বিশেষ কোনো পরিমার্জন ছাড়া একত্র করে এই সংকলনটি প্রকাশ করা হলো। লেখাগুলো একত্র করে গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করার পুরো কৃতিত্ব জহিরুল আবেদীন জুয়েলের। এ গ্রন্থটি বের করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, প্রচ্ছদ করেছে কাব্য কারিম, মূল্য ৩০০ টাকা।


মন্তব্য