kalerkantho


উচ্ছ্বাস ছড়াচ্ছে ঢাকার বাইরের তারুণ্যও

তৌফিক মারুফ   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



উচ্ছ্বাস ছড়াচ্ছে ঢাকার বাইরের তারুণ্যও

সপ্তাহের শেষ আর বন্ধের আগের দিন বলেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে না নামতেই বাড়তে থাকে ভিড়। চারদিকে চলতে থাকে ঘুরে-ফিরে বই দেখা, আড্ডা আর সেলফির উচ্ছ্বাস।

কোথাও কোথাও আবার বড় লেখকদের ঘিরে জটলা। গতকাল বৃহস্পতিবার এমন চিত্রই ছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলায়।

শহীদ কাদরী চত্বরে খোলা আকাশের নিচে বসে অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তারুণ্যের ভিড় তাঁকে ঘিরে। ভিড় ঠেলে অটোগ্রাফ পেয়েই আকাশের দিকে দুই হাত তুলে লাফিয়ে ওঠে চট্টগ্রাম থেকে আসা কলেজ পড়ুয়া অদ্রিকা। একই সঙ্গে ওর হাতে ধরা বই ছুটে ছিটকে গিয়ে পড়ল পাশে শ্রাবণ প্রকাশনীর স্টল ঘেঁষে দাঁড়ানো এক নারী দর্শনার্থীর গায়ে। ছুটে গিয়ে ‘সরি’ বলে বই তুলে হাতে নিতেই মধ্য বয়সী ওই নারী অদ্রিকার হাত ধরে ফেললেন। বললেন ‘চমত্কার! এই তো চাই তোমাদের কাছ থেকে। এই তো বইমেলা সার্থক হলো! তোমাদের মতো নতুন প্রজন্ম যত বইমেলা মাতিয়ে রাখবে ততই তো দেশটা এগিয়ে যাবে নির্ভয়ে।

ঢাকার বাইরে থেকে আসা আরেক তরুণের উচ্ছ্বাসের দেখা মেলে অনন্যার স্টলে। সেখানে বসা কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের অটোগ্রাফ পাওয়ার পর খুলনার ছেলে রিয়াদুলের অভিব্যক্তি, ‘ছোট সময় থেকে ইমদাদুল হক মিলন নামটাই শুনেছি। এই প্রথম তাঁকে সরাসরি দেখলাম। আবার অটোগ্রাফও পেয়ে গেলাম। আজ যে কী আনন্দ লাগছে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ’

ঢাকায় হলেও এই বইমেলা যে সারা বাংলার মানুষের প্রাণের মেলা হয়ে আছে তা মনে করিয়ে দিলেন পটুয়াখালীর একটি কলেজের শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। বললেন, ‘আমরা যারা ঢাকার বাইরে থাকি তারা রাজধানীর বড় বড় অনেক আয়োজন থেকেই বঞ্চিত থেকে যাই। দূরত্বসহ নানা কারণে অনেক আয়োজনেই অংশ নেওয়া হয়ে ওঠে না। তবে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ব্যতিক্রম। বছর ধরেই অপেক্ষায় থাকি প্রাণের এই মেলার জন্য একবারের জন্য হলেও ঢাকায় ছুটে আসার। প্রাণ পড়ে থাকে এখানে। কত লেখক-সাহিত্যিকের সঙ্গে এখানে দেখা হয়, মিলনমেলায় সবাই মিলে যায়। এর চেয়ে আনন্দের আর কিছুই হতে পারে না। ’

এমন শত শত তরুণের সঙ্গে মেলায় পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ান সব বয়সের মানুষ। পহেলা বসন্ত আর ভালোবাসা দিবসের রেশ কাটিয়ে এখন মেলার রং মিলেছে একুশের দিকে। মেলার পাশেই চলছে একুশের নাট্যোৎসব। সেদিকেও ঘুরছে অনেকে। ভেতরে নতুন বই প্রকাশনা মঞ্চে প্রতিদিনের মতোই একে একে উঠছেন আর নামছেন নতুন লেখক ও অতিথিরা। স্টলগুলোয় নতুন বইয়ের খোঁজ তো আছেই।

শুধু কি গল্প, উপন্যাস বা ছড়া-কবিতার বই! যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তরুণ প্রকৌশলী সায়ন রায়ের অংকন চিত্রের একটি বই প্রকাশ হলো গতকাল। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য, ত্রপা মজুমদারসহ আরো কয়েকজন।

গতকাল মেলার ১৬তম দিনে আরো ২৮টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়েছে। তবে বাংলা একাডেমির জনসংযোগ ও সমন্বয় উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলায় মোট ১০২টি নতুন বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ১৩, উপন্যাস ১৬, প্রবন্ধ ৫, কবিতা ৩৮, ছড়া ২, শিশুসাহিত্য ৩, জীবনী ২, মুক্তিযুদ্ধ ৩, নাটক ১, বিজ্ঞান ১, ভ্রমণ ১, চিকিত্সা/স্বাস্থ্য ১, রম্য/ধাঁধা ১, অনুবাদ ২ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর ১৩টি বই।

গতকাল মেলায় আসা নতুন বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—হাসান আজিজুল হকের ‘ছোবল’, অন্যপ্রকাশ; হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘গদ্যের গন্ধ বকুল’ ও সালাহ্উদ্দীন আহমেদের ‘১৯ শতকে বাংলার সমাজ চিন্তা ও সমাজ বিবর্তন’, জার্নিম্যান বুকস; মহাদেব সাহার ‘আমার কবিতা গ্রাম’, মাওলা ব্রাদার্স; তপন পালিতের মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার আন্দোলন ১৯৭১-২০১৩, বাংলা একাডেমি; হুমায়ূন কবির ঢালির ‘আয় ফিরে যাই’, গ্রন্থকুটির; আহসান হাবীবের ‘কমিক্স অন্য পৃথিবী’, চন্দ্রদ্বীপ; মাসুদা ভাট্টির ‘মেয়েটি কখনো কোন কৃষককে ভালোবাসেনি’ ও অনন্ত হীরার ‘নাটক ত্রয়ী’, অনিন্দ্য প্রকাশ; মোরশেদ শফিউল হাসানের ‘গল্প সমগ্র’, অনুপম প্রকাশনী; আবুল কাশেম ফজলুল হকের ‘যুগল ক্রান্তি ও নীতি জিজ্ঞাসা’, ভাষা প্রকাশ; রেজাউল করিম খোকনের ‘বোম্বে কলকাতার ঝড় তোলা নায়িকারা’, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স; আফজাল হোসেনের ‘কোনো জোনাকি এ অন্ধকার চেনে না’, অনন্যা; মঈনুল খানের গোয়েন্দা কাহিনী ‘স্বর্ণ মানব’, অন্যপ্রকাশ উল্লেখযোগ্য।

মূলমঞ্চের আয়োজন : গতকাল গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘সত্তর দশকের কবিতা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি মুজিবুল হক কবীর। আলোচনায় অংশ নেন কবি ইকবাল হাসান ও ড. খালেদ হোসাইন। সভাপতিত্ব করেন কবি অসীম সাহা। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল সাইমন জাকারিয়ার পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ভাবনগর ফাউন্ডেশন’র শিল্পীদের পরিবেশনা। এ ছাড়া সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী মীনা বড়ুয়া, বুলবুল ইসলাম, ফারহানা ফেরদৌসী তানিয়া, শুভ্রা দেবনাথ, অভিলাষ দাস ও নিশি কাওসার।

আজকের অনুষ্ঠান : আজ শুক্রবার মেলার দরজা খুলবে সকাল ১১টায়। চলবে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলবে শিশুপ্রহর। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী। বিচারকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শিল্পী ইয়াকুব আলী খান, আবু বকর সিদ্দিক ও সাগরিকা জামালী। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। এ ছাড়া আজ শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার ফল ঘোষণা করা হবে।

বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘আশির দশকের কবিতা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কুমার চক্রবর্তী। আলোচনায় অংশ নেবেন ড. মাসুদুল হক ও ড. আমিনুর রহমান সুলতান।


মন্তব্য