kalerkantho


ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বৈঠক

দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ ছাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র?

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ ছাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র?

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অনুসরণ করা কয়েক দশকের নীতি থেকে সরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, শান্তি আনতে পারে এমন যেকোনো বিকল্প পরিকল্পনাকে সমর্থন করবেন তিনি। আর সেটা এক রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানও হতে পারে—এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন।

তাঁর এই মন্তব্যের পরপরই এক সতর্ক প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিন জানিয়েছে, ট্রাম্প সম্ভবত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিষয়ে তাঁর সমর্থন প্রত্যাহার করতে যাচ্ছেন। এ নিয়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘপ্রধানও। তিনি বলেছেন, দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কোনো বিকল্প নেই।

ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি আলোচনা ভেঙে পড়ে ২০১৪ সালে। এরপর কূটনৈতিকভাবে নানা জোড়াতালি দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কাজ হয়নি। এমন এক পরিস্থিতিতেই গত বুধবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাশে নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শান্তি বিষয়ে এমন গোলমেলে মন্তব্য করলেন ট্রাম্প। এর আগে হোয়াইট হাউসে ওই দুই নেতা বৈঠক সারেন। সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, তিনি এই সংকটের এক মহান সমাধান করতে চান। তবে দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ‘দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান হতে পারে; আবার এক রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানও হতে পরে। দুই পক্ষই যে সমাধান মেনে নেবে, আমি সেটাকেই সমর্থন করব। ’

এ ছাড়া ট্রাম্পকে যখন প্রশ্ন করা হয় যে তিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় মার্কিন দূতাবাসকে তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে আনতে চান—এ প্রসঙ্গে এখন তিনি কী ভাবছেন? জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তেমনটি দেখতে মুখিয়ে আছি আমি। আমরা খুবই চাইছি, এমনটি ঘটুক। বিশ্বাস করুন, আমরা খুবই যত্নের সঙ্গে বিষয়টি বাস্তবায়িত করতে চাই। ’

প্রসঙ্গত, জেরুজালেমকেই ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী করতে চায় ফিলিস্তিনিরা।

এ নিয়ে নেতানিয়াহুকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তিনি ‘পদার্থ’ দেখতে চান, শুধু ‘মোড়ক’ নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুটি পূর্বশর্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, ফিলিস্তিনিদের ইহুদি রাষ্ট্র স্বীকার করে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলকে জর্দান নদীর পশ্চিমের পুরো এলাকায় নিয়ন্ত্রণ দিতে রাজি থাকতে হবে। ’

প্রসঙ্গত, এলাকাভিত্তিক সমাধান ইসরায়েলের পুরনো চাওয়া। ট্রাম্প যা বলেছেন তাতে নতুন কোনো সমাধান সূত্র নেই। বরং তা ইসরায়েলের অতি দক্ষিণপন্থীদের খুশি করার একটা চেষ্টা মাত্র।

এই সংবাদ সম্মেলনের পরপরই জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলেন, দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধান নিশ্চিত করতে যার পক্ষে যা সম্ভব করুন। তিনি আরো বলেন, সংকট নিরসনের আর কোনো পথ খোলা নেই। ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা সংকটের একটি সমাধান হলো এই দুই রাষ্ট্র পদ্ধতি। কয়েক বছর ধরে ফিলিস্তিন, ইসরায়েলসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ সমাধানের পক্ষেই কথা বলেছে। তবে এ ক্ষেত্রে দুই পক্ষের শর্তই ভিন্ন। ১৯৬৭ সালের লড়াইয়ে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের যেসব এলাকা দখল করে সেগুলো থেকে তাদের সরে যাওয়ার দাবি জানায় ফিলিস্তিন। তাদের এই দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও সমর্থন রয়েছে। জাতিসংঘ, আরব লীগ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া এবং বুধবারের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রও নিয়মিত এই সমাধানের পক্ষেই গলা চড়িয়েছে।

এদিকে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, তিনি এখনো লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রত্যয়ী। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইসরায়েলের বসতি স্থাপন বন্ধের বিষয়ে সম্প্রতি যে মন্তব্য করেছেন তাও স্মরণ করেন। প্রসঙ্গত, ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এক মাসে ইসরায়েল পশ্চিম তীরে ছয় হাজারেরও বেশি নতুন বাড়ি নির্মাণের অনুমতি দেয়। এ স্থানেই ফিলিস্তিন তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বাড়ি অবৈধ।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কে এক ধরনের টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়। ট্রাম্প আসার পর, বিশেষ করে গত বুধবারের বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্ক আবারও দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে বলেই আশা করছে তেল আবিব। এই সংবাদ সম্মেলনের দুই নেতার কেউই একবারের জন্যও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথা বলেননি।

গত মাসে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এই সংকট সমাধানে একটি বহুজাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। ট্রাম্পের এই অবস্থানের বিষয়ে খানিকটা অসন্তোষই প্রকাশ করে তারা। জাতিসংঘে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ফ্রাংকোয়েস দেলেত্রে বলেন, ‘অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিষয়ে আমরা দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। ’

ট্রাম্পের এ অবস্থানে স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েল অতি আনন্দিত। দেশটির কট্টর দক্ষিণপন্থী শিক্ষামন্ত্রী নাফতালি নেনেত বলেন, ‘সময় এসেছে ফিলিস্তিনের পতাকা নামিয়ে ইসরায়েলের পতাকা তোলার। ’ দেশটির বিজ্ঞানমন্ত্রী বলেন, ‘এর মধ্যে দিয়েই ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে ফিলিস্তিন সন্ত্রাসী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতি ঘটল। ’

ইসরায়েলের উচ্ছ্বাসের ঠিক বিপরীত চিত্রটি দেখা গেছে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে। প্রেসিডেন্ট আব্বাসের বিশেষ উপদেষ্টা হোসাম জমলত বলেন, ‘ট্রাম্প বলেছেন তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান। আমরা তাঁর এই চাওয়াকেই জোর দিতে চাই। আর ইসরায়েল প্রকৃতপক্ষে একটি বর্ণবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারা করছে। ’ হতাশ ফিলিস্তিনি বিশ্লেষকরাও। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিহাদ হার্ব বলেন, ফিলিস্তিন নেতৃত্বের দুর্বলতাই এ সংকটের প্রধান কারণ। তারা এক মাসের মধ্যেও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারেনি। ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই তৈরি হয়নি।   

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিকল্প নেই : আরব লীগপ্রধান আহমেদ আবুল ঘেইত গতকাল বলেন, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ছাড়া ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের আর কোনো সমাধান নেই। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সংকটের সমাধান করতে হবে সমন্বিত, শান্তিভিত্তিক এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

বিশ্ব শান্তির সবচেয়ে বড় হুমকি ইসরায়েল : ইরান গতকাল বলেছে, বিশ্ব ও আঞ্চলিক শান্তির পক্ষে সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্রগুলো। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম ঘাসেমির বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ এ কথা জানায়। হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনে ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরি বন্ধ করতে অনেক বেশি তত্পর হবেন। তাঁর এই মন্তব্য ‘বোকামি’ বলে বাতিল করে দেন ঘাসেমি। সূত্র : বিবিসি, এএফপি, সিএনএন।


মন্তব্য