kalerkantho

সোমবার । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৮ ফাল্গুন ১৪২৩। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাঁশবাড়ী বস্তি ভস্মীভূত

৮ যুবক মোটরসাইকেলে এসে আগুন দেয়!

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



৮ যুবক মোটরসাইকেলে এসে আগুন দেয়!

মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ী বস্তিতে আগুনে নিঃস্ব হয়েছে কয়েক শ পরিবার। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাতের শেষ প্রহরে সবাই যখন ঘুমিয়ে তখনই হঠাৎ আগুন লাগে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ী বস্তিতে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়া আগুনে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে এক কাপড়েই ঘর থেকে বেরিয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে বস্তির লোকজন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে যখন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় ততক্ষণে পুড়ে ছাই বস্তির আড়াই শর মতো ঘর। তবে আগুনে কেউ মারা যায়নি। আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিস কিছু বলতে না পারলেও বস্তিবাসীর অভিযোগ, নাশকতার উদ্দেশ্যেই আগুন লাগানো হয়েছে। কারো কারো সন্দেহ, এ ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের হাত থাকতে পারে। বস্তির কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, রাত সোয়া ৩টার দিকে চারটি মোটরসাইকেলে করে শিয়া মসজিদসংলগ্ন ওই বস্তিতে যায় আট যুবক। তাদের মধ্যে দুজন মনি বেগমের সড়ক লাগোয়া ঘরে কিছু একটা ছিটিয়ে দেয়। এরপর ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন লাগিয়ে দ্রুত তারা সটকে পড়ে। মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

এক ব্যক্তি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগুন লাগার ১০ মিনিট কি পাঁচ মিনিট আগে ৮-১০ জন লোককে বোরকা পরে যেখানে আগুন লেগেছে সেখান থেকে বের হতে দেখা গেছে। ’ আরেকজন বলেন, ‘দুজন মুখোশ পরে আগুন দিছে। ’

আগুন নেভাতে গিয়ে বস্তির কয়েকজন আহত হয়েছে। গতকাল সকালে বস্তিতে গিয়ে দেখা গেছে, স্বল্প আয়ের অন্তত আড়াই শ পরিবারের সহস্রাধিক মানুষ খোলা আকাশের নিচে। তাদের কেউ রিকশাচালক, কেউ শ্রমিক, কেউ গার্মেন্টকর্মী, কেউ ছোট দোকানদার। একটি কুকুর মরে পড়ে আছে। পোড়া বস্তিতে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অনেকেই মাথায় হাত দিয়ে বসা। পাশেই ক্যাম্প বসিয়ে ত্রাণের জন্য মাইকিং করছিলেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজিব ও তাঁর লোকজন। সেখানে স্থানীয় যুবলীগের নেতাকর্মীরাও ছিল। দুপুরে এক ক্যাম্প থেকে বস্তিবাসীর জন্য খিচুড়ির ব্যবস্থা করা হয়। জানতে চাইলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই বস্তিটি দখল করার পাঁয়তারা চলছে। স্থানীয় কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে অস্ত্রধারীরা প্রায়ই বস্তির লোকজনকে হুমকি দিত। প্রভাবশালীদের কেউ কেউ বস্তিতে মাদক ব্যবসাও করত। এ নিয়ে এর আগে বস্তিতে খুনোখুনিও হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মাসুদুর রহমান আকন্দ বলেন, আগুন লাগার খবর পেয়ে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করে। তবে কিভাবে আগুনের সূত্রপাত তা এখনো জানা যায়নি। ঘটনার তদন্ত চলছে।

বস্তির বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, বাঁশবাড়ী বস্তিতে ৩০ বছর ধরে পরিবার নিয়ে বাস করছেন তিনি। বস্তির বয়স কমপক্ষে ৪০ বছর। এ নিয়ে চারবার এই বস্তিতে আগুন লাগল। সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আগুন লেগে পুরো বস্তি পুড়ে গিয়েছিল।

বস্তির ৩২টি ঘরের মালিক মনি বেগম বলেন, গত রাতে তিনি বস্তিতে ছিলেন না। প্রতিবেশীদের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, তাঁর একটি ঘর থেকেই আগুন লেগেছে। তিনি বলেন, ‘কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। বস্তির জমি দখলের পাঁয়তারা অনেক আগে থেকেই। ’

প্রত্যক্ষদর্শী মিনু বেগম বলেন, ‘এই বস্তিতে আড়াই শতাধিক ঘর আছিল। দোতলা ও তিনতলা ঘরগুলো কাঠ ও টিন দিয়ে তৈরি। ’ বস্তির অপর বাসিন্দা শাহজাহান বলেন, ‘প্রথমে মনি বেগমের ঘর থেকেই আগুন লাগে। তার ঘরে গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। তবে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস দেরি করে আসায় ক্ষতি বেশি হয়েছে। ’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, এই বস্তির জমির প্রকৃত মালিক কে তা নিয়ে নানা জনের নান মত আছে। কেউ বলে, এই জমির মালিক লাট মিয়া। এই লাট মিয়া একসময় মোহাম্মদপুর এলাকার জমিদার ছিলেন। এলাকার অর্ধেক জমিই তাঁর পরিবারের ছিল। পরে অনেক জমি বেদখল হয়ে গেছে। বর্তমানে বাঁশবাড়ী জমির মালিকানা দাবি করে দখলে আছেন মোহাম্মদ আলম নামের একজন।


মন্তব্য