kalerkantho


বিএমএ নেতার কাণ্ডজ্ঞান

চিকিৎসা অবহেলায় অপ্রীতিকর ঘটনার দায় গণমাধ্যমের!

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



চিকিৎসা অবহেলায় অপ্রীতিকর ঘটনার দায় গণমাধ্যমের!

ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু কিংবা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে রোগীর সংক্ষুব্ধ স্বজনদের হাসপাতাল ভাঙচুর বা চিকিৎসকদের ওপর হামলার জন্য চিকিৎসকরা দুষলেন সাংবাদিকদের। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সামনেই বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) এক নেতা সরাসরি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেন।

এতে উপস্থিত সাংবাদিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং বিএমএ ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতারা দুঃখ প্রকাশ করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে গতকাল বুধবার বিকেলে বিএমএ, স্বাচিপ ও সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভায় এ ঘটনা ঘটে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসক-কর্মচারীদের অপ্রীতিকর ঘটনা এবং হামলা-ভাঙচুরের প্রসঙ্গ তুলে বক্তব্য দেন। মন্ত্রী বলেন, ‘জেনেশুনে কোনো চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসা বা দায়িত্বে অবহেলার কারণে কোনো রোগীর ক্ষতি হলে ওই রোগী বা স্বজনরা বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) যেতে পারেন। এর ভিত্তিতে ওই কাউন্সিল তদন্ত সাপেক্ষে দায়ী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু রোগীর স্বজনদের তাত্ক্ষণিক আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা হামলা-ভাঙচুরের মতো ঘটনা কাম্য হতে পারে না। ’

একই সঙ্গে মন্ত্রী চিকিৎসকদেরও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘কোনো ঘটনা ঘটলেই চিকিৎসক-কর্মচারীরা যেভাবে পুরো হাসপাতালের রোগীদের জিম্মি করে ধর্মঘট ডেকে বসেন তাও চলতে পারে না। আমি কখনোই এটা সমর্থন করি না।

এ ধরনের তত্পরতা বন্ধ করতে হবে। ’

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘এমন ঘটনায় গণমাধ্যমের উচিত হবে মানুষকে সচেতন করে তোলা; যাতে মানুষ যদি মনে করে কোনো রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাঁরা যেন হামলা-ভাঙচুরের মতো পরিস্থিতি তৈরি না করে বরং আইনের কাছে যান। আর এ জন্য নতুন করে চিকিৎসক ও রোগী—উভয়ের সুরক্ষায় স্বাস্থ্যসেবা আইন প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। ’ তিনি বলেন, আইনের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। অল্প দিনের মধ্যেই হয়তো বাকি প্রক্রিয়া শেষ করে এটি আইনে রূপ নেবে।

মন্ত্রীর বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে একজন জানতে চান—স্বাধীনতার পর থেকে মাত্র একজন চিকিৎসক ছাড়া বিএমডিসি এখন পর্যন্ত আর কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে কি না? এ ছাড়া এমন ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনগুলোও সব প্রকাশ পেয়েছে কি না?

আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, দুর্ঘটনায় আহত ফটো সাংবাদিক জিয়ার (প্রথম আলোর প্রধান ফটো সাংবাদিক জিয়া ইসলাম) মাথার খুলির একটি অংশ রেখে দিয়েই তাঁকে বিদেশে পাঠানোর ঘটনা ঘটে দেশের একটি বড় বেসরকারি হাসপাতালে—এ ঘটনায় ওই হাসপাতাল বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?

আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, সম্প্রতি একজন চিকিৎসকের মৃত্যুর পর খোদ বিএমএর পক্ষ থেকেই অভিযোগ করা হয়েছে আরেক চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় এ মৃত্যু ঘটেছে। ফলে ওই ঘটনার কোনো সুরাহা হয়েছে কি? আর কোনো সংক্ষুব্ধ রোগী বা তাঁর স্বজনরা গণমাধ্যমের কাছে যদি ভুল চিকিৎসা কিংবা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করেন তা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার করলেই চিকিৎসকরা ক্ষুব্ধ হন কেন?

এসব প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী কেবল বলেন, বিএমডিসি আগে তেমন শক্তিশালী ছিল না; কিন্তু এখন এই প্রতিষ্ঠান অনেক শক্তিশালী ও কার্যকর।

বাকি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য মন্ত্রী উপস্থিত চিকিৎসক নেতাদের আহ্বান জানালে প্রথমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও বিএমএর সাবেক মহাসচিব অধ্যাপক ডা. সারফুদ্দিন আহম্মেদ বলেন, কেবল একজন নয়, বিভিন্ন অভিযোগে ইতিমধ্যে ১৫ জন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বিএমডিসি। আবার অনেক চিকিৎসককে কারাগারেও যেতে হয়েছে। কিন্তু যেভাবে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করা হয় বা পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পায় তা ঠিক নয়। কারণ চিকিৎসা আদৌ ভুল হয়েছে কি না—সেটা তাত্ক্ষণিক ঠিক করা যায় না, এ জন্য বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের তদন্ত বা পর্যবেক্ষণ দরকার। এ ক্ষেত্রে একটি বিশেষজ্ঞ দল তৈরি করলে পরিস্থিতি অনেকটা কেটে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

একই সঙ্গে ডা. সারফুদ্দিন আহম্মেদ সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর খবর প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে আরেকটু সতর্ক থাকবেন। কারণ এ ধরনের খবর থেকেও অনেকে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে উৎসাহিত হতে পারে। ’

ডা. সারফুদ্দিন আহম্মেদের বক্তব্যের পর পরই কথা বলতে শুরু করেন বিএমএ সহসভাপতি ও জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আমরা বিশেষজ্ঞ, আপনারা নন। তাই চিকিৎসা ভুল না শুদ্ধ, তা বলার আপনারা কে? আপনাদের জন্যই এসব ঘটনা ঘটছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘মাথার খুলি রেখে দেওয়া ভুল হয়েছে কি না, আপনারা কিভাবে বুঝলেন? খুলি রেখেই দিতে হয়; যা কখনো পেটের মধ্যে রেখে দেওয়া যায় আবার কখনো কোনো পাত্রে সংরক্ষণ করতে হয়। ’

ডা. কাজী শহিদুল ইসলামের এ আচরণের প্রতিবাদ জানান উপস্থিত সাংবাদিকরা। তাতে ডা. কাজী শহিদুল ইসলাম আরো উত্তেজিত হয়ে উঠলে মন্ত্রী, বিএমএ ও স্বাচিপ নেতাদের হস্তক্ষেপে তিনি শান্ত হন। সেই সঙ্গে বিএমএ ও স্বাচিপ নেতারা উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

মন্ত্রী পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের অংশ শেষ করে বিএমএ ও স্বাচিপ নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।


মন্তব্য