kalerkantho


লেখকের সেরা বই

শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ১

রিজিয়া রহমান

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ১

‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’ শিরোনামে আমার আটটি উপন্যাস দুই খণ্ডে সংকলিত হলো। একজন লেখকের পক্ষে তাঁর লিখিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপের বিষয়টি বেশ জটিল। দায়িত্বটি পাঠকের ওপর ছেড়ে দেওয়াই যথাযথ ছিল। তবু পূর্বকথনের কিছু দায় লেখকের থেকেই যায়।

সংকলিত উপন্যাসগুলো পাঠকপ্রিয়তার নিরিখেই নির্বাচিত করা হয়েছে। হয়তো শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করতে পারে আমার এমন আরো কিছু উপন্যাস রয়ে গেল এর বাইরে। অনেক পাঠকই প্রশ্ন তুলতে পারেন, ‘বং থেকে বাংলা’, ‘অলিখিত উপাখ্যান’, আবে রওয়াঁ’ বা ‘সীতা পাহাড়ে আগুন’ কিংবা ‘আলবুর্জের বাজ’ কেন এই সংকলনে স্থান পেল না?

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর এ ব্যাপারে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে কথা বলি। তারা আমার রচনাসমগ্র প্রকাশে উৎসাহী হয়। আমিই তখন তাদের ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’ প্রকাশের পরিকল্পনাটি জানাই। এটাই আমার ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’ প্রকাশের গোড়ার কথা।

এই ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’ প্রকাশই কিন্তু আমার বই প্রকাশের শেষ কথা নয়।

যেহেতু আমার উপন্যাসের বিষয়গুলো বহুবিস্তৃত, সেই কারণেই বাকি উপন্যাসগুলোকে বিষয়ভিত্তিক ভাগ করে প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেমন : ১. মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস, ২. ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক উপন্যাস, ৩. প্রেমের উপন্যাস, ৪. সামাজিক ও রাজনৈতিক উপন্যাস। এরপর রয়েছে পাঁচটি গল্প সংকলনের দুই খণ্ড ও আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা, শিশুসাহিত্য এবং নিবন্ধ, প্রবন্ধ ও কলামের একত্রিত খণ্ডগুলো। ক্রমান্বয়ে একে একে পাঠকদের কাছে এগুলো পৌঁছে দেওয়ার আশা রয়েছে। পাঠকদের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা ও সংরক্ষণের সুবিধার কথা ভেবেই ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’কে দুটি খণ্ডে প্রকাশের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

প্রথম খণ্ডটিতে রয়েছে : ১. ঘর ভাঙা ঘর, ২. শিলায় শিলায় আগুন, ৩. সূর্য-সবুজ রক্ত ও ৪. রক্তের অক্ষর।

এর মধ্যে ‘ঘর ভাঙা ঘর’ আমার প্রথম উপন্যাস, ষাটের দশকের শেষে লেখা। বাকি উপন্যাস তিনটি সত্তরের দশকের শেষ পর্যায়ে এসে লিখেছি।

১৯৬৭ সালে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী তখনই হঠাৎ ঢাকায় সদ্য গড়ে ওঠা বস্তির মানুষের জীবন নিয়ে লিখতে শুরু করি ‘ঘর ভাঙা ঘর’। পাকিস্তানি সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের শাসনের তখন ১০ বছর পূর্তি হতে চলেছে। মহা ধুমধাম আয়োজনে চলছে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব শাসনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দশক উদ্যাপন।

ষাটের দশকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফিরে আমি যে পাড়ায় থাকতাম, সেখানেও একটি বস্তি ছিল। রাস্তায় যাওয়া-আসার সময় দেখতাম বস্তিবাসী মানুষের জীবন। বস্তির অনেকের সঙ্গে ভালো পরিচয় গড়ে উঠেছিল। তাদের অনেকেই আসত আমার বাসায়। সুখ-দুঃখের কথা, অতীত ও বর্তমান নিয়ে গল্প করত, ভবিষ্যৎ নিয়ে যে স্বপ্ন ছিল তাদের সেটাও বলত আমাকে। তাদের এই স্বপ্ন নিয়েই আমার প্রথম উপন্যাস ‘ঘর ভাঙা ঘর’ লিখতে শুরু করি। উন্মূল মানুষের জীবনসংগ্রাম আর তাদের লালিত স্বপ্ন নিয়েই লেখা আমার ‘ঘর ভাঙা ঘর’ উপন্যাস।

এই সংকলনটির দ্বিতীয় উপন্যাস ‘শিলায় শিলায় আগুন’। উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ। ‘কালাতের যুদ্ধ’ ও বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ। বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রথম বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়েই লিখেছি ‘শিলায় শিলায় আগুন’।

‘শিলায় শিলায় আগুন’ উপন্যাস প্রকাশের এক বছর পরই বাংলাদেশের চা বাগানের মানুষদের সুখ-দুঃখের জীবন নিয়ে লিখেছি ‘সূর্য সবুজ রক্ত’ উপন্যাসটি। চা বাগানের মানুষদের জীবন নিয়ে খুব কম উপন্যাসই আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে লেখা হয়েছে। ভারতের খ্যাতনামা লেখক মুল্ক রাজ আনন্দ একসময় ইংরেজি ভাষায় লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘টু লিভস অ্যান্ড এ বাড’ (দুটি পাতা, একটি কুঁড়ি)। এরপর বাংলাদেশের অজয় ভট্টাচার্য লিখেছেন ‘কুলি মেম’। পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লেখক দেবেশ রায় তাঁর একটি উপন্যাসে উত্তরবঙ্গের (ভারতের) চা বাগানকে পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া বাংলা সাহিত্যে চায়ের ভুবন উল্লেখযোগ্যভাবে উপস্থাপিত হয়নি। ‘সূর্য সবুজ রক্ত’-এ চা-সম্পৃক্ত জীবনের সামগ্রিক একটি চিত্র তুলে আনতে চেষ্টা করেছি।

‘রক্তের অক্ষর’ আমার উপন্যাসগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তম। উপন্যাসটি ১৯৭৭ সালে ঈদ সংখ্যা ‘বিচিত্রা’য় প্রথম প্রকাশিত হয়। বই আকারে মুক্তধারা প্রকাশ করে ১৯৭৮ সালে। ‘রক্তের অক্ষর’ উপন্যাস আমার জন্য প্রচুর খ্যাতি বয়ে আনে। সম্ভবত বিষয়বস্তুই রক্তের অক্ষরের অভাবনীয় জনপ্রিয়তার কারণ। পতিতাপল্লীর নারীদের নিয়ে উপন্যাস লেখা সে সময়ে বেশ দুরূহই ছিল। বিশেষ করে আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে একজন মহিলা যদি এমন উপন্যাস লেখেন, তবে সেটা অবশ্যই ব্যতিক্রমী ঘটনা। অভিশপ্ত জগতে অপমান, লাঞ্ছনা, নির্যাতন ও নির্মমতা সয়ে শুধু দেহসর্বস্ব প্রাণী হয়ে যারা নিরুপায় জীবন যাপন করে তাদের কথাই আমি রক্তের অক্ষরে লিখেছি। মানবাধিকারের এমন নির্লজ্জ উদগ্র লঙ্ঘন, বিবেকসম্পন্ন মানুষকে বিচলিত করেছিল বলেই সম্ভবত তারা ‘রক্তের অক্ষর’কে আমার শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।

এই খণ্ডের অন্তর্ভুক্ত উপন্যাসগুলো প্রবহমান সময়কে ধারণ করতে পেরেছে বলে আমি মনে করি। পরিবর্তনশীল পৃথিবীর পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক বিবর্তনকে উপলব্ধি করতে সম্ভবত পাঠকের অসুবিধা হবে না। সময়ের প্রয়োজনই সৃষ্টি করে দেয় সাহিত্যের ভাষা, আঙ্গিক ও প্রকরণের বিভিন্নতা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের মানুষের জীবন ও সমাজকে বিবর্তিত বাস্তবতার নিরিখে সাহিত্যের অঙ্গনে তুলে আনতে আমার উপন্যাস কতটা সার্থক হয়েছে, সেটা পাঠকেরই বিবেচ্য বিষয়। শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ১ ও ২ বের করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, প্রচ্ছদ করেছে ধ্রুব এষ, মূল্য প্রতি খণ্ড ৬৫০ টাকা।


মন্তব্য