kalerkantho


মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে নয়, জেলে যেতে হচ্ছে শশিকলাকে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে নয়, জেলে যেতে হচ্ছে শশিকলাকে

মুখ্যমন্ত্রী হতে পথের কাঁটা প্রায় সরিয়ে ফেলেছিলেন। দলের কর্তৃত্বও অনেকখানি হাতে নিয়ে নেন।

কিন্তু তীরে এসে তরি ডুবল ভারতের তামিলনাডু রাজ্যের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ভি কে শশিকলার। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সাধ তাঁর আর পূর্ণ হলো না। দুর্নীতির দায় নিয়ে তাঁকে এখন জেলে যেতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দুর্নীতির জন্য দোষী সাব্যস্ত করে শশিকলাসহ তিনজনকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ফলে আগামী ১০ বছর তিনি কোনো নির্বাচনেও দাঁড়াতে পারবেন না। মুখ্যমন্ত্রী হতে তাঁর মরিয়া চেষ্টায় সম্প্রতি ভারত তথা উপমহাদেশে ফের আলোচিত হয়ে ওঠেন শশিকলা।

২০ বছর আগের দুর্নীতির একটি মামলায় ২০১৪ সালে জয়ললিতা ও শশিকলাসহ চারজনকে কারাদণ্ড ও বিপুল পরিমাণ অর্থদণ্ড দিয়েছিলেন নিম্ন আদালত। মাঝে হাইকোর্টে সাজা বাতিল হলেও গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট সেই নিম্ন আদালতের রায়ই পুনর্বহাল করলেন। এর মধ্য দিয়ে সেই আশঙ্কা সত্য হলো, বেঁচে থাকলে জয়ললিতাকেও জেলে যেতে হতো।

গতকালের রাসে সে ইঙ্গিতও রয়েছে।

গত ডিসেম্বরে জয়ললিতার মৃত্যুর পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া পনির সেলভামকে সরিয়ে নিজেই মুখ্যমন্ত্রী হতে যে নাটক শুরু করেছিলেন শলিকলা, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের মধ্য দিয়ে এরও অবসান ঘটল। দলের কর্তৃত্ব নিতে এরই মধ্যে তিনি এআইএডিএমকের সাধারণ সম্পাদকও হয়েছিলেন। তবে রায় ঘোষণার পর দল থেকে তড়িঘড়ি করে পনির সেলভামসহ ২০ জনকে বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে নতুন নাটকেরও জন্ম দিয়েছেন। একসময়ের ভিডিও পার্লারের মালিক শশিকলা মুখ্যমন্ত্রী হলে যে রূপকথার জন্ম নিত, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এরও অবসান ঘটল।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারক আলাদাভাবে এই মামলার রায় দেন। দুই বিচারকই অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে শশিকলাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। সুপ্রিম কোর্ট আদেশে শশিকলাকে পার্শ্ববর্তী রাজ্য কর্ণাটক কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পি সি ঘোষ এ রায় বলেন, ‘আমরা কর্ণাটক হাইকোর্টের রায় বাতিল এবং বিচারিক আদালতের রায় পুনর্বহাল করলাম। ’

১৯৯৬ সালে তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার বিরুদ্ধে তত্কালীন জনতা দলের নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী এই মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর হিসাববহির্ভূত সম্পত্তির পরিমাণ ৬৬ দশমিক ৬৫ কোটি টাকা। সেই মামলায় নানা টানাপড়েনের পর ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জয়ললিতা, তাঁর পালিতপুত্র সুধাকরণ, ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ভি কে শশিকলা এবং আত্মীয়া ইলাবরসিকে চার বছরের কারাবাসের সাজা দেন বেঙ্গালুরুর বিশেষ আদালত।

২১ দিন জেলে থাকার পর ওই বছরের ১৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে জয়ললিতাসহ বাকিদের জামিন মঞ্জুর হয়। জেল থেকে ছাড়া পান তাঁরা। পরের বছর ১১ মে কর্ণাটক হাইকোর্ট তাঁদের বেকসুর খালাস করে দেন। কিন্তু গতকাল নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখলেন সুপ্রিম কোর্ট।

ভারতের আইন অনুযায়ী দুর্নীতির মামলায় কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে সাজা ভোগ শেষে পরবর্তী ছয় বছরের মধ্যে তিনি কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে চার বছরের কারাভোগ এবং কারাভোগ শেষে আরো ছয় বছর মিলিয়ে আগামী ১০ বছর কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না ৫৯ বছর বয়সী শশিকলা। রায় প্রকাশের পর তিনি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘ধর্মের জয় হবে। ’

এ মামলাটি মূলত তামিলনাড়ুর চার মেয়াদের মুখ্যমন্ত্রী জয়ারাম জয়ললিতার বিরুদ্ধে ছিল। তাঁর সহযোগী হিসেবে মামলায় শশিকলাদের নাম ছিল। নিম্ন আদালতের রায়ে তাঁদের প্রত্যেকের পাঁচ বছরের সাজা হয়েছিল এবং জয়ললিতাকে ১০০ কোটি রুপি ও শশিকলাসহ বাকি তিনজনকে ১০ কোটি রুপি করে জরিমানা করা হয়েছিল। গতকালের রায়ে এই অর্থদণ্ডের সাজা বহাল রয়েছে। এখন ১০০ কোটি রুপি জরিমানা আদায় করতে জয়ললিতার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে সরকার।

জয়ললিতার ভূমিকা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট : গতকালের রায়ে সরাসরি জয়ললিতার বিরুদ্ধে বেশ কিছু কড়া বক্তব্য শুনিয়েছেন শীর্ষ আদালত। আদালত বলেন, জয়ললিতা, শশিকলা ও বাকি দুজন এই ষড়যন্ত্রে (দুর্নীতির চক্রান্ত) অংশ নেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে জয়ললিতা আয়বহির্ভূত সম্পত্তির দখল নেন এবং বাকি তিনজনের সঙ্গে তা ভাগ করে নেন। জয়ললিতার অ্যাকাউন্ট থেকে শশিকলার অ্যাকাউন্টে যেভাবে টাকা গেছে তাতে পরিষ্কার, চার অভিযুক্ত একসঙ্গে মিলেই কাজ করেছেন। সুপ্রিম কোর্ট বলেন, ‘বিক্রেতাদের চাপ দিয়ে সব অভিযুক্তই বাজারদরের থেকে কমে সম্পত্তি কিনেছেন। জয়ললিতার বাড়িতে এসব সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। তাঁর পোয়েজ গার্ডেনের বাড়ি থেকে যে ১২টি কম্পানি চালানো হতো, জয়ললিতা তা জানতেন না বলেছেন। এটা মেনে নেওয়া যায় না। ’

গতকাল রায় ঘোষণাকালে সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত ছিলেন না শশিকলা। আদালতে যখন রায় ঘোষণা করা হয়, তখন তিনি চেন্নাইয়ের শহরতলির সমুদ্রতীরবর্তী একটি অবকাশকেন্দ্রে ছিলেন। সেখানে এআইএডিএমকের ১২০ জন বিধায়ককে নিয়ে একটি অবকাশকেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন।

জয়ললিতার মৃত্যুর পর তাঁর একান্ত অনুগত পনির সেলভাম মুখ্যমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। কিন্তু জয়ললিতার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী শশিকলা পনির সেলভামকে সরিয়ে নিজে মুখ্যমন্ত্রী হতে চান। দলীয় চাপে পনির সেলভাম প্রথমে পদত্যাগ করলেও পরে ভোটাভুটি দিতে রাজ্যপালের কাছে আবেদন করেন। এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট শিগগিরই এই মামলার পর্যবেক্ষণ জানাবেন বলে ঘোষণা দিলে রাজ্যপাল ধীর চলো নীতিতে অগ্রসর হন।


মন্তব্য