kalerkantho


নীতিমালার খসড়া তৈরি

ই-বাণিজ্যে বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না

আবুল কাশেম   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ই-বাণিজ্যে বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না

অনলাইননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। ক্ষুদ্র পণ্য থেকে দামি পোশাক, যন্ত্রপাতি—সব কিছুই মিলছে অনলাইনে।

ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোর ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীরা এ পদ্ধতির কেনাকাটায় ঝুঁকছে। ফলে ই-বাণিজ্য নামে পরিচিত ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তৃতি ঘটছে বাংলাদেশে। বাড়ছে বিনিয়োগও। তবে সরকারের কোনো নীতিমালা না থাকায় ডিজিটাল বাণিজ্যে সহজলভ্য হয়ে উঠছে নিষিদ্ধ নানা পণ্য, এমনকি সেবাও। ইন্টারনেটে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন দিয়ে ঠকানো হচ্ছে ক্রেতাদের। এ ধরনের প্রতারণা রোধ ও বিনিয়োগে দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য অফুরান সুযোগ রেখে ‘জাতীয় ই-বাণিজ্য নীতিমালা’র খসড়া তৈরি করেছে সরকার।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তৈরি খসড়ায় বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অনলাইনভিত্তিক কেনাকাটা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। দেশের ই-বাণিজ্যের ক্রেতার ৮০ শতাংশ ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের। আর মোট ক্রেতার ৩৫ শতাংশ ঢাকার, ২৯ শতাংশ চট্টগ্রামের এবং ১৫ শতাংশ গাজীপুরের।

নারায়ণগঞ্জ ও সিলেটেও উল্লেখযোগ্য ক্রেতা রয়েছে। ই-বাণিজ্য ব্যবহারকারীদের ৭৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে।

বিকাশমান এ খাতকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডাব্লিউটিও) ও ই-বাণিজ্য বিষয়ে বিভিন্ন দেশের জারি করা নির্দেশনা এবং বাংলাদেশে প্রচলিত বিভিন্ন নীতিমালা, আইন ও পরিকল্পনার আলোকে নতুন খসড়াটি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারকের নিজস্ব ওয়েবসাইট, প্রথাগত বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত দোকান, শ্রেণিবদ্ধ ওয়েবসাইট, বিদেশি ই-বাণিজ্য কম্পানির মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান, মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কম্পানি, মোবাইল অপারেটর ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, ট্রেড লাইসেন্স ও চূড়ান্ত ডিজিটাল প্রক্রিয়াবিহীন ফেসবুক পেজ ই-বাণিজ্য স্বত্ব হিসেবে বিবেচিত হবে না। এ খাতের সব কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত কম্পানিগুলোর প্রফাইল-সংবলিত একটি জাতীয় ই-বাণিজ্য পোর্টাল চালু এবং এর যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। ডিজিটাল বাণিজ্যে লেনদেন সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে আইনি কাঠামোও গড়ে তোলা হবে।

অনলাইন বাণিজ্যে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের অফুরন্ত সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এর জন্য ‘বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আইন-১৯৮০ (প্রচার ও সুরক্ষা) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ প্রবিধান ১৯৮৯’-এর বিধিবিধান প্রয়োগ করা হবে। এসব আইনের আওতায় ই-বাণিজ্য খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একক মালিকানায় কোনো কম্পানি গড়ে তুলতে পারবে না।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মুহম্মদ মেহেদী হাসান স্বাক্ষরিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিদেশি মালিকানা ৪৯ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকলে ওই কম্পানি পরিচালনাসহ সব বিষয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। বিদেশি কম্পানি যাতে দেশীয় কম্পানির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ ব্যতীত এককভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে না পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নীতিমালায় রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ই-ভিসা দেওয়া হবে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, আইসিটি খাতে বিনিয়োগে কর অবকাশ ও অব্যাহতি সুবিধা থাকবে। এ খাতের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয়জনিত ভয় দূর করতে নিরাপদ ও আস্থাজনক পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। সারা দেশের মানুষকে ডিজিটাল বাণিজ্যে সম্পৃক্ত করতে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে একটি করে সাইবার ক্যাফে স্থাপন করবে সরকার। আর ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে আইসিটিভিত্তিক হেল্পডেস্কের আদলে একটি করে ই-বাণিজ্য হেল্পডেস্ক থাকবে। গ্রাম ও মফস্বলের কারিগরদের জন্য ওয়েব, ফেসবুক ও মোবাইল অ্যাপসভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা হবে।

ই-বাণিজ্য প্রসারে দেশের সব শোরুমধারী কম্পানিকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি অনলাইন খাতে বাধ্যতামূলকভাবে সম্পৃক্ত করা হবে। শুরুতে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের কম্পানিগুলো এর আওতায় আসবে। পরে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তা কার্যকর হবে। ই-বাণিজ্যের মাধ্যমে রপ্তানি করলে উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা বাড়ানো হবে এবং বিনা জামানতে এলসি ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মুহম্মদ মেহেদী হাসান জানান, খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, ই-বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয় এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিভিন্ন ঝুঁকি চিহ্নিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি রিস্ক ফ্যাক্টরস ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করা হবে। সাইবার অপরাধ, সাইবার পাইরেসি, হ্যাকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ, ব্যবস্থাপনা ও তদারকির জন্য জাতীয় সাইবার ক্রাইম নীতিমালার আওতায় টেকসই মেকানিজম প্রণয়ন এবং সাইবার অপরাধ তদন্তে পুলিশের বিশেষ ইউনিট গঠন করা হবে। সাইবার অপরাধ ও মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গঠন করা হবে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল।

ই-বাণিজ্যে পণ্যের নির্দিষ্ট বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এফবিসিসিআই। ডিজিটাল মার্কেটিং ব্যবসা পরিচালনায় বাণিজ্যিক লাইসেন্স ও সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক হবে। আর বিজ্ঞাপনের বিল ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।

 


মন্তব্য