kalerkantho


সাগরে সাড়ে ১১ লাখ টন আমদানি পণ্য আটকা

আসিফ সিদ্দিকী চট্টগ্রাম   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সাগরে সাড়ে ১১ লাখ টন আমদানি পণ্য আটকা

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া এলাকায় ৩২টি বড় জাহাজে সাড়ে ১১ লাখ টন আমদানি পণ্য আটকা পড়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে আমদানীকৃত গম, অপরিশোধিত চিনি, কয়লা ও সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল রয়েছে। লাইটার জাহাজ শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে তৃতীয় দিনেও এসব জাহাজ পণ্য খালাস করতে পারেনি।

আমদানিকারকরা অভিযোগ করেছেন, লাইটার বা ছোট জাহাজ ধর্মঘট নিরসনে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। নির্বাচনের কারণে জাহাজ মালিকরা যেখানে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় চেয়েছেন সেখানে নতুন করে তো আলোচনা করে দিনের পর দিন সময়ক্ষেপণের কোনো যুক্তি নেই। এতে করে পণ্য নামানো ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আর এতে করে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এ কে এম শামসুজ্জামান রাসেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক দিন বাড়তি বসে থাকা মানে প্রতি জাহাজে ৮ থেকে ১০ হাজার মার্কিন ডলার আর্থিক ক্ষতি। ধর্মঘট যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে ক্ষতির পরিমাণ ততই বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অথচ চাইলে এক বৈঠকেই বিষয়টির সমাধান করা যেত।

’ তিনি আরো বলেন, সমন্বয়হীনতা ও নেতাদের ‘ইগো’র কারণে আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এটি কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না।

জাহাজ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জিম্মি করে দাবি আদায় কোনো সমাধান হতে পারে না। নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাদের সঙ্গে বসে আমরা আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়েছি এবং ২০ ফেব্রুয়ারি তাদের সঙ্গে বসব। তখন সমাধান না হলে আপনারা আন্দোলন করতে পারেন। কিন্তু নির্বাচনের জন্য আমাদের সময় তো দিতে হবে। এখন সবাই ব্যস্ত প্রচারণা নিয়ে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছাড়া আমি এককভাবে তো এর সমাধান দিতে পারব না। ’

জানা গেছে, নতুন বেতন-ভাতা কার্যকরের দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেয় লাইটার জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়ন। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি জাহাজ মালিক সমিতির নির্বাচনের কারণে তাঁরা ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় চান। এতে সাড়া দিয়ে শ্রমিকদের মূল সংগঠন লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন ১০ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত ধর্মঘট স্থগিত করে। কিন্তু শ্রমিকদের আরেকটি অংশ লাইটার জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়ন নেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে দুই দিন আগেই অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি রাতেই ধর্মঘট শুরু করে। গতকাল সোমবারও ধর্মঘট চলছিল।

আগের দিন রবিবার ধর্মঘটের কারণে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু গতকাল ধর্মঘটের তৃতীয় দিনে পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিপাকে পড়েন ১১ লাখ পণ্য আমদানি ও খালাসের সঙ্গে জড়িতরা। অবশ্য যেসব কারখানা মালিকের নিজেদের লাইটার জাহাজ আছে তাদের পণ্য নামানো ও পরিবহন সচল রয়েছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার পরিচালক মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রমিকদের এই ধর্মঘট চট্টগ্রাম বন্দরের উত্পাদনশীলতা ও সক্ষমতাকে ব্যাহত করবে, জাহাজজট বাড়াবে। আর জট বাড়লেই পণ্যের পরিবহন খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই দিতে হবে। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সময়ক্ষেপণ না করে সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ’

অভিযোগ পাওয়া গেছে, ধর্মঘট শুরুর এক দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেকে পাঠানো হয় আন্দোলনকারী শ্রমিকদের একাংশকে। সেখানে কোনো সমাধান হয়নি। পরে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য গতকাল নৌমন্ত্রী শাজাহান খানকে পরামর্শ দেওয়া হয়। মন্ত্রী গতকাল বিকেলে জাহাজ মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে বসলেও সেখানে জাহাজ মালিকদের শীর্ষস্থানীয় কোনো নেতা উপস্থিত ছিলেন না। পরে শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে কোনো সমাধান ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। আজ মঙ্গলবার জাহাজ মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে আবারও আলোচনার সময় নির্ধারণ করেছেন নৌমন্ত্রী।

জানতে চাইলে সী কম শিপিংয়ের পরিচালক জহুর আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন বেতন ভাতা কার্যকরের জন্য জাহাজ পরিবহন ভাড়া তিনগুণ বাড়িয়ে আদায় শুরু হয়েছে। দরকার শুধু সমন্বয়ের। কিন্তু ছোট্ট এই বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেনি মন্ত্রণালয়সহ কোনো পক্ষ। এটা খামখেয়ালি ছাড়া কিছুই নয়। ’ তিনি আরো বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আন্দোলন চট্টগ্রাম বন্দরের অর্জন আবার হারাতে বসছে কি না তা ভেবে দেখা জরুরি। ’

নৌমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা শেষে গতকাল সন্ধ্যায় ধর্মঘটকারী লাইটার জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়নের একাংশের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাদাত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সময়ক্ষেপণের বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। তবে সোমবারের বৈঠকে জাহাজ মালিকদের দুজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সে জন্য মঙ্গলবার আবারও বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে একটি সমাধান আসতে পারে। ’

তবে জাহাজ মালিকদের সংগঠন বলছে, এ রকম কোনো আমন্ত্রণ তাঁরা ব্যক্তিগত বা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো পাননি।


মন্তব্য